একজন পিতা শুধু পরিবারের উপার্জনকারী নন; তিনি একজন অভিভাবক, শিক্ষক, পথপ্রদর্শক এবং সন্তানের প্রথম আদর্শ। একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ অনেকাংশেই নির্ভর করে একজন পিতার চরিত্র, প্রজ্ঞা, ধৈর্য ও ভালোবাসার ওপর। ইসলাম একজন পিতার দায়িত্বকে অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে বিবেচনা করেছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর।’ (সুরা : তাহরিম, আয়াত : ৬)
অন্যদিকে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই একজন দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। একজন পুরুষ তার পরিবারের দায়িত্বশীল, তাই সে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৮৯৩)
কোরআনে মহান আল্লাহ এমন একজন পিতার জীবনের চিত্র অঙ্কন করেছেন, যিনি যুগে যুগে সব বাবার জন্য অনুসরণীয় আদর্শ। তিনি হলেন মহান আল্লাহর নবী ইয়াকুব (আ.)। সন্তান প্রতিপালনে ইয়াকুব (আ.)-এর দূরদর্শিতার পাঁচটি দিক তুলে ধরা হলো,
১. হালাল উপার্জন ও দায়িত্বশীলতা : নবী ইয়াকুব (আ.) ছিলেন পরিশ্রমী ও দায়িত্ববান একজন পিতা। ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী তিনি মেষপালন করতেন এবং নিজের পরিবারের জীবিকা হালাল উপার্জনের মাধ্যমে নির্বাহ করতেন। কঠিন দুর্ভিক্ষের সময়ও তিনি দায়িত্ব এড়িয়ে যাননি। বরং সন্তানদের মিসরে খাদ্য সংগ্রহের জন্য পাঠিয়েছিলেন। (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৫৮-৬৩)
তাই একজন আদর্শ পিতার উচিত, সন্তানকে শুধু অর্থ নয়, হালাল রিজিকের ব্যবস্থাও করে দিওয়া।
২. সন্তানের কল্যাণে অবিরাম দোয়া ও উপদেশ : নবী ইয়াকুব (আ.)-এর সন্তানরা তাঁর সঙ্গে অন্যায় আচরণ করেছিল। তাঁরা প্রিয় পুত্র ইউসুফ (আ.)-কে তাঁর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করেছিল। কিন্তু এত বড় কষ্ট পাওয়ার পরও তিনি কখনো তাদের জন্য দোয়া করা, উপদেশ দেওয়া কিংবা কল্যাণ কামনা করা বন্ধ করেননি। ইরশাদ হয়েছে, “তারা বলল, ‘হে আমাদের পিতা! আমাদের পাপের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয়ই আমরা অপরাধী ছিলাম।’ তিনি বললেন, ‘আমি শিগগিরই আমার প্রতিপালকের কাছে তোমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব। নিশ্চয়ই তিনিই পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৯৭-৯৮)
তাই এখানেই একজন আদর্শ পিতার পরিচয়—তিনি সন্তানের ভুলে ভেঙে পড়েন না; বরং তাদের সংশোধনের জন্য আল্লাহর দরবারে হাত তোলেন।
৩. প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও ধৈর্য ধারণ : যখন ছেলেরা ইউসুফ (আ.)-এর জামায় মিথ্যা রক্ত লাগিয়ে এনে বলল যে নেকড়ে তাকে খেয়ে ফেলেছে, তখন ইয়াকুব (আ.) তাদের কথাকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করেননি। তিনি ঘটনাটির অসংগতি বুঝতে পেরেছিলেন এবং অসাধারণ ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছিলেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘বরং তোমাদের মন তোমাদের জন্য একটি বিষয়কে সহজ করে দিয়েছে। অতএব, আমার করণীয় হলো উত্তম ধৈর্য (সবরুন জামিল)।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ১৮)
এই ঘটনাগুলো আমাদের শেখায়, একজন আদর্শ পিতা আবেগের বশবর্তী হয়ে সিদ্ধান্ত নেন না; বরং ধৈর্য, বিচক্ষণতা ও আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে পরিস্থিতি মোকাবেলা করেন।
৪. সহমর্মিতা প্রদর্শন করা : নবী ইয়াকুব (আ.) সন্তানদের সঙ্গে কঠোর শাসকের মতো নয়, বরং স্নেহময় অভিভাবকের মতো কথা বলতেন। তিনি তাদের কথা শুনতেন, মতামতের মূল্য দিতেন এবং ভালোবাসার ভাষায় সম্বোধন করতেন। তাঁর পরিবারে সংলাপ ছিল, দূরত্ব নয়। কোরআনে বিভিন্ন স্থানে আমরা দেখি, তিনি সন্তানদের পরামর্শ দিচ্ছেন, সতর্ক করছেন এবং আন্তরিকভাবে তাদের সঙ্গে কথা বলছেন। (দেখুন : সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৫ ও ৬৭)।
কেননা সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তাদের আত্মবিশ্বাসী, দায়িত্বশীল ও নৈতিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৫. ক্ষমাশীল হওয়া : একজন পিতার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো ক্ষমা করার ক্ষমতা। নবী ইয়াকুব (আ.)-এর ছেলেরা বছরের পর বছর তাঁকে শোক ও কষ্টের মধ্যে রেখেছিল। কিন্তু যখন তারা নিজেদের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাইল, তখন তিনি তাদের অপমান করেননি, প্রতিশোধ নেননি কিংবা প্রত্যাখ্যানও করেননি। বরং মমতাভরা হৃদয়ে বললেন, ‘আমি শিগগিরই আমার প্রতিপালকের কাছে তোমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব। নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৯৮)
এটাই একজন আদর্শ পিতার হৃদয়—যেখানে শাস্তির চেয়ে সংশোধনের আকাঙ্ক্ষা বড়, প্রতিশোধের চেয়ে ভালোবাসা গভীর।
আজকের পৃথিবীতে সন্তানের জন্য দামি পোশাক, উন্নত শিক্ষা কিংবা আর্থিক সচ্ছলতা নিশ্চিত করাই একজন পিতার একমাত্র দায়িত্ব নয়। প্রকৃত দায়িত্ব হলো তাদের ঈমান, চরিত্র, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ করে গড়ে তোলা। অতএব, প্রতিটি মুসলিম পিতার উচিত এই মহান নবীর জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে নিজের পরিবারকে একটি শান্তিময়, ঈমানসমৃদ্ধ ও আদর্শ পরিবারে রূপান্তরিত করার চেষ্টা করা। কারণ একজন সৎপিতা শুধু একটি সন্তান নয়, বরং একটি প্রজন্মকে গড়ে তোলেন। আর একজন আদর্শ পিতার সুশিক্ষা ও সচ্চরিত্রের প্রভাব সমাজ ও জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণেও অনন্য ভূমিকা রাখে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সব পিতাকে নবী ইয়াকুব (আ.)-এর উত্তম চরিত্র অনুসরণের তাওফিক দান করুন এবং আমাদের পরিবারগুলোকে ঈমান, ভালোবাসা ও কল্যাণে পরিপূর্ণ করে দিন। আমিন।




