উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম, বিশিষ্ট ইসলামী স্কলার, গবেষক ও বহু গ্রন্থপ্রণেতা মাওলানা সাইয়েদ সালমান আল-হুসাইনি নদভি আর নেই। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
সোমবার (২৯ জুন) ভারতের লখনউয়ের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭২ বছর। পরে মরহুমের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে তার মত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
তাঁর ইন্তেকালের খবরে ভারতসহ উপমহাদেশজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ধর্মীয় ও একাডেমিক অঙ্গনে তার মৃত্যু অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে দেখছেন আলেম-উলামা ও শিক্ষাবিদরা।
আজ আসর নামাজের পর জামিয়া সাইয়েদ আহমদ শহিদ কাটোলিতে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। পরে সেখানেই তাকে দাফন করা হবে।
শায়খ সালমান আল-হুসাইনির মৃত্যুতে বিশ্বের ইসলামী ব্যক্তিত্ব, শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদরা গভীর শোক জানিয়েছেন। কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক ইসলামী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর মুসলিম স্কলার্স-এর প্রেসিডেন্ট ড. আলি মুহিউদ্দিন আল-কারাদাগি এক বার্তায় লিখেছেন, ‘গভীর দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আমি মুসলিম উম্মাহকে আমার ৩০ বছরেরও বেশি সময়ের আমার ভাই, বন্ধু ও সঙ্গী বিশিষ্ট আলেম, হাদিস বিশেষজ্ঞ এবং চিন্তাবিদ, সাইয়্যেদ শায়খ সালমান আল-হুসাইনি নদভির ইন্তেকালের সংবাদ জানাচ্ছি। তিনি ছিলেন আইইউএমএস-এর ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য এবং ভারতের লখনৌতে অবস্থিত জামেয়া ইমাম আহমদ ইবনে ইরফান শহিদের প্রেসিডেন্ট।’
শায়খ সালমানের স্মৃতিচারণ করে তিনি লিখেছেন, ‘শায়খ সালমান তাঁর রবের কাছে চলে গেছেন। তিনি রেখে গেছেন এমন এক উত্তরাধিকার যা সাক্ষ্য দেয় এমন একজন আলেমের, যাঁর জ্ঞান কেবল কিতাবে সীমাবদ্ধ ছিল না এবং তাঁর দাওয়াতও মিম্বরে সীমিত ছিল না। বরং, তিনি ছিলেন একজন মিশন-মানব, যিনি ভারতে ইসলামের বোঝা বহন করেছেন, নবীর সুন্নাহর খেদমত করেছেন, প্রজন্মকে লালন-পালন করেছেন, প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন এবং উম্মাহর বিভিন্ন বিষয়ে এমন একজন আলেমের অবস্থানে দাঁড়িয়েছেন, যিনি জ্ঞানকে আমানত, বাণীকে সাক্ষ্য এবং দাওয়াহকে দায়িত্ব হিসেবে দেখেন।’
ড. আল-কারাদাগি আরো লিখেন, ‘আমি তাঁকে একজন আন্তরিক ভাই, একজন বিশ্বস্ত বন্ধু এবং একজন দূরদর্শী আলেম হিসেবে চিনতাম, যাঁর ছিল এক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব এবং নিজ ধর্ম ও জাতির প্রতি গভীর অনুরাগ। তিনি কখনো সত্যের সাথে আপোস করেননি। কখনো নীতির সাথে আপোস করেননি এবং জ্ঞানকে কখনো সমাবেশের নিছক সজ্জা হিসেবে ব্যবহার করেননি। বরং, তাঁর কাছে জ্ঞান ছিল কর্ম, ইসলামের দিকে আহ্বান ছিল নির্মাণ এবং জাতির প্রতি আনুগত্য ছিল এক অটুট অঙ্গীকার।’
এদিকে মালয়েশিয়ার প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ ও ইসলামিক পার্টির প্রেসিডেন্ট আবদুল হাদি আওয়াং এক শোকবার্তায় লিখেছন, ‘মরহুম শায়খ একজন প্রখ্যাত আলেম ছিলেন, যিনি কোরআন অধ্যয়ন, হাদিস, দাওয়াহ এবং ইসলামী চিন্তাধারার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। তিনি লখনৌয়ের দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামায় শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। একই সাথে ভারতসহ বিশ্বজুড়ে মুসলিম উম্মাহর উন্নয়নে অবদান রাখা অসংখ্য শিক্ষা, দাতব্য ও দাওয়াহ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর পাণ্ডিত্যপূর্ণ কাজ, বক্তৃতা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার অবিচল প্রচেষ্টার মাধ্যমে মরহুম শায়খ এক স্থায়ী বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরাধিকার রেখে গেছেন, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে উপকৃত করতে থাকবে। নিঃসন্দেহে, তাঁর মৃত্যু ইসলামী বিশ্বের জন্য এক বিরাট ক্ষতি।’
ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের উত্তর প্রদেশের সভাপতি অজয় রাই এক্স-এর এক বার্তায় লিখেছেন, ‘নদওয়াতুল উলামার মহান শিক্ষক, মাদরাসা কতাউলিসহ সারা দেশের শত শত মাদরাসার প্রধান পৃষ্ঠপোষক, শত শত গ্রন্থের লেখক এবং আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিসম্পন্ন ইসলামী পণ্ডিত হজরত মাওলানা সাইয়েদ সালমান হুসাইনি নদভি আজ সকালে তাঁর নিজ বাসভবনে ইন্তেকাল করেছেন। আমরা আল্লাহ তাআলার কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন মরহুমকে ক্ষমা করেন এবং তাঁর পরিবার, আত্মীয়-স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের ধৈর্য ও শক্তি দান করেন।’
মাওলানা সালমান নদভি ১৯৫৪ সালে ভারতের লখনউয়ের একটি ঐতিহ্যবাহী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পরিবার মহানবী মুহাম্মদ (স.)-এর দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসাইন (রা.)-এর বংশধারার সঙ্গে যুক্ত বলে পরিচিত।
সালমান নদভির শিক্ষা জীবন লখনউয়ের দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামায় শুরু হয়। সেখানে তিনি কোরআনে হাফেজ হন এবং পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালে স্নাতক সম্পন্ন করেন। ১৯৭৬ সালে একই প্রতিষ্ঠান থেকে হাদিস শাস্ত্রে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
পরে ১৯৮০ সালে তিনি সৌদি আরবের রিয়াদে অবস্থিত ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সাউদ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রখ্যাত আলেম শায়খ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ (রহ.)-এর তত্ত্বাবধানে হাদিস গবেষণায় পুনরায় স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।
শিক্ষাজীবন শেষে তিনি দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামায় শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তী সময়ে তিনি প্রতিষ্ঠানটির দাওয়াহ ও শরিয়াহ অনুষদের ডিন হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তিনি দেশ-বিদেশের অসংখ্য শিক্ষার্থীর শিক্ষক ও দিকনির্দেশক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
সালমান নদভির আরবি ও উর্দু ভাষায় ইসলামী ধর্মতত্ত্ব, ইতিহাস, আকিদা ও হাদিস বিষয়ে তাঁর বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রয়েছে। তিনি ইংরেজি, উর্দু, আরবি ও ফারসি ভাষায় প্রকাশিত বেশ কয়েকটি জার্নাল সম্পাদনা ও সহ-সম্পাদনাও করেছেন।
মাওলানা সালমান নদভি ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি ড. আব্দুল আলী ইউনানি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের চেয়ারম্যান, জামেয়া দারুল উলুম সাইয়েদ আহমদ শহিদ কাটোলিরর চ্যান্সেলর এবং জমিয়ত শাবাব উল ইসলামের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।




