জাতীয় সংসদে সংবিধান সংস্কারের সুযোগ না পেলে জনগণের কাছেই যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, জনগণ গণভোটে সংবিধান সংস্কারের পক্ষে যে রায় দিয়েছে, তা বাস্তবায়ন না করায় দেশে নতুন রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে। গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ কার্যকর না করে কেবল সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
আজ বুধবার জাতীয় সংসদের এলডি হলে বাজেট-পরবর্তী মতবিনিময়সভায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি আরো বলেন, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সরকার জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করেছিল। দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলো একটি সংস্কার সনদে একমত হয়। জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে আয়োজনের বিষয়ে দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য হয়েছিল। জনগণ যে রায় দেবে, তা মেনে নেওয়ার অঙ্গীকারও ছিল। সেই রায়ের ভিত্তিতে একটি সংস্কার পরিষদ গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার পাশাপাশি সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেওয়ার বিষয়টি নির্ধারিত ছিল।
বিরোধীদলীয় নেতা অভিযোগ করেন, বিরোধী দলের সদস্যরা দুই ধরনের শপথ নিলেও সরকারি দলের সদস্যরা কেবল সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন। সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। সরকারের যুক্তি ছিল, বিষয়টি সংবিধানে নেই। সংবিধানে আগে অনেক কিছুই ছিল না। কিন্তু জাতীয় প্রয়োজনেই সেসব বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনও সংবিধানের বিধানে ছিল না। অতীতের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় গণভোটও সংবিধানে উল্লেখ ছিল না। তারপরও রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনেই সেগুলো বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। গণভোটে প্রায় ৬৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ সংবিধান সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছেন। কিন্তু সেই রায় কার্যকর না করে সরকার নতুন করে সংবিধান সংশোধনে কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে, যা জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
বিষয়টি সংসদে উত্থাপন করা হলেও কার্যকর আলোচনার সুযোগ দেওয়া হয়নি। পরে নোটিশের মাধ্যমে আলোচনা হলেও কোনো সিদ্ধান্ত বা রুলিং আসেনি। তাই সংসদে সুযোগ না পেলে জনগণের কাছেই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিরোধী দল। জনগণের দাবি নিয়ে আন্দোলন চলবে।
বাজেটের নানা দিক তুলে ধরে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। বাজেটে যেসব পণ্যের দাম কমানোর কথা বলা হয়েছে, জনগণ বাজারে তার বাস্তব প্রতিফলন দেখতে চায়। দ্রব্যমূল্য না কমলে বুঝব সিন্ডিকেটের স্বার্থে ভ্যাট-ট্যাক্স কমানো হয়েছে। তিনি বলেন, দলীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য আইন প্রণয়ন করা উচিত নয়। জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আইন করতে হবে। যেসব সংস্কার দেশে সুস্থ গণতান্ত্রিক ধারা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে, সেগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্যথায় দেশ বারবার সংকটে পড়বে।’
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘নির্বাচনের সময় দেশবাসীর কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকারি সুযোগ-সুবিধা সীমিত রাখার চেষ্টা করছি। তবে কেউ যদি আইনসিদ্ধ সুযোগ নিতে চান, সেটিকে অপরাধ হিসেবে দেখা উচিত নয়। নির্বাচনের সময় দেশবাসীর সামনে বলেছিলাম, সরকারি সুযোগ-সুবিধা যতটা না নিলে না হয় আমরা চেষ্টা করব। কিন্তু কেউ যদি এটা নিতে চায়, এখানে কোনো অপরাধ নেই। নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল, দলের কেউ নির্বাচিত হলে এমপি, মন্ত্রী বা অন্য কোনো দায়িত্বে থাকলেও বিনা ট্যাক্সে গাড়ি কিনবেন না এবং সরকারি প্লটের সুবিধা নেবেন না। কিন্তু কিছু মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে বিষয়টিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করছে। সংসদ সদস্যদের জন্য নির্ধারিত সরকারি ফ্ল্যাট ব্যক্তিগত সম্পদ নয়; এটি দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে ব্যবহারের জন্য দেওয়া হয়। কিছু মহল ইচ্ছাকৃতভাবে এই বিষয়গুলো নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করছে এবং ‘জল ঘোলা’ করার চেষ্টা করছে। এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।’
ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, ‘প্রবাসী শ্রমিকদের স্বার্থে সংসদে জোরালো অবস্থান নিয়েছি। বিদেশগামী কর্মীদের ভোগান্তি ও দালাল চক্রের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান অব্যাহত থাকবে। প্রবাসীদের পক্ষে আমরা সব সময় কথা বলেছি এবং বলব। মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর খরচ কমিয়ে আনার দাবিও আমরা তুলেছি। আমি বলেছি ৮৫ হাজার টাকায় লোক পাঠানো সম্ভব হওয়া উচিত। এই বক্তব্যের কারণে একটি সিন্ডিকেট ক্ষুব্ধ হয়েছে। তিনি বলেন, আমি কেন বললাম মালয়েশিয়ায় ৮৫ হাজার টাকায় লোক পাঠাতে হবে, এ নিয়ে একটি গোষ্ঠী আমার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু আমরা চাই, সাধারণ মানুষ কম খরচে বিদেশে যেতে পারুক। যারা বিদেশগামী শ্রমিকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে, সেই দালাল ও সিন্ডিকেটকে আইনের আওতায় আনতে হবে।’ প্রবাসীদের হয়রানি ও শোষণের সুযোগ বন্ধের দাবি জানান তিনি।







