এক সময় যে সেতু দিয়ে প্রতিদিন নির্বিঘ্নে চলাচল করতেন হাজারো মানুষ, এখন সেখানে রয়েছে ভাঙা কাঠামো আর নড়বড়ে একটি অস্থায়ী কাঠের সেতু। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেই সেতু পার হচ্ছেন পথচারী, শিক্ষার্থী, কৃষক, রোগী ও ছোট যানবাহনের চালকেরা।
দুই বছর আগে নতুন সেতু নির্মাণ শুরু হলেও কাজের গতি এতটাই ধীর যে, মেয়াদ শেষ হওয়ার এক বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও নির্মাণকাজ এখনো অর্ধেকেই আটকে আছে। এতে যশোরের মনিরামপুর উপজেলার অন্তত ২০টি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা যায়, ঘূর্ণিঝড়, আম্ফান ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পল্লী সড়ক অবকাঠামো পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় নেহালপুর ইউনিয়নের হাজিরহাট বাজার ভায়া কুলটিয়া ইউপি সড়কের ‘বড় খাল’-এর ওপর ২০ মিটার দীর্ঘ একটি আরসিসি গার্ডার সেতু পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রায় ২ কোটি ৭২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ব্যয়ে কাজটি পান সাতক্ষীরার পলাশপোলের ঠিকাদার মো. ইকবাল জমাদার। ২০২৪ সালের ১ মে কাজ শুরু হয়ে ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত মাত্র প্রায় ৫০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, পুরোনো সেতুর বেশির ভাগ অংশ ভেঙে ফেলা হয়েছে। নতুন সেতুর দুই পাশে পিলার নির্মাণ করা হলেও মূল কাঠামোর কাজ এখনও অসম্পূর্ণ। চলাচলের জন্য নির্মাণাধীন সেতুর পাশে কাঠের গুঁড়ি ও তক্তা দিয়ে তৈরি করা হয়েছে একটি অস্থায়ী সেতু। সময়ের সঙ্গে সেটিও নড়বড়ে হয়ে পড়েছে।
পথচারীরা ঝুঁকি নিয়ে হেঁটে পার হচ্ছেন। আর ভ্যান, মোটরসাইকেল ও সাইকেল ঠেলে কিংবা টেনে পার করতে হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে ভবদহ এলাকার জলাবদ্ধতার কারণে কাঠের সেতুটি পানির নিচে তলিয়ে গেলে এই সড়কে যোগাযোগ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
স্থানীয়রা জানায়, নেহালপুর-হাজিরহাট-কুলটিয়া সড়কটি এলাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ। প্রতিদিন অন্তত ২০টি গ্রামের চার থেকে পাঁচ হাজার মানুষ এই সড়ক ব্যবহার করেন। কিন্তু দীর্ঘসূত্রতায় সেতুর কাজ শেষ না হওয়ায় তাদের দুর্ভোগ দিন দিন বাড়ছে।
পদ্মনাথপুর গ্রামের ভ্যানচালক রফিকুল ইসলাম বলেন, দুই বছর ধরে একটু একটু করে কাজ হচ্ছে, কিন্তু শেষ হচ্ছে না। কাঠের সেতু দিয়ে ভ্যান পার করতে খুব কষ্ট হয়। এতে আয়ও কমে গেছে।
ডাঙ্গা মহিষদিয়া গ্রামের শ্রমিক আলমগীর হোসেন বলেন, শুকনো মৌসুমে কষ্ট করে চলাচল করা গেলেও বর্ষা এলে এই পথ প্রায় অচল হয়ে পড়ে। তখন দুর্ভোগের সীমা থাকে না।
পাঁচকাটিয়া গ্রামের ভ্যানচালক অজিত বিশ্বাস বলেন, যাত্রী নামিয়ে ভ্যান টেনে সেতু পার করতে হয়। প্রতিদিনই এই কষ্ট করতে হচ্ছে। দ্রুত সেতুর কাজ শেষ হওয়া দরকার।
হরিদাসকাটি গ্রামের কৃষক প্রণব বিশ্বাস বলেন, এই সড়কটি আমাদের সময় ও দূরত্ব দুটোই বাঁচায়। কিন্তু সেতুর কাজ শেষ না হওয়ায় দুই বছর ধরে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। কবে যে এর শেষ হবে, জানি না।
মনিরামপুর উপজেলা প্রকৌশলী মো. ফয়সাল আহমেদ বলেন, ভবদহ এলাকার দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে বছরে প্রায় ছয় মাস কাজ বন্ধ রাখতে হয়েছে। বর্তমানে শাটারিং ও পুরোনো সেতুর অবশিষ্ট অংশ অপসারণের কাজ চলছে। এরপর স্লাব ঢালাই শুরু হবে। কাজের গতি বাড়ানো হয়েছে। চলতি বছরের মধ্যেই সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করার চেষ্টা করছি।
ফয়সাল আহমেদ আরো বলেন, মানুষের চলাচলের সুবিধার্থে নির্মিত অস্থায়ী কাঠের সেতুটি নড়বড়ে হয়ে গেছে। ঠিকাদারকে এটি দ্রুত মেরামতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে ঠিকাদার মো. ইকবাল জমাদার বলেন, জলাবদ্ধতার কারণে পানি সেচে কাজ করতে হওয়ায় সময় বেশি লেগেছে। পুরোনো সেতু অপসারণের কাজ শেষ হলেই স্লাব ঢালাই শুরু হবে। আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে মূল কাজ শেষ করার আশা করছি। পাশাপাশি দুই দিনের মধ্যে অস্থায়ী কাঠের সেতুটিও মেরামত করা হবে।





