• ই-পেপার

মন্ত্রীর মর্যাদা ভারতে, বাংলাদেশে নিছক রাষ্ট্রদূত

বাজেট পর্যালোচনা : কিছু পরামর্শ

মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া
বাজেট পর্যালোচনা : কিছু পরামর্শ
মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া। ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবছর জুন মাসের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে সরকারের বাজেট ঘোষণার পর বাজেটের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা একটি প্রথাগত ব্যাপার। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। দেশের অর্থনীতিবিদ, চিন্তক ও বিদগ্ধজনের এসব আলোচনা-পর্যালোচনা থেকে বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে জড়িত মন্ত্রণালয় অথবা কর্তৃপক্ষ উপকৃত হন এবং বাজেটে কোনো ভ্রান্তি, দুর্বলতা, বৈষম্য কিংবা জনগণের ওপর কোনো অহেতুক চাপ বা অনাকাঙ্ক্ষিত বোঝা থাকলে তা সংসদে বাজেট পাশের আগেই সংশোধন করতে পারেন। সংসদ সদস্যরাও বাজেট অধিবেশনে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে করণীয় ঠিক করতে পারেন। 

গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত দেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী বিএনপি সরকারের এটি প্রথম বাজেট। ১১ জুন অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপন করেন। বাজেট প্রণয়নের জন্য যথেষ্ট সময় না পেলেও জনকল্যাণমুখী, বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সহায়ক একটি বাজেট উপহার দিতে সরকারের সদিচ্ছা প্রশংসানীয়। তবে বৈশ্বিক অভিঘাত তথা আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহে অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক সংঘাত কিংবা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা তথা বাজেটকে বিপর্যস্ত করতে পারে। এসব চ্যালেঞ্জ মাথায় রেখেই আগামী (২০২৬-২৭) অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার একটি সম্প্রসারণমূলক বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। এবারের বাজেটের আকার জিডিপির ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ এবং চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) তুলনায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি।

বাজেটের পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৫ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা, উন্নয়ন ব্যয় ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা। বাজেটের অর্থায়নের জন্য রাজস্ব আয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, এনবিআর-বহির্ভূত রাজস্ব ২৫ হাজার কোটি টাকা, করবহির্ভূত রাজস্ব (নন-ট্যাক্স রেভিনিউ) ৬৬ হাজার কোটি টাকা এবং অনুদান ধরা হয়েছে ৬ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। বাজেট ঘাটতি প্রাক্কলন ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। ঘাটতি পূরণের জন্য অভ্যন্তরীণভাবে ব্যাংক ঋণ, সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য উৎস থেকে নেওয়া হবে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা এবং বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা ১ লাখ ৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা। উন্নয়নশীল দেশের জন্য বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৪ শতাংশের কম হলে তা সহনীয়, তবে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ রাজস্ব আয় না হলে ঘাটতির পরিমাণ বাড়তে পারে, এমনকি ৫ শতাংশও ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বিদ্যমান।

আসন্ন বাজেট বাস্তবানের মাধ্যমে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, পণ্য বাজারে স্থিতিশীলতা আনয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন কৌশল বাস্তবায়ন ও অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীতকরণ ও মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী কিছু দীর্ঘমেয়াদি ভিশনের কথাও উল্লেখ করেছেন। যেমন ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের অর্থনীতি ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীতকরণ, ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৮ শতাংশে উন্নীতকরণ। একই সময়ের মধ্যে বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) জিডিপির ২ দশমিক ৭ শতাংশে এবং দেশের মোট বিনিয়োগ জিডিপির ৪০ শতাংশে উন্নীত করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন অর্থমন্ত্রী। প্রকাশ থাকে যে, চলতি অর্থবছরে দেশের মোট বিনিয়োগ মাত্র জিডিপির ৩০ শতাংশের নিচে। 

পর্যালোচনা 
অর্থ বরাদ্দের দিক থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে সামাজিক নিরাপত্তা ও সমাজকল্যাণ খাতকে। এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬২ হাজার ৪৪ কোটি টাকা। গত বাজেটে বরাদ্দ ছিল ৪৫ হাজার ৮৩ কোটি টাকা। বরাদ্দ বৃদ্ধির হার ৩৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। স্বাভাবিকভাবেই বরাদ্দ বৃদ্ধির কারণ বিভিন্ন খাতে প্রধানমন্ত্রীর কার্ড বিতরণ। এ ছাড়া চালু সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ ও বর্ধিত হারে অর্থায়ন। তবে খেয়াল রাখতে হবে, যাতে সঠিক ব্যক্তিদের হাতে সরকারি সুবিধা পোঁছে—অর্থাৎ দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও দলীয় মনোবৃত্তি কাজ না করে। 

শিক্ষা খাতেও বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে, এ খাতে বরাদ্দ ১ লাখ ২২ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ১৩ দশমিক ০৬ শতাংশ এবং জিডিপির ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। পর্যায়ক্রমে এ বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। তবে প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষি খাতের বরাদ্দ সংকুচিত হয়েছে। কৃষিভিত্তিক ৫টি মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪৬ হাজার ৮২১ কোটি টাকা, যা মোট বাজেট বরাদ্দের ৪.৯৯ শতাংশ। কৃষি খাতের বরাদ্দ কমানো ভালো লক্ষণ নয়। উচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতি হ্রাস ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের জন্য মোট বাজেটের কমবেশি ১০ শতাংশ অর্থ কৃষি খাতে বরাদ্দ করা উচিত। স্বাস্থ্যসেবা খাতের দুটি বিভাগে মোট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৬২ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। এটি মোট বরাদ্দের ৬ দশমিক ৭০ শতাংশ। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বৃদ্ধি ভালো উদ্যোগ। মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য এটি প্রয়োজন। তবে বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ যা-ই হোক, বাজেট বাস্তবায়নের ওপর জোর দিতে হবে। সে জন্য প্রথম দিকেই মন্ত্রণালয়ভিত্তিক রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে, বছরের কোন কোয়ার্টারে কত ব্যয় করা হবে। অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে অধিক ব্যয়ের প্রবণতা অপচয় ও দুর্নীতির সম্ভাবনা টেনে আনে। এ ছাড়া, অনেক মন্ত্রণালয় বরাদ্দকৃত অর্থ সম্পূর্ণ খরচ করতে পারে না। এটিও এক ধরনের অপচয়।

এবার বাজেটের অর্থায়নের প্রধান উৎস রাজস্ব বাজেট নিয়ে আলোচনা করা যাক। প্রতিবছরই রাজস্ব আহরণের জন্য একটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। রাজস্বের প্রায় ৮৫ শতাংশই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আহরণ করে। কিন্তু বিগত প্রায় এক যুগ যাবত কোনো বছরই এনবিআর লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আহরণ করতে পারে না। 

এনবিআরের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী চালু অর্থবছরে ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হতে পারে ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা, অর্থাৎ প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ঘাটতি হতে পারে। এনবিআর এর বর্তমান নীতি কাঠামো, প্রশাসনিক দক্ষতা ও প্রযুক্তির মাধ্যমে আগামী অর্থবছর ৬ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণ প্রায় অসম্ভব। তবে এনবিআর এর গতানুগতিক কার্যক্রম থেকে বেরিয়ে রাজস্ব সংস্কারের মাধ্যমে সক্ষমতা বাড়াতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন অন্তত প্রতিটি জেলায় কর, ভ্যাট ও কাস্টমস অফিস সম্প্রসারণ, জনবল নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। এনবিআর অটোমেশনের জন্য বিগত প্রায় ৫০ বছরে ২০টি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। বৈদেশিক সহায়তাপুষ্ট এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্বলতা, স্বচ্ছতার অভাব, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে বাস্তবায়ন তথা এনবিআর এর নিজস্ব কর্মচারী-কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণে অনীহা ও সীমাবদ্ধতা প্রকল্পগুলোর কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আনতে পারেনি। সে জন্য অটোমেশনে এনবিআর এর নিজস্ব জনবল অধিক হারে সম্পৃক্ত করতে হবে। এনবিআর এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর বাড়াতে হলে সব পর্যায়ে অটোমেশন অপরিহার্য। এর মাধ্যমে কর ফাঁকি ও দুর্নীতি রোধ হবে। 

দ্বিতীয়ত, দেশের জনগণের মধ্যে কর প্রদানের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন কর আদায়কারী কর্মকর্তা ও করদাতাদের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ও হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক। জনগণের করভীতি দূর করতে হলে কর্মকর্তাদের দ্বারা করদাতাদের হয়রানি দূর করার প্রশাসনিক পদ্ধতি গড়ে তুলতে হবে। 

তৃতীয়ত, রাজস্ব বাড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হচ্ছে করজাল সম্প্রসারণ। অধিক সংখ্যক করদাতা বাড়ানোর জন্য কর জরিপের পাশাপাশি ব্যবসা বাণিজ্যের উন্নয়ন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও শ্রমিক-চাকরিজীবীদের আয় অটোমেশন তথা ব্যাংকের মাধ্যমে প্রদান এবং কর অফিসের সঙ্গে সংযুক্তিসহ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা আনয়ন অপরিহার্য। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে রাজস্ব অফিসের সঙ্গে চাকরি ও ব্যবসা সংযুক্ত রয়েছে। ফলে কর আদায়ে কোনো অসুবিধা হয় না। 

চতুর্থত—রাজস্ব সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত মানবসম্পদের দক্ষতা উন্নয়নে জোর দিতে হবে। আধুনিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রযুক্তির ব্যবহার, বিধি-বিধান পরিপালন ও দুর্নীতি প্রতিরোধে সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। 

জনসাধারণের ওপর থেকে মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো এবং বাজেট ঘোষণার পর যাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম স্থিতিশীল থাকে, সে জন্য চাল, গম, ভোজ্য তেল, চিনি, মাছ-মাংস, পেঁয়াজ, আদা, মসলাসহ ৬০টি কৃষি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উৎসে করহার ৫ শতাংশ, ২ শতাংশ ও ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে। শিশুখাদ্যের কাঁচামালের আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ এবং মসলার ক্ষেত্রে আরডি ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০ (শূন্য) শতাংশ করা হয়েছে। বাজেট ঘোষণার পর দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়েনি। তবে শুল্কছাড়ের সুবিধা ব্যবসায়ীরাই ভোগ করবে, জনগণের ভোগ্যপণ্যের মূল্য কমার কোনো লক্ষণ নেই। আরো বেশ কিছু ব্যবসাবান্ধব সংস্কার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ইলেকট্রনিক পণ্য যেমন— মোবাইল ফোন, রেফ্রিজারেটর, এসি, ওয়াশিং মেশিন, সিসিটিভি ক্যামেরাসহ ব্যবহার্য ইলেকট্রনিক পণ্য স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের জন্য কাঁচামাল আমদানি ও দেশীয় বিক্রয় ও রপ্তানিতে শুল্ক অব্যাহতি ২০৩৪ সাল পর্যন্ত বহাল রাখা হয়ছে। এ ছাড়া ফ্লোট গ্লাস আমদানিতে ৪৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার এবং সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের উপকরণ আমদানিতে যাবতীয় শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে। এ ছাড়া কম্পিউটার ও এর যন্ত্রাংশ ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস খাতে আমদানি ও উৎপাদনের জন্য শুল্ক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। ইলেকট্রিক গাড়ি আমদানিতে পর্যাপ্ত শুল্ক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তবে দেশীয় গাড়ি উৎপাদনে পূর্বে প্রদত্ত সুবিধাই বহাল রাখা হয়েছে। ফলে দেশীয় উৎপাদিত গাড়ি প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে। একইভাবে কম্পিউটার ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস আমদানিতে শুল্ক কমানোর ফলে এসবের দেশীয় উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

তৈরি পোশাক ও বস্ত্র শিল্পসহ সকল প্রকার রপ্তানি পণ্যের কাঁচামাল আমদানিতে বন্ড সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এখন থেকে এনবিআর কর্তৃক বন্ড অডিট করা হবে না। অনেকের মতে বড় ব্যবসায়ী ও শিল্পখাতে যে সুবিধা সরকার দিয়েছে, তাতে তাদের লাভের পরিমাণ বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে, জনগণ এক সুফল পাক বা না-ই পাক। বন্ড সুবিধার আওতায় আমদানীকৃত কাপড়, কাগজ, অন্যান্য কাঁচামাল ইত্যাদি উৎপাদনের কাজে ব্যবহার না করে খোলাবাজারে বিক্রয় করার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এনবিআর কর্তৃক সম্পাদিত বন্ড অডিট অনেকটা প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে। অডিট বন্ধ করে দেওয়ার ফলে অসাধু ব্যবসায়ীদের সে ভয় আর থাকবে না। বন্ড সুবিধার অপব্যবহার আরো বৃদ্ধির সম্ভবনা দেখা দেবে।

দেশীয় কম্পানির করপোরেট করসহ বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের বিভিন্ন সুবিধা পাঁচ বছর বা ততোধিক সময় অপরিবর্তনীয় রাখার ব্যবস্থা ব্যবসা-বাণিজ্যে ও বিনিয়োগে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে কাজ করবে। একই সঙ্গে বড় ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের কর প্রদানের স্বচ্চতাও নিশ্চিত করতে হবে। ব্যবসায়ীদের উৎপাদন ও সরবরাহে উৎসে কর্তিত কর অনেক ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক ন্যূনতম কর হিসেবে বিবেচনা করা হতো। এবারের বাজেটে উৎসে কর্তিত করকে অগ্রিম কর হিসেবে বিবেচনার প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে ব্যবসায়ীদের করের বোঝা কম হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। 

এ ছাড়া তরুণ, নারী ও প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে সব ধরনের ফ্রিল্যান্সিং আয় ও কনটেন্ট ক্রিয়েশন থেকে অর্জিত আয় সম্পূর্ণ করমুক্ত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এসএমই খাতের পুরুষ উদ্যোক্তাদের ৫০ লাখ এবং নারী ও প্রতিবন্ধীদের ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্জিত আয় সম্পূর্ণ করমুক্ত থাকবে। এসবই ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব উদ্যোগ। কিডনি ডায়ালিসিস সেবা ও ক্যান্সারের ওষুধ প্রস্তুতের কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপ।

তবে এবারের বাজেটে মধ্যবিত্ত ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের ওপর করের চাপ বাড়বে। আয়কর প্রদানের ক্ষেত্রে করমুক্ত আয়সীমা ২৫ হাজার টাকা বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার করা হয়েছে, যা গত বছর বাজেট প্রণয়নের সময়ই নির্ধারণ করা হয়েছিল। নির্বাচিত সরকার এ সীমা চার লাখ টাকায় উন্নীত করলে নিম্ন আয়ের করদাতাদের করভার কিছুটা লাঘব হতো। অপরপক্ষে নিম্নতম করহার ৫ শতাংশ উঠিয়ে দেওয়া এবং ১০ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বিভিন্ন স্ল্যাব এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে যে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ব্যক্তি করদাতাদের করভার ১৫-১৭ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে। ব্যক্তিশ্রেণির কর নির্ধারণে নিজ জমিতে বাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে ফ্ল্যাটের মূল্যের ওপর ১৫ শতাংশ কর নির্ধারণ জমির মালিক ও নির্মাণকারী ডেভেলপারদের ক্ষতিগ্রস্ত করবে। 

রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাবের মতে, এবারের বাজেটে তারা ব্যবসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। আমদানীকৃত স্ক্র্যাপের ওপর শুল্কবৃদ্ধির ফলে রডের মূল্য বাড়ছে, টাইলস, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ইত্যাদির ওপরও অতিরিক্ত ডিউটি বসানো রয়েছে। উপরন্তু কলকারখানায় ব্যবহৃত বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ফলে নির্মাণ সামগ্রীর দাম বাড়ছে। তার ওপর নির্মিত ফ্ল্যাটের মূল্যের ওপর ১৫ শতাংশ করারোপ জমির মালিক ও ডেভেলপার উভয়ের করের বোঝা বাড়াবে। ফ্ল্যাটের দাম বৃদ্ধি পেলে ক্রেতা পাওয়া দুষ্কর হবে। রিহ্যাব সরকারকে উল্লিখিত করারোপ বাতিল করার জন্য অনুরোধ করেছে। 

প্রস্তাবিত বাজেটে ১০ লাখ টাকার ঊর্ধ্বে বিনিয়োগকৃত সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর ৫ শতাংশের পরিবর্তে ১০ শতাংশ হারে করারোপ পেনশনার, ক্ষুদ্র ও মধ্যবিত্ত সঞ্চয়কারীদের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা হিসেবে দেখা দেবে। যদিও সরকার বলছে, এটি অগ্রিম কর হিসেবে বিবেচিত হবে এবং পরবর্তী সময়ে সমন্বয় করে কর নির্ধারণ করা যাবে। ব্যাংক হিসাবের সুদ, সঞ্চয়পত্র বা অন্যান্য বিনিয়োগের মুনাফা থেকে কর কেটে রাখা অনেকের মতে এনবিআরের একটি অনৈতিক কাজ। কর আদায় বৃদ্ধির জন্য এ সহজ কাজটির বিকল্প হিসেবে করজাল বৃদ্ধি, কর ফাঁকি রোধ, কর অব্যাহতির সুবিধা বন্ধ করা ইত্যাদি পদক্ষেপের ফলে অনেক বেশি রাজস্ব বাড়বে, যা এনবিআরের গ্রহণ করা সময়ের দাবি।

রাজস্ব আদায় প্রক্রিয়াকে আধুনিকায়ন এবং গতিশীল করার জন্য কর প্রদান ও রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা উঠিয়ে দিয়ে এনবিআর সারা বছর কর প্রদানের নিয়ম চালু করেছে। প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) বিশেষ প্রণোদনা ও আর্থিক ছাড় এবং তৃতীয় ও চতুর্থ প্রান্তিকে বিলম্বের মাসুল ও জরিমানার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফলে করদাতারা বিলম্ব না করে যথাসময়ে কর প্রদানে উৎসাহিত হবেন।

এবারের বাজেটে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য আগামী ৫ বছরের একটি কর কাঠামো প্রস্তাব করা হয়েছে। এ কাঠামো অনুযায়ী ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকার করমুক্ত আয়সীমা আগামী ২ বছর বলবৎ থাকবে। ২০২৮-২৯ কর বর্ষ থেকে ২ বছরের জন্য করমুক্ত আয়সীমা হবে ৪ লাখ টাকা এবং ২০৩০-৩১ সালের জন্য করমুক্ত আয়সীসা হবে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এ ছাড়া কর আদায়কে প্রগ্রেসিভ হারে করার জন্য ২০২৮-২৯ করবর্ষ থেকে ৩৫ শতাংশের আর একটি উচ্চ স্ল্যাব সৃষ্টি করা হয়েছে। ৫ বছরের কর কাঠামোর পূর্বাভাষ ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়নে সহায়ক হতে পারে।

বাজেট অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গণতন্ত্রায়ণের জন্য এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্যে ১০টি প্রধান অগ্রাধিকার খাত চিহ্নিত করা হয়েছে। 

এগুলো হচ্ছে— (১) সবার জন্য উন্নয়ন (২) মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা (৩) সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা (৪) বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানমুখী অর্থনীতি (৫) ব্যবসা সহজীকরণ ও বিনিয়ন্ত্রণকরণ (৬) আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা (৭) জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা (৮) তথ্য-প্রযুক্তির বিকাশ (৯) পরিবেশ ও পানি ব্যবস্থাপনা (১০) দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা। 

সে লক্ষ্যে বাজেটের প্রতিপাদ্যই ছিল, ‘গণতান্ত্রিকীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণ : ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ’। তবে রূঢ় বাস্তবতা হলো— ভঙ্গুর ব্যাংক খাত, দীর্ঘ সময়ের মূল্যস্ফীতি, বেসামাল আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সামষ্টিক অর্থনীতির কতিপয় দুর্বল দিক। যেমন—বর্ধিত হারে ঋণের সুদ প্রদান, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও কৃষিতে ক্রমবর্ধমান ভর্তুকি এবং বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক প্রভাবে আমদানীকৃত দ্রব্যাদির উচ্চমূল্য। এসব মাথায় রেখে অর্থনীতির ‘ভঙ্গুর’ দশা দূর করার জন্য সুশাসন, দুর্নীতি প্রতিরোধ, বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং অপচয় রোধ করে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। তবেই বার্ষিক বাজেট উন্নয়নের কার্যকর নিয়ামক হিসেবে পরিগণিত হবে।

লেখক : সাবেক সিনিয়র সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান, সাবেক রাষ্ট্রদূত


 

তিস্তায় স্বস্তি : চীন সফরে বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থাপনার খুঁটি গাড়লেন প্রধানমন্ত্রী

মোস্তফা কামাল
তিস্তায় স্বস্তি : চীন সফরে বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থাপনার খুঁটি গাড়লেন প্রধানমন্ত্রী

সবে ঐতিহাসিক কারবালার ইতিহাস ও দর্শনের আলোকে পবিত্র আশুরা পালন হয়েছে। সে পানি বড় প্রাসঙ্গিক। অন্যতম প্রধান বিষয়ও। পানির জন্য হাহাকার কারবালার ট্র্যাজেডিকে এক চরম রূপ দেয়। কারবালার যুদ্ধের মূল শিক্ষা হলো—সব মানুষের পানির ওপর সমান অধিকার রয়েছে এবং অন্যায়ভাবে কাউকে পানির হক থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। প্রতিবেশীর ভূমিকায় বাংলাদেশ পানি প্রশ্নে বড় অভাগা। মারা কেবল ভাতে বা হাতে হয় না, পানিতেও যে হতে পারে, তা দেখিয়ে চলছে ভারত। আগ্রাসন বা আধিপত্য বিশ্বসভ্যতার ক্রমোন্নতির সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে পানির সহজলভ্যতা ও নদ-নদীর প্রবাহ। নীলনদের তীরে গড়ে ওঠা মিসরীয় সভ্যতা, টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিস বা দজলা-ফোরাতের তীরে গড়ে ওঠা মেসোপটোমিয়া সভ্যতা, সিন্ধুর তীরে সিন্ধু সভ্যতা এবং গঙ্গার তীরে গড়ে ওঠা প্রাচীন ভারতীয় ও বাংলার সভ্যতার বাইরে এশিয়া-আফ্রিকার ঐতিহাসিক বিবর্তনকে কল্পনা করা যায় না। ঠিক একইভাবে টেম্স, ভলগা, দানিউব ও রাইন নদীকে ঘিরেই তৈরি হয়েছিল ইউরোপের গড়ে ওঠার ইতিহাস।

কারবালার পানি নিয়ে যে দুঃখজনক ও নির্মম রাজনীতির সূচনা এর পরিণতিও ভোগ করতে হবে বিশ্ব মানবকে। তাই আজ পানি বিভিন্ন দেশের মধ্যে বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ফলে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছে অন্য দেশগুলো। নানান ঘটনা ও ঐতিহাসিক তথ্য সামনে এনে তাই কারো কারো মতে, পৃথিবীতে পানি নিয়ে যত যুদ্ধ বিগ্রহ হয়েছে অন্য কিছু নিয়ে এত হয়নি। পানি এবং এর হিস্যার কেওয়াজ পৃথিবীতে আজও বিদ্যমান। হাজার হাজার বছর ধরে দেশে দেশে প্রবাহমান এসব নদ-নদী এখনো যথারীতি প্রবাহিত। নদী উপত্যকা ও অববাহিকার কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা, ভূ-প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য এসব নদীর পানি ও নাব্যতার ওপর একচ্ছত্রভাবে নির্ভরশীল। নদ-নদীর পানি প্রবাহ অবারিত রাখা রাষ্ট্রের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। নগর সভ্যতা ও শিল্প-বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংঘাত বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক ফোরাম গঠনে ট্রান্সবাউন্ডারি বা যৌথনদীর পানিকেন্দ্রিক আঞ্চলিক বিরোধ মীমাংসা একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।

যৌথনদীর পানিকে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার কৌশল গ্রহণ করায় আগামী দশকগুলোতে অনেক দেশই পানি সংকটে বড় ধরনের বিপর্যয়ের সম্মুখীন। বিশ্বের মধ্যে যৌথনদীর উজানে পানি প্রত্যাহার ও বাঁধ নির্মাণের সবচেয়ে বড় বঞ্চনার শিকার বাংলাদেশ। গঙ্গা ও তিস্তার মতো আন্তর্জাতিক নদীতে বাঁধ নির্মাণ করে ভারত বাংলাদেশের নদ-নদী ও পানি ব্যবস্থাপনার ওপর বড় ধরনের আগ্রাসন সৃষ্টি করেছে। নদীবাহিত পলি দিয়ে গড়ে ওঠা বাংলাদেশ মূলত মানবসৃষ্ট ভূ-প্রাকৃতিক ভাগাড়ে পরিণত হবে। বাংলাদেশ বিশ্বের বৃহত্তম ব-দ্বীপ। উজানের হিমালয় থেকে নেমে আসা নদীগুলো বঙ্গোপসাগরে মিলে যাওয়ার আগে গঙ্গা বেসিনে লাখ লাখ টন পলিমাটি জমা করে তিলে তিলে হাজার হাজার বছরে এ দেশটিকে গড়ে তুলেছিল। উর্বর মাটি এবং অসংখ্য নদীর সুপেয় পানিই এ দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। উজান থেকে নদীর পানি প্রবাহ রুদ্ধ করা মানে ঠাণ্ডা মাথায় বাংলাদেশকে হত্যা করা। এমনিতেই আন্তর্জাতিক নদীর ওপর কোনো দেশের এককভাবে বাঁধ নির্মাণ বা পানি প্রত্যাহারের সুযোগ নেই।

আন্তর্জাতিক নদী আইনে এ সুযোগ নেই। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার প্রকল্প সবসময়ই অববাহিকা অঞ্চলের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনে। ভাটির অববাহিকার দেশ বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো চুক্তি বা সমঝোতা ছাড়াই ভারত একতরফভাবে ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণ করে। ভারতের সহযোগিতায় মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ফারাক্কা প্রকল্পের সমাপ্তি ও চালু করতে ভারতকে কোনো বেগ পেতে হয়নি। ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল থেকে ১ মে পর্যন্ত মাত্র ১০ দিনের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে ফারাক্কা ব্যারাজ চালুর অনুমতি দেয়। কার্যত বাংলাদেশের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কোনো চুক্তি ছাড়াই এদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নদীর পানি আটকে দিয়ে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা, প্রাণীবৈচিত্র্য, নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের ছাড়পত্র নিশ্চিত করে দেয়। একতরফাভাবে ফারাক্কা ব্যারাজ চালুর ৭ বছরের মাথায় গজলডোবা (তিস্তা) ব্যারাজ দিয়ে ফিডার ক্যানেলের মাধ্যমে তিস্তার পানি প্রত্যাহার শুরু করে।

ডাইভারশন ক্যানেলের মাধ্যমে মহানন্দা নদীতে পানি সরিয়ে নেয়ার কারণে তিস্তা এখন একটি মৃতপ্রায় নদীতে পরিণত হয়েছে। এ নিয়ে কান্নাকাটি, অনুনয়-বিনয় কিছুই ভারতের মন গলাতে পারেনি। সেখানে এখন আশার আলো। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে নদী ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতার বিষয়টি এসেছে সবিশেষ গুরুত্বে। আর সেখানে অন্যতম তিস্তা। প্রকল্পটি দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার প্রকল্পগুলোর একটি। নানা রাজনীতি-কূটনীতির এক পর্যায়ে ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের আগে দুই দেশের পানিসম্পদমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির বিষয়ে দুইপক্ষ একমত হয়েছিল। মনমোহন সিংয়ের সফরেই বহু প্রতীক্ষিত তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি হওয়ার কথা থাকলেও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতায় তা আটকে যায়। নরেন্দ্র মোদির বিজেপি সরকার ভারতের ক্ষমতায় আসার পর তিস্তা চুক্তি নিয়ে আশার কথা শোনা গেলেও মমতার মত বদলায়নি। সেই সঙ্গে মমতার দোহাই দিয়ে আরো বাড়তি ঝামেলা পাকায় বিজেপি সরকার। ২০২৪ সালের মে মাসে ঢাকা সফরে এসে তিস্তা প্রকল্পে অর্থায়নে ভারতের আগ্রহের কথা জানান দেশটির তখনকার পররাষ্ট্র সচিব বিনয় কোয়াত্রা। এরপর জুনে শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় তিস্তা মহাপরিকল্পনায় দেশটি যুক্ত হওয়ার আগ্রহ দেখায়।

এর অংশ হিসেবে ভারতের একটি কারিগরি দল দ্রুত বাংলাদেশ সফর করবে বলে শেখ হাসিনার সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সেই আলোচনার মাসখানেকের মাথায় ৫ অগাস্ট ঢাকায় ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পতন হয় শেখ হাসিনা সরকারের; দেশ ছেড়ে পালিয়ে ভারতে যান তিনি। ২০২৪ সালের অগাস্টে গণ-অভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার পুনরায় চীনের অর্থায়নেই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। ২০২৯ সালের মধ্যে প্রকল্পের প্রথম ধাপ বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। এ সময়ে এসে চীনের সহায়তায় তিস্তার দীর্ঘদিনের পানি সংকট ও নদী ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা কাটার দিশা দেখা যাচ্ছে। বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মধ্যকার বৈঠকে তিস্তা প্রকল্পসহ নদী ব্যবস্থাপনায় চীনের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত এ সময়ের আশা জাগানিয়া বড় খবর। নদী খনন, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, ভাঙন রোধ এবং নৌ চলাচল ব্যবস্থার আধুনিকায়নে চীন পূর্ণ সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে। এ সহযোগিতার আওতায় ‘তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প’ও অন্তর্ভুক্ত। পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশ সুরক্ষায় চীনের আরো বড় পরিসরের সহায়তা চেয়ে রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ক্ষমতা গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে তার নদী খনন কর্মসূচি চীন অবহিত।

যে কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ভারতের পানি আগ্রাসনের কাছে অসহায় না থেকে বন্যার ঝুঁকি হ্রাস করা, পরিবেশ সংরক্ষণ করা এবং পানিসম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। নিজস্ব পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার এ সক্ষমতায় চীন সহায়তা বাড়ালে বাংলাদেশকে আর পেছনে তাকাতে হবে না। সেখানে ‘তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প’ বাস্তবায়নে চীনের কারিগরি সহায়তা মিললে তা হবে সোনায় সোহাগার মতো। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের এ সংক্রান্ত সমঝোতা হয়েই আছে সেই ২০০৫ সালে। ২০০৫ সালে সই হওয়া ওই সমঝোতা স্মারকের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন তারেক রহমান। তিনি এও বলেছেন, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বাস্তবভিত্তিক ও অত্যন্ত গবেষণানির্ভর। পানিসম্পদ খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং টেকসই উন্নয়নকে এগিয়ে নিতে নতুন নতুন অংশীদারত্বের ক্ষেত্র অনুসন্ধানে দুই দেশের অঙ্গীকার এবার বৈঠকের মাধ্যমে আরো স্পষ্ট হয়েছে। তিস্তায় চীনের সম্পৃক্ততা নিয়ে ভারতের উদ্বেগ ছিল-আছে এবং থাকবেও। চীনের তরফে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সঙ্গে এই সহযোগিতার তৃতীয় কোনো পক্ষকে ‘লক্ষ্য করে নয়’। তৃতীয় কোনো পক্ষের ‘হস্তক্ষেপও চায় না’ তারা। মানে বার্তা পরিষ্কার।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, এ নিয়ে ভারতের উদ্বেগ থাকা স্বাভাবিক। কারণ তিস্তা সীমান্তের খুব কাছ দিয়ে প্রবাহিত। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে। আবার জীবিকার সঙ্গে সমপৃক্ত বিধায় তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প বাংলাদেশের জন্যও জরুরি। এমন শক্ত-পোক্ত কথার ফাঁকে আর কোনো ‘যদি-কিন্তু’র অবকাশ থাকতে পারে না। চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের সমান্তরালে পানিসম্পদমন্ত্রী লি কুওইংও পাকা কথা দিয়েছেন। কেবল তিস্তা নয়, বাংলাদেশের বিভিন্ন নদীর ব্যবস্থাপনায়ও নতুন চিত্র দেখার অধীর অপেক্ষায় দেশের মানুষ। তাদের চোখের সামনে ভাসছে নদীর দুই তীর সংরক্ষণ, খনন ও প্রশস্তকরণ, জলাধার ও ব্যারেজ উন্নয়ন। দৃশ্যপটে পাশেই আধুনিক সেচব্যবস্থা। নদী ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তিতে চীনের অগ্রগতি ও ম্যাজিক বাংলাদেশের মানুষকে এমন স্বপ্নের রাজ্যে নেয়াই স্বাভাবিক।

লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন

অন্তর্বর্তী সরকারের বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন ও জবাবদিহির আহ্বান

রাজনৈতিক বিশ্লেষক
অন্তর্বর্তী সরকারের বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন ও জবাবদিহির আহ্বান
সংগৃহীত ছবি

স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অভূতপূর্ব জনপ্রত্যাশার মধ্যে ড. মোহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসে। অনেক বাংলাদেশি এই পরিবর্তনকে দেশের রাজনৈতিক গতিপথ নতুন করে সাজানোর একটি সুযোগ হিসেবে দেখেছিলেন। নাগরিকরা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা, বৃহত্তর জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক শাসনে প্রত্যাবর্তনের আশা করেছিলেন। 

তবে অন্তর্বর্তী সরকারের আঠারো মাসের কর্মকাণ্ড নিয়ে গভীর বিতর্ক রয়ে গেছে। তাদের সমর্থকরা ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের পর শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর এবং কিছু প্রশাসনিক পরিবর্তনের কথা বললেও, সমালোচকদের মতে অন্তর্বর্তী সরকার প্রত্যাশা পূরণে উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যর্থ হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপক সংস্কার।

কিন্তু সমালোচকদের মতে, শাসনব্যবস্থা ক্রমশ অনির্বাচিত সুশীল সমাজের ব্যক্তিত্বদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। যাদের অনেকেই বিদেশি নাগরিক। এ ছাড়া সক্রিয় ছিল একটি প্রভাবশালী ‘কিচেন ক্যাবিনেট’। সেইসঙ্গে একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী যারা গণতান্ত্রিক জবাবদিহি ছাড়াই ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিল। সংস্কারের পরিবর্তে অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন আইনজীবী, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ এবং রাজনৈতিক কর্মীদের ব্যাপকহারে গ্রেপ্তার ও দীর্ঘ আটকাদেশের মাধ্যমে প্রতিশোধের রাজনীতির বাস্তবায়ন করেছে। তারা ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় কতজন ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে, আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত করা হয়েছে বা শেষ পর্যন্ত বিচার করা হয়েছে, তার বিস্তারিত বিবরণসহ জনসমক্ষে উত্থাপন না হওয়ায় প্রশ্ন উঠছে।

আরেকটি বড় সমালোচনা হলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কথিত রাজনৈতিকীকরণকে কেন্দ্র করে। সমালোচকদের মতে, অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আমলাতন্ত্র ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন অংশে তাদের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পেয়েছে। সুশাসন শক্তিশালী করার পরিবর্তে এই সময়ে উল্টো আত্ম-অহংকার, স্বজনপ্রীতি এবং দুর্নীতি বৃদ্ধি পেয়েছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ’র (টিআইবি) সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে এই উদ্বেগগুলো আরো জোরদার হয়েছে। সেখানে অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের সময় দুর্নীতির সূচক আরো খারাপ হওয়ার কথা বলা হয়।

সমালোচকরা যুক্তি দেন যে, স্বচ্ছ শাসনের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কার্যত জবাবদিহির কোনো ব্যবস্থা ছাড়াই পরিচালিত হয়। নির্বাচিত সরকারের মতো এর উপদেষ্টারা অর্থপূর্ণ সংসদীয় তদারকি বা জনসমীক্ষার আওতাধীন ছিলেন না। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ভূমিকাও ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। যদিও তিনি আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপকভাবে সম্মানিত এবং পশ্চিমা সরকার, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে শক্তিশালী সমর্থন পেয়েছেন।

সমালোচকদের মতে, তার প্রশাসন সরকারি পদকে ব্যক্তিগত স্বার্থ থেকে পৃথক করতে ব্যর্থ হয়েছে। ইউনূস ও তার সহযোগী সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও কর-সংক্রান্ত মামলা প্রত্যাহার এবং তার ব্যবসায়িক স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত সংস্থাগুলোকে জনশক্তি রপ্তানির লাইসেন্স প্রদানের মতো বিষয়গুলোকে বৃহত্তর জনসমীক্ষার দাবিদার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। একইভাবে, যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অনেকে এই চুক্তিকে দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেন।

তবে সমালোচকদের মতে, এই চুক্তি অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এর কারণে আমেরিকার কৌশলগত ও বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষা পাবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বকে সীমিত করার ঝুঁকি তৈরি করেছে।

সাধারণ নাগরিকদের জন্য সম্ভবত সবচেয়ে দৃশ্যমান হতাশার কারণটি হলো আইন-শৃঙ্খলার অবনতি। ‘মব’ যেন ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। অন্যদিকে ‘তাওহিদি জনতা’ নামে পরিচিত গোষ্ঠীগুলো ক্রমবর্ধমান আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। সমালোচকদের অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকার এই ধরনের গোষ্ঠীগুলোকে দৃঢ়ভাবে মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়েছে। যার ফলে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছে যেখানে আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ড ক্রমশ স্বাভাবিক হয়ে উঠে। এতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর জনগণের আস্থা ক্রমাগত হ্রাস পায়।

অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক মত প্রকাশের পরিসর সংকুচিত হওয়াটাও সমানভাবে উদ্বেগজনক ছিল। পরিস্থিতি এমন ছিল যে, শিল্পী, শিক্ষাবিদ, লেখক এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো নিজেদেরকে ক্রমশ কোণঠাসা অবস্থায় দেখতে পান। ভিন্নমত প্রকাশে তারা অনিচ্ছুক হয়ে পড়েন।

সমালোচকদের যুক্তি, বহুত্ববাদকে উৎসাহিত করার পরিবর্তে প্রশাসন প্রায়ই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হেয় প্রতিপন্ন করতে এবং ন্যায্য সমালোচনাকে স্তব্ধ করতে ‘ফ্যাসিস্ট’-এর মতো তকমা ব্যবহার করেছে। তারা আরও দাবি করেন যে, অন্তর্বর্তী সরকারের সমর্থকরা, জামায়াত ও এনসিপির পাশাপাশি, সমসাময়িক রাজনীতিতে একই ধরনের বাগাড়ম্বর ব্যবহার করে চলেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে (বিএনপি) রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টা ছিল চোখে পড়ার মতো।

বিএনপি-নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন এগারো-দলীয় জোটের সাম্প্রতিক গণবিক্ষোভ শুরুর ঘোষণা এই উদ্বেগগুলোকে আরো তীব্র করেছে।
সমালোচকরা এই বিক্ষোভগুলোকে কেবল গণতান্ত্রিক বিরোধিতা হিসেবেই দেখছেন না, বরং স্বাভাবিক সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার আরেকটি চক্র তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন।

এইসব ঘটনাপ্রবাহের পরিপ্রেক্ষিতে, এটা যুক্তিযুক্ত যে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সম্পর্কিত ত্রুটিগুলোর জন্য জামায়াত এবং এনসিপির রাজনৈতিক দায়ভার বহন করা উচিত। উভয় দলই এই আঠারো মাসের সময়কালে সৃষ্ট রাজনৈতিক পরিবেশ থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে লাভবান হয়েছে। এর ফলস্বরূপ তারা তাদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব বিস্তার করেছে।

একইভাবে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগকারী উপদেষ্টারাও তদন্তের আওতার বাইরে থাকতে পারেন না। ক্ষমতার অপব্যবহার, বেআইনি আটক, পক্ষপাতমূলক বিচার, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার বা স্বার্থের সংঘাতের যেকোনো অভিযোগ যথাযথ প্রক্রিয়ার অধীনে স্বাধীন তদন্তের দাবি রাখে। জবাবদিহিতা গণতান্ত্রিক শাসনের একটি মূল ভিত্তি এবং এটি নির্বাচিত ও অনির্বাচিত উভয় প্রশাসনের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত।

পরিশেষে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিচার হবে তার প্রতিশ্রুতির নিরিখে নয়, বরং তার রেখে যাওয়া কীর্তির নিরিখে। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা এবং গণতান্ত্রিক নবায়নের জন্য লাখো বাংলাদেশির আকাঙ্ক্ষা কেবল আংশিকভাবেই পূরণ হয়েছে।

বাংলাদেশকে যদি সামনে এগিয়ে যেতে হয়, তবে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা বা আন্তর্জাতিক সমর্থন নির্বিশেষে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের প্রতিটি প্রশাসনকে জবাবদিহিতার একই মানদণ্ডে বিচার করতে হবে। টেকসই গণতন্ত্র কোনো ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে না, বরং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, আইনের সমান প্রয়োগ এবং গণতান্ত্রিক নীতির প্রতি শ্রদ্ধার ওপর নির্ভর করে। 

নতুন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা : তিস্তা ও নদী ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ-চীন ঐকমত্য

সিরাজুল ইসলাম
নতুন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা : তিস্তা ও নদী ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ-চীন ঐকমত্য

বাংলাদেশের উন্নয়ন ভাবনায় পানি সবসময়ই একটি কেন্দ্রীয় বা মৌলিক উপাদান। বিশেষ করে নদীমাতৃক এই দেশে নদীর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সেই বাস্তবতায় তিস্তা নদী একদিকে যেমন উত্তরাঞ্চলের জীবনরেখা, অন্যদিকে তেমনি দীর্ঘদিনের একটি অমীমাংসিত সংকটের প্রতীক।

সাম্প্রতিক সময়ে বেইজিংয়ে বাংলাদেশ ও চীনের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে তিস্তা এবং অন্যান্য নদী ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতার যে ঐকমত্য তৈরি হয়েছে, তা এই দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার সমাধানের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে তিস্তা মহাপরিকল্পনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীভাঙন রোধ, সেচ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং নৌ-নেভিগেশন উন্নয়নের বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়।

এই আলোচনাকে কেবল একটি উন্নয়ন সহযোগিতা হিসেবে দেখা হলে বিষয়টির গভীরতা অনেকাংশেই কমে যাবে। কারণ এটি একই সঙ্গে একটি প্রযুক্তিগত প্রকল্প, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এবং কৌশলগত ভূরাজনৈতিক সমীকরণের অংশ।

তিস্তা : এক নদী, বহু সংকট

তিস্তা নদী বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই নদী বছরে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ ধারণ করে। বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানির কারণে ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি হয় যা ফসল, ঘরবাড়ি এবং অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি করে। অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কৃষিকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

এই দ্বৈত সংকটের কারণে তিস্তা অঞ্চলে দারিদ্র্য, অভিবাসন এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা দীর্ঘদিন ধরে চলমান। ফলে তিস্তা সমস্যা কেবল পানি বণ্টনের বিষয় নয়, বরং এটি একটি সামাজিক-অর্থনৈতিক সংকট।

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি ঝুলে থাকায় এই সমস্যা সমাধানের বিকল্প পথ অনুসন্ধানও জরুরি হয়ে উঠেছে। সেই প্রেক্ষাপটে চীনের সঙ্গে সহযোগিতার উদ্যোগ নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

চীনের সম্পৃক্ততা : প্রযুক্তি, অভিজ্ঞতা ও কৌশল

চীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তির অধিকারী দেশ। বড় নদী নিয়ন্ত্রণ, বন্যা প্রতিরোধ, বাঁধ নির্মাণ এবং সেচ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে তাদের অভিজ্ঞতা বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত।

বৈঠকে চীনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের পানি ব্যবস্থাপনায় কারিগরি সহায়তা, প্রশিক্ষণ এবং যৌথ গবেষণার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে যৌথ ফিজিবিলিটি স্টাডি পরিচালনার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো বড় অবকাঠামো প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়নের আগে বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা এবং বাস্তবভিত্তিক মূল্যায়ন অপরিহার্য।

এছাড়া, চীনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের পানি বিশেষজ্ঞদের প্রশিক্ষণের জন্য আমন্ত্রণ জানানো এবং টোটাল ওয়াটার রিসোর্স ম্যানেজমেন্টে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে প্রযুক্তি বিনিময় এবং দক্ষতা উন্নয়নের একটি নতুন প্ল্যাটফর্ম তৈরি হতে পারে।

উন্নয়ন সহযোগিতা থেকে কৌশলগত অংশীদারি

বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই অর্থনৈতিক সহযোগিতার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। অবকাঠামো উন্নয়ন, সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ এবং শিল্পখাতে চীনের বিনিয়োগ বাংলাদেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তবে তিস্তা প্রকল্পের মাধ্যমে এই সম্পর্ক আরো একটি নতুন স্তরে প্রবেশ করছে- যেখানে পানি ব্যবস্থাপনা এখন কেবল উন্নয়ন ইস্যু নয়, বরং কৌশলগত অংশীদারির অংশ।

কারণ পানিসম্পদ দক্ষিণ এশিয়ায় একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ভূ-রাজনৈতিক ইস্যু। আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর নিয়ন্ত্রণ, প্রবাহ এবং ব্যবহার শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক প্রভাবও তৈরি করে।

আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির নতুন সমীকরণ

তিস্তা প্রকল্পে চীনের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে। এই অঞ্চলে ভারত দীর্ঘদিন ধরে নদী ব্যবস্থাপনা ও পানি কূটনীতিতে প্রধান ভূমিকা পালন করে আসছে।

এখন চীনের সক্রিয় উপস্থিতি একটি নতুন ভারসাম্যের প্রশ্ন তৈরি করছে। তবে এটিকে সরাসরি প্রতিযোগিতা হিসেবে না দেখে বরং বহুপক্ষীয় সহযোগিতার অংশ হিসেবে দেখা হলে বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত সুবিধা তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশের অবস্থান এখানে অত্যন্ত সূক্ষ্ম। একদিকে বৃহৎ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা, অন্যদিকে জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণ—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা : সম্ভাবনা ও বাস্তব চ্যালেঞ্জ

তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে এটি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীভাঙন হ্রাস এবং সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন- সবই এই প্রকল্পের সম্ভাব্য ফলাফল।

তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জও কম নয়। বড় অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, অনেক বড় প্রকল্প যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিকল্পনার অভাবে প্রত্যাশিত ফল দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এছাড়া, প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ অর্থের সদ্ব্যবহার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অতীত সরকারের সময় বহু বড় প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল কিন্তু অর্থ লুটপাটের ঘটনাও ঘটেছে হরহামেশা।

এছাড়া, পরিবেশগত ভারসাম্য, নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকা- এই বিষয়গুলোও পরিকল্পনায় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিস্তার

এই বৈঠকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা। চীন বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার। তবে দুই দেশের বাণিজ্য ভারসাম্য এখনো চীনের পক্ষে বেশি ঝুঁকে আছে।

বৈঠকে বাংলাদেশ চীনে রপ্তানি বৃদ্ধির সুযোগ এবং বাজার সম্প্রসারণের বিষয়টি তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে চীনা বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

এই অর্থনৈতিক সহযোগিতা যদি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হয়, তাহলে তা শুধু নদী ব্যবস্থাপনায় নয়, সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক তাৎপর্য

চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং শি জিনপিংয়ের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের সাক্ষাত এই সফরকে কূটনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। দুটি চুক্তি ও ১৩টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এই ধরনের সমঝোতা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি করে, যা ভবিষ্যতে বিভিন্ন খাতে সহযোগিতার সুযোগ সৃষ্টি করে।

সম্ভাবনা ও সতর্কতার ভারসাম্য

সব মিলিয়ে বলা যায়, তিস্তা ও নদী ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ-চীন ঐকমত্য কেবল একটি অবকাঠামোগত প্রকল্প নয়; এটি একই সঙ্গে উন্নয়ন, প্রযুক্তি, অর্থনীতি এবং ভূ-রাজনীতির সমন্বিত একটি প্রক্রিয়া।

এই উদ্যোগ সফল হলে এটি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে পরিকল্পনার স্বচ্ছতা, বাস্তবায়নের দক্ষতা এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার ওপর।

কারণ বড় প্রকল্প যতটা সম্ভাবনা তৈরি করে, ততটাই ঝুঁকিও বহন করে। তাই এই নতুন সমীকরণকে শুধু আশাবাদের চোখে নয়, বরং বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিশ্লেষণ করাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক