• ই-পেপার

সন্তান প্রতিপালনে ইয়াকুব (আ.)-এর দূরদর্শিতা

প্রচলিত বীমা কোম্পানীতে চাকুরী করার বিধান

মুফতি ওমর বিন নাছির
প্রচলিত বীমা কোম্পানীতে চাকুরী করার বিধান
সংগৃহীত ছবি

একজন মুসলিমের জীবিকা যেমন ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত, তেমনি সেই জীবিকা অর্জনের মাধ্যমও হতে হবে হালাল ও শরীয়তসম্মত। বর্তমান যুগে বিভিন্ন পেশার মধ্যে বীমা কোম্পানীতে চাকুরী একটি বহুল প্রচলিত পেশা। অনেক মুসলিম জীবিকার প্রয়োজনে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করেন বা করতে আগ্রহী হন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—শরীয়তের দৃষ্টিতে বীমা কোম্পানীতে চাকুরী করা কি বৈধ?

প্রচলিত বীমার শরয়ি বিধান
বিশ্বের অধিকাংশ সমসাময়িক ইসলামী ফিকহ একাডেমি ও প্রখ্যাত আলেমগণের মতে প্রচলিত বাণিজ্যিক বীমা বৈধ নয়। কারণ এতে সাধারণত তিনটি বড় শরয়ী নিষিদ্ধ বিষয় বিদ্যমান থাকে— ১. সুদ (রিবা), ২.অতিরিক্ত অনিশ্চয়তা (গারার), ৩. জুয়া বা ভাগ্যের উপর নির্ভরতা (মাইসির)। এই তিনটি কারণেই আন্তর্জাতিক ইসলামী ফিকহ একাডেমি, বিভিন্ন ফতোয়া বোর্ড এবং বহু সমসাময়িক আলেম প্রচলিত বীমাকে শরীয়তসম্মত মনে করেন না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৭৫)
প্রচলিত বীমার অর্থনৈতিক কাঠামো যেহেতো সুদভিত্তিক বিনিয়োগ তাই এটা নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে যায়।

জাবির ইবন আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) সুদ গ্রহণকারী, সুদ প্রদানকারী, সুদের হিসাব লেখক এবং এর সাক্ষীদ্বয়—সবার ওপর লানত করেছেন এবং বলেছেন, তারা সবাই সমান।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ১৫৯৮)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, সুদের কার্যক্রমে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতাও অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ।

বীমা কোম্পানীতে চাকুরীর বিধান
যদি কোনো ব্যক্তি এমন একটি প্রচলিত বীমা কোম্পানীতে চাকুরী করেন, যেখানে তার কাজ সরাসরি— বীমা বিক্রি করা, পলিসি তৈরি করা, কমিশনভিত্তিক গ্রাহক সংগ্রহ করা, সুদভিত্তিক আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনা করা, এবং দাবি নিষ্পত্তি বা বীমা চুক্তি সম্পাদন করা। আর এসবই ইসলামে শরিয়তসম্মত পদ্ধতিতে হয় না। তাই অধিকাংশ সমসাময়িক আলেমের মতে এ ধরনের চাকুরী বৈধ নয়। কারণ এতে হারাম কার্যক্রমে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করা হয়, যা শরিয়তের নির্দেশনার পরিপন্থী।

সহায়ক বিভাগের চাকুরী
কোনো কোনো আলেমের মতে, যদি একজন ব্যক্তি নিরাপত্তাকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী বা এমন কোনো সাধারণ দায়িত্বে নিয়োজিত থাকেন, যার সঙ্গে বীমা চুক্তি বা সুদভিত্তিক কার্যক্রমের সরাসরি সম্পর্ক নেই, তাহলে বিষয়টি ভিন্নভাবে বিবেচিত হতে পারে। তবে অধিকাংশ ফকীহের মত হলো—যতদূর সম্ভব এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের চাকুরী থেকেও বিরত থাকা উত্তম; কারণ প্রতিষ্ঠানটির মূল কার্যক্রমই শরীয়তসম্মত নয়।

প্রচলিত বীমার বিকল্প পদ্ধতি হলো তাকাফুল
ইসলামী অর্থনীতিতে বীমার বিকল্প হিসেবে তাকাফুল ব্যবস্থা চালু হয়েছে। এখানে অংশগ্রহণকারীরা পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে ঝুঁকি ভাগাভাগি করেন। এতে সুদ, জুয়া ও অতিরিক্ত অনিশ্চয়তা পরিহারের চেষ্টা করা হয় এবং শরীয়াহ তত্ত্বাবধায়ক বোর্ডের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালিত হয়। সহাবি আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র; তিনি শুধুমাত্র পবিত্র (হালাল) জিনিসই গ্রহণ করেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং  : ১০১৫)

অতএব, একজন মুসলিমের জন্য এমন জীবিকা অর্জনের চেষ্টা করা উচিত, যা হালাল এবং সন্দেহমুক্ত। তবে যদি জীবিকার চরম প্রয়োজন দেখা দেয় এবং অন্য কোনো হালাল বিকল্প সাময়িকভাবে না থাকে, তবে দ্রুত হালাল কর্মসংস্থানের চেষ্টা করা এবং আল্লাহর নিকট তাওবা ও সাহায্য প্রার্থনা করা উচিত। কেননা বাস্তব জীবনে অনেক মানুষ কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। এক্ষেত্রে অবশ্যই হালাল জীবিকার দিকে অগ্রসর হওয়ার আন্তরিক চেষ্টা করা জরুরি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল ও বরকতময় জীবিকা দান করুন, হারাম ও সন্দেহযুক্ত উপার্জন থেকে হিফাজত করুন এবং তাঁর সন্তুষ্টির পথে অটল থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন। 

তুরস্কে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রধানদের প্রথম আন্তর্জাতিক বৈঠক

ইসলামী জীবন ডেস্ক
তুরস্কে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রধানদের প্রথম আন্তর্জাতিক বৈঠক
সংগৃহীত ছবি

তুরস্কের গাজিয়ানতেপ শহরে ইসলামী বিশ্বের উচ্চশিক্ষা খাতে সহযোগিতা ও সমন্বয়ের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রধানদের আন্তর্জাতিক পরামর্শমূলক সভায় বিশ্বের ৪৩টি দেশের ৭০টিরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিত্বকারী ১০০ জনেরও বেশি উপাচার্য, বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতি ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অংশ নিয়েছেন।

এই ঐতিহাসিক সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইসলামী বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার করা, উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ এবং অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কার্যকর কৌশল নির্ধারণ করা। পাশাপাশি যৌথ গবেষণা সম্প্রসারণ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিনিময়, প্রাতিষ্ঠানিক গতিশীলতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই একাডেমিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়।

সম্মেলনের ফাঁকে সৌদি আরব, ফিলিস্তিন, মিসর, লিবিয়া, লেবানন, ভারত, থাইল্যান্ড, সার্বিয়া, গাম্বিয়াসহ বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয় প্রধানদের মধ্যে একাধিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এসব বৈঠকে একাডেমিক সহযোগিতার পরিধি আরো বিস্তৃত করা, গবেষণাভিত্তিক অংশীদারি গড়ে তোলা এবং ইসলামী বিশ্বের উন্নয়নে যৌথ বৈজ্ঞানিক প্রকল্প বাস্তবায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

সভার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় ছিল গাজা উপত্যকার শিক্ষাব্যবস্থা রক্ষা। অংশগ্রহণকারী শিক্ষাবিদরা যুদ্ধ ও মানবিক সংকটের মধ্যেও গাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। তুরস্কের উচ্চশিক্ষা পরিষদের প্রধান গাজার বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পাশে দাঁড়াতে ইসলামী বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতি সম্মিলিত দায়িত্ব পালনের আহবান জানান। তিনি বলেন, কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও যেন গাজার শিক্ষার্থীরা শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়, সে জন্য বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ ও কার্যকর সহযোগিতা জরুরি।

যেসব অভ্যাস মুসলিমদের মেধা শাণিত করে

মুফতি ওমর বিন নাছির
যেসব অভ্যাস মুসলিমদের মেধা শাণিত করে
সংগৃহীত ছবি

আল্লাহ তাআলা মানুষকে শুধু জ্ঞান অর্জনের জন্য সৃষ্টি করেননি। বরং সেই জ্ঞানকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর জন্য চিন্তা, বিবেচনা ও প্রজ্ঞার শক্তিও দান করেছেন। পবিত্র কোরআনে বারবার মানুষকে প্রশ্ন করা হয়েছে—‘তোমরা কি চিন্তা কোরো না?’ আরো আছে ‘তোমরা কি উপলব্ধি করবে না?’। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, ইসলাম অন্ধ অনুসরণের ধর্ম নয়; বরং গভীর চিন্তা, সঠিক বিচার ও আল্লাহর নির্দেশনার আলোকে জীবন পরিচালনার শিক্ষা দেয়।

আজকের যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেট ও আধুনিক প্রযুক্তি মুহূর্তের মধ্যে অসংখ্য তথ্য আমাদের সামনে হাজির করে। কিন্তু তথ্যের প্রাচুর্য সব সময় প্রজ্ঞার জন্ম দেয় না। বরং একজন মুসলিমের প্রকৃত শক্তি হলো—সে তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি চিন্তা করে, পরামর্শ নেয়, আল্লাহর ওপর ভরসা করে এবং ধীরস্থিরতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এসব অভ্যাসই মানুষের মেধাকে শানিত করে, চরিত্রকে পরিপক্ব করে এবং তাকে আল্লাহর নৈকট্যের পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। যেসব অভ্যাস মুসলিমদের মেধা শানিত করে সেগুলো হলো-

১. নিয়ত বিশুদ্ধ রাখা : যেকোনো কাজ শুরুর আগে একজন মুসলিম নিজেকে প্রশ্ন করে—আমি এই কাজটি কেন করছি? এর উদ্দেশ্য কী? রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সমস্ত কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। প্রত্যেক ব্যক্তি তাই পাবে, যার নিয়ত সে করেছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১)
নিয়ত শুধু আমলের সওয়াব নির্ধারণ করে না; এটি মানুষের চিন্তার দিকও ঠিক করে দেয়। যার উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি, তার সিদ্ধান্তেও ভারসাম্য আসে, অহংকার কমে এবং আত্মসমালোচনার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।

২. একান্তে বসে চিন্তা করা : ইসলামে গভীর চিন্তাকে বলা হয় তাফাক্কুর। এটি শুধু একটি মানসিক ব্যায়াম নয়; বরং একটি ইবাদতস্বরূপ অভ্যাস। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং রাত ও দিনের পরিবর্তনের মধ্যে জ্ঞানবানদের জন্য নিদর্শন রয়েছে। যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শুয়ে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা করে...।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৯০–১৯১)
আজ আমরা কঠিন কোনো প্রশ্ন এলেই প্রযুক্তির কাছে উত্তর খুঁজি। অথচ মানুষের সবচেয়ে গভীর উপলব্ধিগুলো জন্ম নেয় নীরব মুহূর্তে—যখন সে নিজেকে, জীবনকে এবং সৃষ্টিজগতকে নিয়ে চিন্তা করে। প্রযুক্তি তথ্য দিতে পারে, কিন্তু চিন্তা করার দায়িত্ব মানুষের নিজের।

৩. পরামর্শ গ্রহণ করা : মেধাবী মানুষ কখনো নিজেকে সর্বজ্ঞ মনে করে না। বরং সে অন্যদের অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা থেকে শিক্ষা নেয়। আল্লাহ তাআলা মুমিনদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে বলেন, ‘তাদের কাজকর্ম পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়।’ (সুরা : শুরা, আয়াত : ৩৮)

রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও বদর, উহুদ ও খন্দকের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করেছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের তথ্য, বিশ্লেষণ ও পরিসংখ্যান দিতে পারে; কিন্তু একজন অভিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ মানুষ আমাদের বাস্তব অবস্থা, পারিবারিক প্রেক্ষাপট, মানসিক অবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণ বিবেচনা করে পরামর্শ দিতে পারেন। তাই একজন মুসলিম তথ্যের পাশাপাশি মানুষের প্রজ্ঞাকেও মূল্য দেয়।

৪. আল্লাহর ওপর ভরসা—ইস্তিখারা করা : সব তথ্য সংগ্রহ, চিন্তা ও পরামর্শের পরও মানুষের জ্ঞান সীমিত। ভবিষ্যতের প্রকৃত কল্যাণ শুধু আল্লাহই জানেন। তাই ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয় সালাতুল ইস্তিখারা আদায় করতে এবং আল্লাহর কাছে উত্তম সিদ্ধান্তের তাওফিক কামনা করতে। জাবির (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের কোরআনের সুরা শেখানোর মতো গুরুত্ব দিয়ে ইস্তিখারা করার শিক্ষা দিতেন।’ (সহিহ বুখারি)
আর ইস্তিখারা মানে অলৌকিক স্বপ্নের অপেক্ষা করা নয়; বরং যথাসাধ্য চেষ্টা করার পর আল্লাহর কাছে নিজের বিষয়টি সোপর্দ করা এবং তাঁর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকা।

৫. ধীরস্থিরতা—তাড়াহুড়া না করা : তাড়াহুড়া অনেক সময় ভুল সিদ্ধান্তের কারণ হয়। ইসলাম ধৈর্য, স্থিরতা ও বিবেচনাপূর্ণ আচরণকে উৎসাহিত করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) এক সাহাবিকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘তোমার মধ্যে এমন দুটি গুণ রয়েছে, যা আল্লাহ ভালোবাসেন—সহনশীলতা ও ধীরস্থিরতা।’ (সহিহ মুসলিম)

তাই আজকের দ্রুতগতির পৃথিবীতে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, ই-মেইল বা বক্তব্য প্রকাশের আগে কিছু সময় বিরতি নেওয়া, পুনরায় যাচাই করা এবং ভালোভাবে চিন্তা-ভাবনা করে দেখা—এগুলোও এই ইসলামী শিক্ষার বাস্তব প্রয়োগ।

বিশেষভাবে লক্ষনীয় হলো-
মানুষ যখনই নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে সময় বাঁচিয়েছে, তখন সেই সময় আবার নতুন কাজ দিয়ে পূর্ণ করে ফেলেছে। কিন্তু একজন মুসলিমের দৃষ্টিতে এই অতিরিক্ত সময় একটি মূল্যবান আমানত। এই সময়ের কিছু অংশ যদি আমরা পিতা-মাতার সেবায়, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে, প্রতিবেশী ও সমাজের কল্যাণে, কোরআন তিলাওয়াত ও জ্ঞানচর্চায়, অথবা মসজিদে গিয়ে প্রশান্ত মনে ইবাদতে ব্যয় করি তবে সেই সময় সত্যিকার অর্থেই বরকতময় হয়ে ওঠে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যার আমলের পাল্লা ভারী হবে, সে থাকবে সন্তোষজনক জীবনে। আর যার আমলের পাল্লা হালকা হবে...।’ (সুরা : কারিয়াহ, আয়াত ৬–৯)

মেধা শুধুমাত্র জন্মগত প্রতিভার নাম নয়; এটি সঠিক অভ্যাসের ফল। প্রযুক্তি আমাদের অনেক কাজ সহজ করে দিতে পারে, কিন্তু বিবেক, প্রজ্ঞা, ঈমান এবং আল্লাহভীতি কখনো প্রযুক্তি দিয়ে প্রতিস্থাপন করা যায় না। একজন মুসলিমের শ্রেষ্ঠত্ব তথ্যের আধিক্যে নয়; বরং তথ্যকে হিকমতের সঙ্গে ব্যবহার করার মধ্যে। তাই আসুন, আমরা এমন অভ্যাস গড়ে তুলি, যা শুধু আমাদের বুদ্ধিমত্তাকেই শানিত করবে না; বরং আমাদেরকে আল্লাহর আরও নিকটবর্তী করবে। কারণ একজন প্রকৃত মুমিনের মেধা শুধু পৃথিবীতে সাফল্য আনে না—তা আখিরাতের মুক্তির পথও সুগম করে। আল্লাহ তাআলা আমাদের বুঝার তাওফিক দান করুক। আমিন। 

লেখক : আলেম ও সাংবাদিক

যে ১০ জন নারী সাহাবি পৃথিবীতেই জান্নাতের সুসংবাদ পেয়েছেন

আতাউর রহমান খসরু
যে ১০ জন নারী সাহাবি পৃথিবীতেই জান্নাতের সুসংবাদ পেয়েছেন
সংগৃহীত ছবি

মহানবী (সা.)-এর সাহাবিদের আল্লাহ শেষ নবীর উত্তরসূরি এবং দ্বিন ও শরিয়তের বাহক ও প্রচারক হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। তাঁরাও তাঁদের জীবনকে দ্বিন ইসলামের সেবায় উৎসর্গ করেছিলেন। পবিত্র কোরআনের একাধিক আয়াতে সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর ঈমান, ইখলাস, সততা ও পরহেজগারির প্রশংসা করা হয়েছে। আল্লাহ বলেছেন, ‘আল্লাহ তাদের অন্তরকে তাকওয়ার জন্য পরীক্ষা করেছেন। তাদের জন্য আছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার।’ (সুরা : হুজরা, আয়াত : ৩)

দ্বিনের জন্য ত্যাগ, বিসর্জন ও জীবনদানে নারী সাহাবিরা পুরুষদের থেকে পিছিয়ে ছিলেন না, বরং তাঁরা কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে অগ্রগামী ছিলেন। যেমন—ইসলামের জন্য প্রথম শাহাদাতবরণ করেন সুমাইয়া (রা.)। নারীদের এই আত্মত্যাগের স্বীকৃতিও দিয়েছে ইসলাম।
 
সুসংবাদপ্রাপ্ত ১০ নারী সাহাবি 
কমপক্ষে ২০ নারী সাহাবি দুনিয়ায় জান্নাতের সুসংবাদ লাভ করেছিলেন। যাঁদের ভেতর ১০ জনের সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা হলো—

১. খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ (রা.) : তিনি ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রথম স্ত্রী ও সন্তানদের মা। নারী-পুরুষ সবার ভেতর তিনিই সর্বপ্রথম ঈমান এনেছিলেন। যখন সবাই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিরোধিতায় লিপ্ত হয়েছে তিনি তাঁর জীবন, ভালোবাসা ও সম্পদ দ্বারা পাশে থেকেছেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, জিবরাইল (আ.) নবী (সা.)-এর কাছে হাজির হয়ে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! এই যে খাদিজা, একটি পাত্র হাতে নিয়ে আসছেন। এই পাত্রে তরকারি অথবা খাদ্যদ্রব্য অথবা পানীয় ছিল। যখন তিনি পৌঁছে যাবেন তখন তাঁকে তাঁর প্রতিপালকের পক্ষ থেকে এবং আমার পক্ষ থেকে সালাম জানাবেন আর তাঁকে জান্নাতের এমন একটি ভবনের সুসংবাদ দেবেন, যার অভ্যন্তর ভাগ ফাঁকা-মোতি দ্বারা তৈরি করা হয়েছে। সেখানে থাকবে না কোনো প্রকার শোরগোল; কোনো প্রকার দুঃখ-ক্লেশ।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৮২০)

২. ফাতিমা বিনতে মুহাম্মদ (রা.) : তিনি ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অতি আদরের কন্যা এবং আলী (রা.)-এর স্ত্রী। হাসান ও হুসাইন (রা.)-এর সম্মানিত মা। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত দীর্ঘ হাদিসে এসেছে, একবার ফাতিমা (রা.) নবীজি (সা.)-এর দরবারে উপস্থিত হন। নবীজি (সা.) তাঁর কানে কানে কিছু কথা বলেন। এতে তিনি প্রথমে কাঁদেন এবং পরে হাসেন। আয়েশা (রা.) কারণ জানতে চাইলে তিনি রহস্য প্রকাশ করতে অপারগতা পেশ করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর তিনি সেদিনের হাসি ও কান্নার কারণ জানান। তিনি বলেন, ‘তিনি প্রথমবার আমাকে বলেছিলেন, জিবরাইল (আ.) প্রতিবছর একবার আমার সঙ্গে কোরআন পাঠ করতেন, এই বছর দুইবার পড়ে শুনিয়েছেন। আমার মনে হয় আমার বিদায়ের সময় উপস্থিত এবং অতঃপর আমার পরিবারের মধ্যে তুমিই সর্বপ্রথম আমার সঙ্গে মিলিত হবে। তা শুনে আমি কেঁদে দিলাম। এরপর বলেছিলেন, তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে জান্নাতবাসী নারীদের অথবা মুমিন নারীদের তুমি সরদার হবে? এ কথা শুনে আমি হেসেছিলাম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৬২৩)

৩. আয়েশা বিনতে আবু বকর (রা.) : তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর তৃতীয় স্ত্রী ছিলেন। তাঁর পিতা আবু বকর সিদ্দিক (রা.) বয়স্ক পুরুষদের মধ্যে সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। নবীজি (সা.) স্ত্রীদের ভেতর তাঁকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন এবং তাঁর ঘরেই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকাল হয়। নবীজি (সা.)-এর ইন্তেকালের পর নববী জ্ঞানের প্রসারে তিনি অসামান্য অবদান রাখেন। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, নিশ্চয়ই জিবরাইল (আ.) সবুজ রঙের এক টুকরা রেশমি কাপড়ে তাঁর প্রতিচ্ছবি নিয়ে আসেন এবং বলেন, ইনি দুনিয়া ও আখিরাতে আপনার স্ত্রী। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ৩৮৮০)

এই হাদিসে যদিও আয়েশা (রা.)-কে সরাসরি জান্নাতি বলা হয়নি, কিন্তু জান্নাতি না হলে পরকালে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর স্ত্রী হওয়া সম্ভব নয়।

৪. হাফসা বিনতে উমর (রা.) : তিনি ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সম্মানিত স্ত্রী, ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর কন্যা। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ইবাদতগুজার নারী। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে (এক) তালাক দেন। তখন তাঁর কাছে জিবরাইল (আ.) এসে বলেন, হে মুহাম্মদ! আপনি হাফসাকে তালাক দিয়েছেন, অথচ তিনি অধিক পরিমাণে রোজা ও নামাজ আদায়কারী। তিনি জান্নাতে আপনার স্ত্রী। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে ফিরিয়ে নেন।’ (মুস্তাদরাকে হাকিম, হাদিস : ৬৭৯০)

৫. সুমাইয়া বিনতে খাইয়াত (রা.) : তিনি ছিলেন অগ্রগামী একজন নারী। ইসলাম গ্রহণের কারণে মক্কার মুশরিকরা তাঁকে, তাঁর ছেলে আম্মার (রা.) ও তাঁর স্বামী ইয়াসার (রা.)-এর ওপর অকথ্য নির্যাতন করে। আবু জাহাল তাঁর লজ্জাস্থানে বর্শা নিক্ষেপ করলে তিনি শাহাদাতবরণ করেন। তিনিই ছিলেন ইসলামের প্রথম শহীদ। উসমান ইবনে আফফান (রা.) বলেন, আমি আবু আম্মার, উম্মে আম্মার ও আম্মার (রা.)-এর উদ্দেশ্যে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, ‘হে ইয়াসার পরিবার! ধৈর্য ধারণ করো। তোমাদের প্রতিশ্রুত স্থান জান্নাত।’ (মুস্তাদরাকে হাকিম, হাদিস : ৫৬২০)

৬. উম্মে জুফারা (রা.) : এই নারী সাহাবি সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায় না। তিনি ছিলেন একজন দীর্ঘদেহী কৃঞ্চাঙ্গ নারী। তিনি মৃগী রোগে আক্রান্ত ছিলেন। আতা ইবনু আবু রাবাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) আমাকে বললেন, আমি কি তোমাকে একজন জান্নাতি নারী দেখাব না? আমি বললাম, অবশ্যই। তখন তিনি বললেন, এই কালো রঙের নারী, সে নবী (সা.)-এর কাছে এসেছিল। সে বলল, আমি মৃগী রোগে আক্রান্ত হই এবং তখন আমার লজ্জাস্থান খুলে যায়। সুতরাং আপনি আমার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করুন। নবী (সা.) বললেন, তুমি যদি চাও ধৈর্যধারণ করতে পারো। তোমার জন্য আছে জান্নাত। আর তুমি যদি চাও, তাহলে আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করি, যেন তোমাকে আরোগ্য করেন। স্ত্রী লোকটি বলল, আমি ধৈর্যধারণ করব। সে বলল, তখন আমার লজ্জাস্থান খুলে যায়, কাজেই আল্লাহর কাছে দোয়া করুন যেন আমার লজ্জাস্থান খুলে না যায়। নবী (সা.) তাঁর জন্য দোয়া করলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৬৫২)

৭. উম্মে সুলাইম রুমাইসা বিনতে মিলহান (রা.) : তিনি ছিলেন আনাস (রা.)-এর মা, তাঁকে গুমাইসাও বলা হতো। আনাস বিন মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আমি জান্নাতে প্রবেশ করলাম। সেখানে কারো চলার শব্দ পেলাম। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ইনি কে? তারা বলল, গুমাইসা বিনতে মিলহান, আনাস বিন মালিকের মা।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৬০৯৮)

৮. উম্মে হারাম বিন মিলহান (রা.) : তিনি ছিলেন উম্মে সুলাইম (রা.)-এর বোন, আনাস (রা.)-এর খালা এবং উবাদা বিন সামিত (রা.)-এর স্ত্রী। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত দীর্ঘ হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর শাহাদাতের জন্য দোয়া করেছিলেন এবং বাস্তবেও তিনি জিহাদ থেকে ফেরার সময় শহীদ হন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬২৮২)
আর শহীদের জন্য জান্নাত অবধারিত।

৯. ফাতেমা বিনতে আসাদ (রা.) : তিনি ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সম্মানিত চাচি ও আলী (রা.)-এর মা। তিনি ইন্তেকাল করলে রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজের কাপড় দিয়ে তাঁকে কাফন পরান, জানাজার নামাজের ইমামতি করেন এবং নিজ হাতে কবরে লাশ রাখেন। উমর (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনি ছিলেন মায়ের পরে আমার মা। আমি আমার কাপড় দিয়ে তাঁকে কাফন পরিয়েছি, যেন তাঁকে জান্নাতের কাপড় পরিধান করানো হয়। জিবরাইল (আ.) আমার রবের পক্ষ থেকে আমাকে জানিয়েছেন, তিনি জান্নাতি। (আল মুস্তাদরাক আলাস সহিহাইন, হাদিস : ৪৬৩১; আল মাফহুমুস সহিহ লিত-তাওয়াসসুল, পৃষ্ঠা : ৪৬)

১০. উম্মে রোমান বিনতে আমের (রা.) : তিনি ছিলেন আয়েশা (রা.)-এর সম্মানিত মা। তিনি ইসলাম গ্রহণে অগ্রগামী সাহাবিদের একজন ছিলেন। তাঁকে যখন কবরে রাখা হয়, তখন নবীজি (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি একজন জান্নাতি হুর দেখে আনন্দিত হতে চায়, সে যেন উম্মে রোমানকে দেখে।’ (তাবাকাতুল কুবরা, হাদিস : ১০৭১৩)
আল্লাহ আমাদেরও জান্নাতের অধিবাসী করুন। আমিন।