• ই-পেপার

আজকের নামাজের সময়সূচি, ৩০ জুন ২০২৬

আহলে বাইত : মহানবী (সা.)–এর পবিত্র পরিবার

মুফতি ওমর বিন নাছির
আহলে বাইত : মহানবী (সা.)–এর পবিত্র পরিবার
সংগৃহীত ছবি

মানবজাতির ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব হলেন মহানবী (সা.)। আল্লাহ তাআলা তাঁকে সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছেন। তাঁর প্রতি ঈমান, ভালোবাসা ও আনুগত্য যেমন ইসলামের মৌলিক দাবি, তেমনি তাঁর পবিত্র পরিবার—আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনও একজন মুমিনের ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ কারণেই প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে আমরা দরুদ শরিফ পাঠ করার সময় শুধু মহানবী (সা.)-এর জন্য নয়, তাঁর পরিবারবর্গের জন্যও আল্লাহর কাছে রহমত ও বরকতের দোয়া করি— 


اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ
এটি শুধু একটি দোয়া নয়; বরং মুসলিম উম্মাহর কাছে আহলে বাইতের মর্যাদা ও সম্মানের এক চিরন্তন ঘোষণা।

দুঃখজনক হলেও সত্য, আজ অনেক মুসলমান আহলে বাইত সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখেন না। কেউ তাঁদের প্রাপ্য মর্যাদা দিতে গিয়ে সীমা অতিক্রম করেন, আবার কেউ তাঁদের মর্যাদা ও অধিকার সম্পর্কে উদাসীনতা দেখান। অথচ ইসলামের শিক্ষা হলো মধ্যপন্থা—আহলে বাইতকে ভালোবাসতে হবে, সম্মান করতে হবে, তাঁদের আদর্শ অনুসরণ করতে হবে; তবে এমন কোনো বিশ্বাস পোষণ করা যাবে না, যা কোরআন ও সুন্নাহর সীমার বাইরে চলে যায়।

'আহলে বাইত' শব্দের অর্থ হলো ‘গৃহের লোক’ বা ‘পরিবারের সদস্য’। কোরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘হে আহলে বাইত! আল্লাহ তো শুধু চান তোমাদের থেকে সব ধরনের অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদের পূর্ণরূপে পবিত্র করতে।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৩৩)

এই আয়াত আহলে বাইতের বিশেষ মর্যাদার সুস্পষ্ট প্রমাণ। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই আয়াতের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী আয়াতগুলো সরাসরি মহানবী (সা.)-এর পবিত্র স্ত্রীদের উদ্দেশে নাজিল হয়েছে। তাই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের সর্বসম্মত আকিদা হলো, উম্মাহাতুল মুমিনীন তথা মহানবী (সা.)-এর সম্মানিত স্ত্রীরা আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত। পাশাপাশি আলী (রা.), ফাতিমা (রা.), ইমাম হাসান (রা.) ও ইমাম হুসাইন (রা.) আহলে বাইতের বিশেষ মর্যাদাপ্রাপ্ত সদস্য। সহিহ মুসলিমে বর্ণিত বিখ্যাত ‘হাদিসে কিসা’-তে আয়েশা (রা.) বলেন, একদিন মহানবী (সা.) একটি চাদরের নিচে হাসান, হুসাইন, ফাতিমা ও আলী (রা.)-কে একত্র করে উপরোক্ত আয়াত তিলাওয়াত করেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৪২৪)। এর মাধ্যমে তাঁদের বিশেষ ফজিলত ও সম্মান স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়।

এতেই আহলে বাইতের পরিধি শেষ নয়। অধিকাংশ মুহাদ্দিস ও ফকিহের মতে, বনু হাশিমের মুসলিম সদস্যরাও আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মহানবী (সা.)-এর চাচা আব্বাস (রা.) ও তাঁর বংশধর, আকিল (রা.)-এর পরিবার, জাফর (রা.)-এর পরিবার এবং হারিস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের বংশধররা। মহানবী (সা.) তাঁদের প্রতিও বিশেষ সম্মান প্রদর্শন করতেন এবং মুসলিম উম্মাহকে তাঁদের মর্যাদা রক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছেন।

আহলে বাইতের সম্মান এতটাই মহান যে তাঁদের জন্য সাধারণ জাকাত ও সাদকা গ্রহণ হারাম করা হয়েছে। যায়েদ ইবনে আরকাম (রা.) বর্ণনা করেন, মক্কা ও মদিনার মাঝখানে ‘গাদিরে খুম’ নামক স্থানে মহানবী (সা.) ভাষণ দিতে গিয়ে তিনবার বলেছিলেন, ‘আমি তোমাদেরকে আমার আহলে বাইতের ব্যাপারে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি।’ পরে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, তাঁর স্ত্রীরা আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত এবং যাঁদের জন্য সাদকা হারাম, তাঁরাও আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১৮৪৬৪)
আর সদকার মালের পরিবর্তে আল্লাহ তাআলা তাঁদের জন্য যুদ্ধলব্ধ সম্পদের (গনিমতের) নির্ধারিত অংশ রেখেছিলেন, যা তাঁদের মর্যাদারই বহিঃপ্রকাশ।

মহানবী (সা.) তাঁর পরিবারের সদস্যদের মর্যাদা সম্পর্কে বহু হাদিসে আলোকপাত করেছেন। গাদিরে খুমের ঘটনার প্রেক্ষাপটে তিনি বলেন, ‘আমি যার অভিভাবক (ঘনিষ্ঠ বন্ধু), আলীও তার অভিভাবক। হে আল্লাহ! যে আলীকে ভালোবাসে, আপনি তাকে ভালোবাসুন এবং যে তাঁর শত্রুতা করে, আপনি তার শত্রু হোন।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ৯৬১)। 

একইভাবে তিনি ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইন (রা.) সম্পর্কে বলেছেন, ‘হাসান ও হুসাইন জান্নাতি যুবকদের নেতা।’ (সুনান তিরমিজি, হাদিস: ৩৭৬৮)। 
আর তাঁর প্রিয় কন্যা ফাতিমা (রা.) সম্পর্কে বলেছেন, ‘ফাতিমা জান্নাতের নারীদের নেত্রী।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৭১৪)

 এসব হাদিস প্রমাণ করে যে আহলে বাইতের সদস্যরা শুধু নবীজির আত্মীয়ই নন; তাঁরা ইসলামের ইতিহাসে অনন্য মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব। তাই আহলে বাইতের প্রতি একজন মুমিনের প্রথম কর্তব্য হলো তাঁদের অন্তর থেকে ভালোবাসা। এ ভালোবাসা শুধু আবেগের বিষয় নয়; এটি ঈমানের দাবি। দ্বিতীয় কর্তব্য হলো তাঁদের যথাযথ সম্মান করা এবং তাঁদের সম্পর্কে কোনো ধরনের অবমাননাকর মন্তব্য বা বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব থেকে বিরত থাকা। তৃতীয় কর্তব্য হলো তাঁদের জীবনাদর্শ অনুসরণ করা। 
 আলী (রা.)-এর জ্ঞান, ন্যায়পরায়ণতা ও সাহস, ফাতিমা (রা.)-এর ইবাদত, লজ্জাশীলতা ও ত্যাগ, ইমাম হাসান (রা.)-এর ধৈর্য ও উদারতা এবং ইমাম হুসাইন (রা.)-এর সত্যের জন্য আত্মত্যাগ—এসব প্রতিটি মুসলমানের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ।

তবে এ ক্ষেত্রেও ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষা স্মরণ রাখা জরুরি। আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসা কখনোই এমন পর্যায়ে পৌঁছানো উচিত নয়, যাতে তাঁদেরকে নবুয়তের মর্যাদায় উন্নীত করা হয় বা তাঁদের সম্পর্কে এমন বিশ্বাস পোষণ করা হয়, যার কোনো ভিত্তি কোরআন ও সহিহ সুন্নাহে নেই। আবার অন্যদিকে তাঁদের মর্যাদা অস্বীকার করা, তাঁদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা কিংবা তাঁদের অবমূল্যায়ন করাও মারাত্মক অন্যায়। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকিদা হলো—আহলে বাইত এবং সকল সাহাবায়ে কিরাম—উভয়ের প্রতিই ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শন করা। একজনের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অন্যজনকে হেয় করা কখনোই ইসলামের শিক্ষা নয়।

বিশেষভাবে লক্ষ্যনীয় বিষয় হলো- 
ইসলামের ইতিহাসে কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ে চিরস্থায়ী বেদনার স্মারক। ইমাম হুসাইন (রা.) ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের শাহাদাত নিঃসন্দেহে ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম হৃদয়বিদারক অধ্যায়। এ ঘটনার পর মুসলিম সমাজে নানা মতভেদ ও বিভক্তির সৃষ্টি হয়। কেউ আহলে বাইতের প্রতি অতিভক্তি দেখাতে গিয়ে অন্য সাহাবিদের অবমাননা করেছে, আবার কেউ সাহাবিদের সম্মান করতে গিয়ে আহলে বাইতের প্রাপ্য মর্যাদা উপেক্ষা করেছে। অথচ কোরআন ও সুন্নাহ আমাদের যে পথ দেখিয়েছে, তা হলো ন্যায়, ভারসাম্য ও সংযমের পথ। এক্ষেত্রে অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, সাহাবায়ে কেরাম সবাই ছিলেন ‘মিয়ারে হক’ তথা ‘সত্যের মাপকাঠি’। তাই কোনো ভাবেই তাঁদের কারো প্রতি কোনো ধরণের বিদ্বেষ বা রূঢ়মনোভাব পোষন করা যাবে না। 

আহলে বাইত ছিলেন ঈমান, তাকওয়া, জ্ঞান, ইবাদত, ত্যাগ, ধৈর্য ও সত্যের পথে অবিচল থাকার জীবন্ত প্রতীক। তাঁদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের সর্বোত্তম উপায় শুধুমাত্র আবেগ নয়; বরং তাঁদের জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা, তাঁদের আদর্শকে নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করা এবং তাঁদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও দোয়া অব্যাহত রাখা। একই সঙ্গে সকল সাহাবায়ে কিরামের প্রতিও আন্তরিক ভালোবাসা ও সম্মান বজায় রাখা একজন সুন্নি মুসলমানের আকিদার অপরিহার্য অংশ। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে মহানবী (সা.)-এর সুন্নাহ দৃঢ়ভাবে অনুসরণ করার, তাঁর পবিত্র আহলে বাইতকে যথাযথভাবে ভালোবাসার এবং সকল সাহাবায়ে কিরামের মর্যাদা রক্ষা করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

যেকোনো বিপদে যে দশ ভাবে রবের নৈকট্য লাভ হয়

ইসলামী জীবন ডেস্ক
যেকোনো বিপদে যে দশ ভাবে রবের নৈকট্য লাভ হয়
সংগৃহীত ছবি

কোনো মানুষের ওপর যদি এমন কোনো বিপদ আসে, যার আগে তার কোনো গুনাহ নেই, তাহলে বলা হয়, এটি তার ধৈর্যের পরীক্ষা এবং সওয়াবের আশায় তার মর্যাদা বৃদ্ধি করার একটি মাধ্যম। এই বিপদ কোনো গুনাহ মোচনের জন্য নাও হতে পারে; বরং এটি তার অন্তরকে পরিশুদ্ধ করার জন্য আসে, যাতে সে ধৈর্যের মাধ্যমে ধৈর্যশীলদের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছতে পারে।

প্রত্যেক বিপদের মধ্যে ১০টি উপকার আছে, যার জন্য বান্দার আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত—

এক. মানুষের দুর্বলতা ও আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষিতার স্মরণ : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি তোমার পূর্ববর্তী জাতিগুলোর কাছে রাসুলদের পাঠিয়েছিলাম। অতঃপর তাদের দারিদ্র্য ও দুঃখ-কষ্ট দ্বারা পাকড়াও করেছিলাম, যাতে তারা বিনীতভাবে আমার কাছে প্রার্থনা করে।’ (সুরা : আল-আনআম, আয়াত : ৪২)

দুই. আল্লাহর নিয়ামত স্মরণ করিয়ে দেওয়া : রোগ না হলে মানুষ সুস্থতার মূল্য বুঝতে পারে না। সম্পদ হারানোর অভিজ্ঞতা না হলে ধন-সম্পদের মূল্য উপলব্ধি হয় না। কারণ বিপরীত বিষয়ের মাধ্যমে জিনিসের প্রকৃত মূল্য বোঝা যায়।

তিন. ধর্মীয় উদাসীনতা ও ঘুমন্ত অবস্থা থেকে মানুষকে জাগিয়ে তোলা : আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন, ‘আমি অবশ্যই তাদের বড় শাস্তির আগে ছোট শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করাব, যাতে তারা ফিরে আসে।’ (সুরা : আস-সাজদাহ, আয়াত : ২১)

চার. গুনাহ ও ভুলত্রুটি মাফ হওয়া : আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ যার কল্যাণ চান, তাকে তিনি বিপদে ফেলেন।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৬৪৫)

অর্থাৎ এমন বিপদ, যা তার স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে, সম্পদে ক্ষতি করে অথবা আনন্দকে দুঃখে পরিণত করে। কোনো কোনো মুসলিম মনীষী বলেন, ‘যদি বিপদ-মুসিবত না আসত, তবে আমরা কিয়ামতের দিন নিঃস্ব অবস্থায় উপস্থিত হতাম।’

পাঁচ. মর্যাদা বৃদ্ধি পাওয়া : আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কখনো কখনো কোনো ব্যক্তির জন্য আল্লাহর কাছে এমন মর্যাদা নির্ধারিত থাকে, যা সে নিজের আমল দ্বারা অর্জন করতে পারে না। তখন আল্লাহ তাকে এমন বিষয়ের মাধ্যমে পরীক্ষা করতে থাকেন যা সে অপছন্দ করে, অবশেষে তাকে সেই মর্যাদায় পৌঁছে দেন।’ সহিহুল জামে, হাদিস : ১৬২৫)

ছয়. আত্মোপলব্ধি করা : বিপদ এলে এই চিন্তা করা যে আল্লাহ চাইলে বিপদ আরো বড় হতে পারত। তাই বান্দার উচিত আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা। কারো কিছু সম্পদ নষ্ট হলে সে যেন আল্লাহর প্রশংসা করে যে তার সব সম্পদ নষ্ট হয়নি।

সাত. বিপদ দুনিয়ায়ই সীমাবদ্ধ থাকা : দুনিয়ার বিপদ ক্ষণস্থায়ী এবং এর প্রভাবও সীমিত। সময়ের সঙ্গে মানুষ তা ভুলে যায় বা তা সহ্য করার শক্তি পায়। কিন্তু আখিরাতের বিপদ দীর্ঘস্থায়ী, কঠিন ও অত্যন্ত ভয়াবহ।

আট. উত্তম প্রতিদান লাভ : ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি প্রত্যাবর্তনের কারণে উত্তম প্রতিদান লাভ করা। উম্মে সালামা (রা.) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি—কোনো মুসলিম যখন কোনো বিপদে আক্রান্ত হয় এবং আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী বলে—‘নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই এবং তাঁর কাছেই ফিরে যাব।’ এবং বলে—‘হে আল্লাহ! আমার এই বিপদে আমাকে সওয়াব দান করুন এবং এর পরিবর্তে আমাকে উত্তম কিছু দান করুন।’ তাহলে আল্লাহ অবশ্যই তাকে এর চেয়ে উত্তম কিছু দান করেন। (মুসলিম, হাদিস : ৯১৮)

নয়. অগণিত সওয়াবের অধিকারী হওয়া : বিপদের চেয়ে তার প্রতিদান অনেক বেশি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদের তাদের প্রতিদান অগণিতভাবে প্রদান করা হবে।’ (সুরা : আয-ঝুমার, আয়াত : ১০)

দশ. দুনিয়াকেন্দ্রিক বিপদ অপেক্ষাকৃত ভালো : এর জন্য শুকরিয়া আদায় করা উচিত যে দ্বিনের ওপর বিপদ আসেনি। এটি আল্লাহর বড় অনুগ্রহ। কারণ দুনিয়ার ক্ষতি পূরণ করা সম্ভব, কিন্তু দ্বিনের ক্ষতি সবচেয়ে বড় ক্ষতি। রাসুলুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি দোয়া ছিল—‘হে আল্লাহ! আমাদের দ্বিনের মধ্যে আমাদের ওপর কোনো বিপদ চাপিয়ে দেবেন না। আর দুনিয়াকে আমাদের সবচেয়ে বড় চিন্তা ও আমাদের জ্ঞানের চূড়ান্ত সীমা বানাবেন না।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৩৫০২)

সারকথা হলো মুমিনের কাছে বিপদ শুধু কষ্টের নাম নয়; বরং তা হতে পারে আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম, গুনাহ মাফের কারণ, মর্যাদা বৃদ্ধির পথ এবং আখিরাতের চিরস্থায়ী সফলতার সোপান। তাই বিপদের সময় ধৈর্য, সন্তুষ্টি ও কৃতজ্ঞতার পথ অবলম্বন করাই ঈমানের সৌন্দর্য।

খিজির (আ.)-এর রহস্যময় জীবন

ইসলামী জীবন ডেস্ক
খিজির (আ.)-এর রহস্যময় জীবন
সংগৃহীত ছবি

ইসলামী ধর্ম বিশ্বাসে এক রহস্যময় ব্যক্তিত্বের নাম খিজির (আ.)। মুসলমানদের ভেতর যাঁর পরিচয়, অবস্থান ও জীবনকাল নিয়ে নানা বিশ্বাস প্রচলিত আছে। তাঁকে নিয়ে মানুষের বিশ্বাস ও কৌতূহলের যেন শেষ নেই। যেমন—খিজির (আ.) কে ছিলেন? তিনি নবী না ওলি? তিনি কি এখনো জীবিত আছেন? জীবিত থাকলে তিনি কোথায় থাকেন? অনেক বুজুর্গ ব্যক্তি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের দাবি করেন, এসব দাবি সত্য? তিনি কেন আত্মপ্রকাশে আসেন না, যেন মানুষ তাঁর জ্ঞান দ্বারা উপকৃত হতে পারে? কোরআন ও হাদিসের আলোকে এসব প্রশ্নের উত্তর তুলে ধরা হলো—
বিশুদ্ধ মত হলো খিজির (আ.) কোনো নবী ছিলেন না, তিনি আল্লাহর একজন নেককার বান্দা বা ওলি ছিলেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহর এই নেক বান্দার বর্ণনা এসেছে। সুরা কাহফের বর্ণনা অনুসারে আল্লাহ খিজির (আ.)-কে বিশেষ জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দান করেছিলেন।

তিনি আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞান ও দূরদর্শিতার কারণে এমন অনেক জিনিস অনুধান করতেন পারতেন, যা সাধারণ মানুষের জন্য সাধ্যাতীত। আল্লাহর নবী মুসা (আ.) জ্ঞান আহরণের জন্য খিজির (আ.)-এর সঙ্গী হন। কিন্তু তিনি শর্তানুসারে ধৈর্য ধারণ করতে পারেননি। ফলে তাঁরা উভয়ে ভিন্ন পথ অবলম্বন করেন। (বিস্তারিত দেখুন : সুরা কাহফ, আয়াত ৬৫-৭৮)

খিজির (আ.)-এর ব্যাপারে একটি প্রচলিত বিশ্বাস হলো তিনি এখনো জীবিত আছেন এবং কিয়ামত পর্যন্ত জীবিত থাকবেন। তাঁর ব্যাপারে বিভিন্ন ধরনের ঘটনাও প্রচলিত আছে। যেমন—তাঁর সঙ্গে অমুক ব্যক্তির সাক্ষাৎ হয়েছে, তিনি অমুক ব্যক্তিকে খিরকা প্রদান করেছেন, তিনি অমুককে বর দিয়েছেন ইত্যাদি। এসব দাবির পক্ষে কোরআন-হাদিস তো দূরের কথা, গ্রহণযোগ্য কোনো ঐতিহাসিক সূত্রও পাওয়া যায় না। উম্মতের মুহাক্কিক (গবেষক ও অনুসন্ধানী) আলেমরা একমত খিজির (আ.) জীবিত নেই।

আল্লামা ইবনুল কাইয়িম (রহ.) তাঁর ‘আল মানারুল মুনিফ ফিল হাদিসিস সহিহ ওয়াদ-দয়িফ’ বইয়ে ভিত্তিহীন হাদিসের পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন। তিনি জাল হাদিসের পরিচয় অংশে বলেছেন, যেসব হাদিসে খিজির (আ.)-এর জীবন নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে তার সব মিথ্যা ও বানোয়াট। তাঁর জীবিত থাকার ব্যাপারে একটিও বিশুদ্ধ হাদিস নেই। তেমনি একটি বানোয়াট হাদিস হলো ‘একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) মসজিদে অবস্থান করছিলেন। হঠাৎ তাঁর পেছনে কথার শব্দ শুনলেন। মানুষ তাকিয়ে দেখলেন তিনি খিজির (আ.)।’
ইবরাহিম হারবি (রহ.)-কে খিজির (আ.)-এর জীবিত থাকার ব্যাপারে প্রশ্ন করা হয়েছিল—তিনি কি এখনো আছেন? তিনি বলেন, মানুষের ভেতর এই বিশ্বাস শয়তানই ছড়িয়েছে। ইমাম বুখারি (রহ.)-কে খিজির ও ইলিয়াস (আ.) সম্পর্কে  জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তাঁরা দুজন কি জীবিত? তিনি বলেন, সেটা কিভাবে সম্ভব? অথচ নবী (সা.) বলেছেন, ‘এক শ বছর পর এখন যারা পৃথিবীতে আছে তাদের কেউ অবশিষ্ট থাকে না।’ (বুখারি ও মুসলিম)

অসংখ্য আলেম খিজির (আ.)-এর ব্যাপারে একই উত্তর দিয়েছেন। তাঁরা দলিল হিসেবে কোরআনের নিম্নোক্ত আয়াতটি পেশ করেন। আল্লাহ বলেছেন, ‘আমি তোমার আগেও কোনো মানুষকে অনন্ত জীবন দান করিনি। তুমি মারা গেলে তারা কি চিরজীবী হয়ে থাকবে?’ (সুরা : আম্বিয়া, আয়াত : ৩৪)

আর এটা যখন প্রমাণিত হলো খিজির (আ.) জীবিত নেই, তাই তাঁর অবস্থানস্থল, কাজগুলো ও আত্মপ্রকাশ বিষয়ক প্রশ্নও অর্থহীন। তবে এটা সত্য যে আল্লাহ খিজির (আ.)-কে প্রভূত জ্ঞান দান করেছিলেন। পবিত্র কোরআনে এর সাক্ষ্য পাওয়া যায়। ইরশাদ হয়েছে, ‘অতঃপর তারা সাক্ষাৎ পেল আমার বান্দাদের মধ্যে একজনের, যাকে আমি আমার কাছ থেকে অনুগ্রহ দান করেছিলাম এবং আমার কাছ থেকে শিক্ষা দিয়েছিলাম এক বিশেষ জ্ঞান।’ (সুরা : কাহফ, আয়াত : ৬৫)

আল্লাহ সবাইকে সঠিক জ্ঞান দান করুন। আমিন।

ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পদের মালিকানা

সায়্যিদ মুনিব মুর্শিদ
ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পদের মালিকানা

পৃথিবীতে সম্পদের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক যত পুরনো, এর মালিকানার প্রশ্নটিও তত পুরনো। মানুষ সব যুগেই কিছু জিনিসকে নিজের বলে চিহ্নিত করতে চেয়েছে। জমি, ঘর, ব্যবসা কিংবা অর্থ—এসবের ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যক্তি যেমন চেষ্টা করেছে, তেমনি সমাজ ও রাষ্ট্রও বিভিন্ন নিয়ম-কানুন তৈরি করেছে।

অর্থনীতির ইতিহাসের একটি বড় অংশ জুড়েই আছে এই মালিকানার প্রশ্ন। কে সম্পদের মালিক হবে, তার অধিকার কতটুকু হবে, সেই অধিকার কোথায় গিয়ে শেষ হবে—সভ্যতার বিভিন্ন পর্যায়ে এসব প্রশ্নের ভিন্ন ভিন্ন উত্তর দেওয়া হয়েছে। তবে ইতিহাসের একটি বাস্তবতা কখনো পরিবর্তিত হয়নি।

মানুষের মালিকানা স্থায়ী নয়। যে জমি একসময় একজনের ছিল, পরবর্তী সময়ে তা অন্যের হয়েছে। যে সম্পদ নিয়ে মানুষ গর্ব করেছে, মৃত্যুর পর তা উত্তরাধিকারীদের হাতে চলে গেছে। মানুষ পৃথিবী ছেড়ে গেছে, কিন্তু সম্পদ পৃথিবীতেই রয়ে গেছে। এই সরল অথচ গভীর সত্যটিকেই ইসলাম মালিকানা দর্শনের মূল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছে।

ইসলামী অর্থনীতি মানুষের মালিকানাকে অস্বীকার করে না; বরং ব্যক্তিমালিকানা স্বীকৃতি দেয়, সুরক্ষা দেয় এবং বৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জনকে উৎসাহিত করে। কিন্তু ইসলাম একই সঙ্গে মনে করিয়ে দেয়, মানুষের মালিকানা চূড়ান্ত নয়। মানুষের হাতে যা কিছু আছে, তা মূলত তার কাছে অর্পিত একটি আমানত। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আসমান ও পৃথিবীর সার্বভৌম মালিকানা আল্লাহর।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৮৯)

অন্যত্র বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ তোমাদের যে সম্পদ দিয়েছেন, তা থেকে তাদের প্রদান করো।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ৩৩)

দ্বিতীয় আয়াতটির ভাষা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে মানুষের হাতে থাকা সম্পদকেও ‘আল্লাহর সম্পদ’ বলা হয়েছে। অর্থাৎ মানুষ সম্পদের ভোগদখলকারী হতে পারে, আইনগত মালিক হতে পারে, কিন্তু প্রকৃত মালিক নয়। ইসলামী অর্থনীতির মালিকানা-দর্শনের ভিত্তি এখানেই। মানবসভ্যতার অর্থনৈতিক চিন্তার ইতিহাসে মালিকানা নিয়ে বিভিন্ন মতবাদ গড়ে উঠেছে।

ইংরেজ দার্শনিক জন লক তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘সেকেন্ড ট্রিটিজ অব গভর্নমেন্ট’-এ ব্যক্তিগত মালিকানার পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন। তিনি লিখেছিলেন, ‘Though the earth, and all inferior creatures, be common to all men, yet every man has a property in his own person...’

লকের মতে, মানুষের শ্রম তার নিজের সম্পত্তি। আর যখন সে তার শ্রমকে কোনো কিছুর সঙ্গে যুক্ত করে, তখন সেই বস্তু তার বৈধ সম্পত্তিতে পরিণত হয়। আধুনিক ব্যক্তিগত মালিকানাতত্ত্বের বিকাশে এই ধারণা গভীর প্রভাব ফেলেছে।

ইসলাম শ্রমের মর্যাদাকে অস্বীকার করে না; বরং শ্রম, উদ্যোগ ও বৈধ উপার্জনকে সম্মানের চোখে দেখে। কিন্তু ইসলাম এখানেই থেমে যায় না। ইসলাম প্রশ্ন করে—শ্রমের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ কি মানুষকে সীমাহীন অধিকার দেয়? সে কি ইচ্ছামতো সম্পদ ব্যবহার করতে পারে? তার সম্পদের মধ্যে কি অন্য কারো কোনো অধিকার নেই? ইসলামের উত্তর হলো, সম্পদের সঙ্গে দায়িত্বও রয়েছে। সম্পদ শুধু অধিকার নয়, আমানতও।

এই দায়িত্বের ধারণাই ইসলামী অর্থনীতিকে শুধু অর্থনৈতিক তত্ত্বের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং তাকে একটি নৈতিক ব্যবস্থায় পরিণত করেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পদ এমন এক বিষয়, যার ব্যাপারে মানুষকে জবাবদিহি করতে হবে। সে শুধু কত সম্পদ অর্জন করেছে, তা নয়; কিভাবে অর্জন করেছে এবং কোথায় ব্যয় করেছে—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই কোরআন সম্পদকে নিছক আশীর্বাদ হিসেবে নয়, পরীক্ষা হিসেবেও উল্লেখ করেছে। ‘তোমাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তো কেবল পরীক্ষা।’ (সুরা : তাগাবুন, আয়াত : ১৫)

এই আয়াত আমাদের একটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি শিক্ষা দেয়। মানুষ সাধারণত সম্পদকে সাফল্যের প্রতীক মনে করে। কিন্তু কোরআন সম্পদকে দায়িত্বের মানদণ্ড হিসেবেও দেখছে। সম্পদ মানুষের মর্যাদা বাড়াতে পারে, আবার তাকে বিভ্রান্তও করতে পারে। সম্পদ মানুষের কল্যাণের মাধ্যম হতে পারে, আবার তার নৈতিক পতনের কারণও হতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই জবাবদিহির বিষয়টিকে আরো স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, ‘কিয়ামতের দিন কোনো বান্দার পদক্ষেপ সরবে না, যতক্ষণ না তাকে তার সম্পদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে—কোথা থেকে তা অর্জন করেছে এবং কোথায় তা ব্যয় করেছে।’ (জামে তিরমিজি)

এই হাদিস ইসলামী অর্থনীতির একটি মৌলিক নীতি তুলে ধরে। পৃথিবীর বহু অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মানুষের সম্পদের পরিমাণকে গুরুত্ব দেয়; ইসলাম গুরুত্ব দেয় তার উৎস ও ব্যবহারের ওপর। একজন ব্যক্তি বিপুল সম্পদের মালিক হতে পারেন, কিন্তু যদি সেই সম্পদ অন্যায়ভাবে অর্জিত হয় কিংবা অন্যায় কাজে ব্যয় হয়, তবে ইসলামের দৃষ্টিতে তা সাফল্য নয়। এ কারণেই ইসলামে উপার্জনের বৈধতা একটি কেন্দ্রীয় বিষয়। শুধু ধনী হওয়া গুরুত্বপূর্ণ নয়, বৈধ উপায়ে ধনী হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ব্যয় করা গুরুত্বপূর্ণ নয়, সঠিক স্থানে ব্যয় করা গুরুত্বপূর্ণ।

সমকালীন ইসলামী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ওমর চাপরা তাঁর ‘ Islam and the Economic Challenge’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে নৈতিক মূল্যবোধ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হলে প্রকৃত মানবকল্যাণ অর্জন সম্ভব নয়। সম্পদ বৃদ্ধি সমাজের জন্য কল্যাণকর হতে পারে, কিন্তু সেই সম্পদ যদি ন্যায়বিচার, মানবিকতা এবং সামাজিক ভারসাম্যের সঙ্গে যুক্ত না হয়, তবে তা নতুন সংকটও সৃষ্টি করতে পারে।

ইসলামী অর্থনীতিতে মালিকানা তাই একাধারে অধিকার ও দায়িত্ব। একজন ব্যক্তি তার সম্পদের মালিক, কিন্তু সেই সম্পদের মধ্যে দরিদ্রের অধিকার রয়েছে। একজন ব্যবসায়ী তাঁর লাভের অধিকার রাখেন, কিন্তু প্রতারণার অধিকার রাখেন না। একজন ধনী তাঁর সম্পদ ভোগ করতে পারেন, কিন্তু অপচয়ের অধিকার রাখেন না। এ কারণেই ইসলামে জাকাত শুধু একটি ধর্মীয় বিধান নয়, এটি মালিকানার দর্শনের একটি বাস্তব প্রকাশ। কারণ ইসলাম মনে করে সম্পদ একেবারে ব্যক্তিগত বিষয় নয়। সমাজের দুর্বল ও বঞ্চিত মানুষেরও সেই সম্পদের ওপর নির্দিষ্ট অধিকার রয়েছে।

একইভাবে উত্তরাধিকার আইনও ইসলামী অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। বহু সভ্যতায় সম্পদ কয়েকটি পরিবারের হাতে শতাব্দীর পর শতাব্দী কেন্দ্রীভূত থেকেছে। ইসলাম উত্তরাধিকারের মাধ্যমে সেই কেন্দ্রীভবনকে ভেঙে সম্পদের বিস্তৃত বণ্টনের ব্যবস্থা করেছে। ফলে সম্পদ সমাজে চলাচল করে, স্থবির হয়ে থাকে না।

কোরআন সম্পদের সঞ্চয়কে নয়, সম্পদের সঠিক প্রবাহকে গুরুত্ব দিয়েছে। এ কারণেই সুরা আল-হাশরে বলা হয়েছে, ‘যাতে সম্পদ কেবল তোমাদের ধনীদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়।’ (সুরা : হাশর, আয়াত : ৭)

এই সংক্ষিপ্ত আয়াতটি ইসলামী অর্থনীতির সামাজিক দর্শনকে গভীরভাবে ধারণ করে। ইসলাম সম্পদের বিরোধিতা করে না; বরং সম্পদের একচেটিয়া আধিপত্যের বিরোধিতা করে।

ইসলামের ইতিহাসে আমরা এই দৃষ্টিভঙ্গির বাস্তব প্রতিফলন দেখতে পাই। উসমান ইবনে আফফান (রা.) ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী। আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) ছিলেন মদিনার অন্যতম ধনী সাহাবি। ইসলাম তাঁদের সম্পদের জন্য সমালোচনা করেনি; বরং তাঁদের সম্পদকে সমাজকল্যাণে ব্যয় করার জন্য প্রশংসা করেছে। এতে স্পষ্ট হয় যে ইসলামের আপত্তি সম্পদের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে নয়; বরং সম্পদের অহংকার, অপব্যবহার এবং অন্যায় কেন্দ্রীভবনের বিরুদ্ধে। বস্তুত ইসলামী অর্থনীতির মালিকানা-দর্শন মানুষকে দুটি ক্ষতি থেকে রক্ষা করে। একদিকে এটি ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও মালিকানার অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়, অন্যদিকে সীমাহীন মালিকানার ধারণাকে নিয়ন্ত্রণ করে। এটি মানুষকে সম্পদ অর্জনে উৎসাহিত করে, কিন্তু সম্পদের দাসত্ব থেকে মুক্ত থাকতে শিক্ষা দেয়।

এ কারণেই ইসলামে সম্পদকে শুধু ভোগের উপকরণ হিসেবে দেখা হয় না; বরং একটি আমানত হিসেবে দেখা হয়। আর আমানতের প্রকৃতি হলো তার সঙ্গে দায়িত্ব জড়িত থাকে। মানুষ তার সম্পদের হিসাব ব্যাংকের কাছে দিতে পারে, রাষ্ট্রের কাছেও দিতে পারে; কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে তাকে একদিন তার রবের কাছেও হিসাব দিতে হবে। সেই বোধই ইসলামী অর্থনীতির মালিকানা-দর্শনের প্রাণ। এখানে সম্পদ আছে, মালিকানা আছে, বাজার আছে, উদ্যোগ আছে; কিন্তু সবকিছুর ওপর রয়েছে নৈতিক জবাবদিহির ছায়া। আর এখানেই ইসলামী অর্থনীতি শুধু একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নয়, বরং একটি নৈতিক সভ্যতার অংশ হয়ে ওঠে।