• ই-পেপার

টেরোট কার্ডের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ জানা কি জায়েজ, ইসলাম কী বলে?

যে ৭ গুনাহ মানুষকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়

অনলাইন ডেস্ক
যে ৭ গুনাহ মানুষকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়
প্রতীকী ছবি

ক্ষণস্থায়ী পৃথিবী মুমিনের জন্য পরীক্ষার হলের মতো। পরকালে সফল হতে অবশ্যই এই পরীক্ষায় সফলকাম হতে হবে। এরপরই মিলবে কাঙ্ক্ষিত জান্নাত। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘জমিনের ওপর যা কিছু আছে আমি সেগুলোর শোভাবর্ধন করেছি, যাতে আমি মানুষকে পরীক্ষা করতে পারি যে, আমলের ক্ষেত্রে কারা উত্তম।’ (সুরা কাহাফ, আয়াত: ৭)

অপর আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা ঈমান এনেছে এবং নেক কাজ করেছে তাদের সুসংবাদ দাও, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাতসমূহ, যার তলদেশ দিয়ে নহরসমূহ প্রবাহিত হবে। (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৫)। আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘আর যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে, তারা জান্নাতের অধিবাসী। তারা সেখানে হবে স্থায়ী।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ৮২)

এজন্য দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনে গুনাহ বা পাপ কাজ থেকে নিজেকে রক্ষার পাশাপাশি আল্লাহর হুকুম ও রাসুল (সা.) এর আদর্শ এবং তাঁর দেখানো পথ অনুসরণ জরুরি। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে বর্ণিত হাদিসে বান্দাদের নানা বিষয়ে আদেশ-নিষেধ করেছেন নবীজি। এরমধ্যে একটি হাদিসে তিনি ধ্বংসকারী সাতটি কাজ থেকে বিরত থাকার কথা বলেছেন।

আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সাতটি ধ্বংসকারী বিষয় থেকে তোমরা বিরত থাকবে। এ কথা শুনে সাহাবীরা জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ! (সা.) সেগুলো কি? জবাবে নবীজি (সা.) বললেন, (১) আল্লাহর সঙ্গে শরীক করা, (২) যাদু, (৩) আল্লাহ তা’আলা যাকে হত্যা করা হারাম করেছেন, শরীয়ত সম্মত ব্যতিরেকে তাকে হত্যা করা, (৪) সুদ খাওয়া, (৫) ইয়াতিমের (এতিম) সম্পদ গ্রাস করা, (৬) রণক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যাওয়া এবং (৭) সরল প্রকৃতির সতী মুমিন নারীদের অপবাদ দেয়া। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৫৭৮)

বিবাহের ক্ষেত্রে পাত্র-পাত্রীর কুফু তথা সমতাবিধানের গুরুত্ব

ইসলামী জীবন ডেস্ক
বিবাহের ক্ষেত্রে পাত্র-পাত্রীর কুফু তথা সমতাবিধানের গুরুত্ব
সংগৃহীত ছবি

বিয়েতে সমতাবিধানকে আরবিতে ‘কুফু’ বলা হয়। ‘কুফু’ মানে ‘সমতা ও সাদৃশ্য’। অন্য কথায়, পাত্র-পাত্রীর ‘সমান-সমান হওয়া’, একের সঙ্গে অন্যজনের সামঞ্জস্য হওয়া। বিয়ের উদ্দেশ্য যখন স্বামী-স্ত্রীর মনের প্রশান্তি লাভ, উভয়ের মিলমিশ লাভের পথে বাধা বা অসুবিধা সৃষ্টির সামান্যতম কারণও যাতে না ঘটতে পারে, তার ব্যবস্থা করা একান্তই কর্তব্য। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তিনিই (আল্লাহ) মানুষকে সৃষ্টি করেছেন পানি থেকে। অতঃপর তিনি তার বংশগত ও বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। তোমার রব সর্বশক্তিমান।’ (সুরা : ফুরকান, আয়াত : ৫৪)

ইমাম বুখারি (রহ.) বুখারি শরিফে এই আয়াতকে ‘কুফু’ অধ্যায়ের সূচনায় উল্লেখ করেছেন। আল্লামা বদরুদ্দিন আইনি (রহ.) তার কারণ উল্লেখ করে লিখেছেন, এই আয়াতকে এখানে উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হচ্ছে এ কথা জানিয়ে দেওয়া যে বংশ ও শ্বশুর-জামাতার সম্পর্ক এমন জিনিস, যার সঙ্গে কুফুর ব্যাপারটি সম্পর্কিত। বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনে যাতে ভবিষ্যৎ বংশ রক্ষার ব্যবস্থা হয়, সেই দৃষ্টিতে কুফু রক্ষা করা একটা জরুরি বিষয়।

কুফুর মানে যদিও সমান বা সদৃশ, তবু বিয়ের ব্যাপারে কোন কোন দিক দিয়ে এর বিচার করা আবশ্যক, তা বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন। আল্লামা বদরুদ্দিন আইনি (রহ.) লিখেছেন, ‘কুফু’ ইসলামী বিশেষজ্ঞদের কাছে সর্বসম্মত ও গৃহীত। তবে সেটি প্রধানত গণ্য হবে দ্বিন পালনের ব্যাপারে। কাজেই মুসলিম মেয়েকে কাফিরের কাছে বিয়ে দেওয়া যেতে পারে না। এবং ব্যভিচারী পুরুষ ঈমানদার মেয়ের জন্য এবং ব্যভিচারী নারী ঈমানদার পুরুষের জন্য কুফু নয়।  কোরআনের এক আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তবে যে ব্যক্তি মুমিন, সে কি পাপাচারীর মতো? তারা সমান নয়।’ (সুরা : সাজদা, আয়াত : ১৮)

অর্থাৎ মুমিন ও ফাসিক এক নয়। তাদের মধ্যে কোনো রকমের সমতা ও সাদৃশ্য নেই।

ইমাম শাওকানি (রহ.) লিখেছেন, দ্বিনদারি ও চরিত্রের দিক দিয়ে কুফু আছে কি না—বিয়ের সময়ে তা অবশ্যই লক্ষ করতে হবে।

ইমাম শাফিঈ (রহ) ধন-সম্পত্তির দৃষ্টিতেও ‘কুফু’র গুরুত্ব স্বীকার করেছেন। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা এ কথা প্রমাণ করে না যে ধনী ও গরিবের সন্তানের মধ্যে পারস্পরিক বিয়ে হলে দাম্পত্যজীবনে তাদের সুখময় ভালোবাসার সৃষ্টি হতে পারে না। তবে এক তরফের ধন-ঐশ্বর্য ও বিত্ত-সম্পদের প্রাচুর্য অনেক সময় দাম্পত্যজীবনে তিক্ততারও সৃষ্টি করতে পারে—তা অস্বীকার করা যায় না।

ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম শাফিঈ (রহ.) একটি হাদিসের ভিত্তিতে বংশীয় ‘কুফু’র গুরুত্ব স্বীকার করেছেন।

ইমাম খাত্তাবি (রহ.) লিখেছেন, বহুসংখ্যক মনীষীর মতে, চারটি কুফুর বিচার গণ্য হবে : দ্বিনদারি, স্বাধীনতা (আজাদি), বংশ ও শিল্প-জীবিকা। তাঁদের অনেকে আবার দোষত্রুটিমুক্ত ও আর্থিক সচ্ছলতার দিক দিয়েও কুফুর বিচার গণ্য করেছেন। ফলে কুফু বিচারের জন্য মোট দাঁড়াল ছয়টি গুণ।

হানাফি মাজহাবে ‘কুফু’র বিচারে বংশমর্যাদা ও আর্থিক অবস্থাও বিশেষভাবে গণ্য। এর কারণ এই যে বংশমর্যাদার দিক দিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পার্থক্য হলে যদিও একজন অন্যকে ন্যায়সংগতভাবে ঘৃণা করতে পারে না, কিন্তু একজন অন্যজনকে অন্তর দিয়ে গ্রহণ করতে অসমর্থ হতে পারে—তা অস্বীকার করা যায় না। অনুরূপভাবে একজন যদি হয় ধনীর দুলাল আর একজন গরিবের সন্তান, তাহলে যদিও সেখানে ঘৃণার কোনো কারণ থাকে না, কিন্তু একজন যে অন্যজনের কাছে যথেষ্ট আদরণীয় নাও হতে পারে। এসব বাস্তবতা সামনে রেখে দ্বিনদারি ও নৈতিক চরিত্রের পাশাপাশি বংশমর্যাদা, জীবিকার উপায় ও আর্থিক অবস্থার বিচার হওয়াও অন্যায় কিছু নয়।

সাত শ্রেণির মানুষের জন্য ধ্বংসের সতর্কবার্তা

ইসলামী জীবন ডেস্ক
সাত শ্রেণির মানুষের জন্য ধ্বংসের সতর্কবার্তা
সংগৃহীত ছবি

পবিত্র কোরআন মানুষের আকিদা, ইবাদত, নৈতিকতা, সামাজিক আচরণ, পারিবারিক সম্পর্ক, অর্থনৈতিক লেনদেন এবং রাষ্ট্রীয় ন্যায়বিচার—জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কোরআন সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে। কোরআনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এটি যেমন সৎকর্মশীলদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছে, তেমনি অন্যায়, পাপাচার ও সীমালঙ্ঘনকারীদের জন্য কঠোর সতর্কবার্তাও ঘোষণা করেছে।

আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন আয়াতে ‘ওয়াইল’ ‘ধ্বংস হোক’ কিংবা অনুরূপ শব্দ ব্যবহার করে কিছু শ্রেণির মানুষের ভয়াবহ পরিণতির কথা উল্লেখ করেছেন। এসব সতর্কবার্তার উদ্দেশ্য মানুষকে হতাশ করা নয়; বরং আত্মসমালোচনা, তাওবা এবং চরিত্র সংশোধনের মাধ্যমে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা। কোরআনে যাদের ধ্বংসের সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে এমন সাত শ্রেণির মানুষের আলোচনা তুলে ধরা হলো।

১. অপবাদ, গীবত ও কুৎসা রটনাকারী
ইসলাম মানুষের সম্মানকে অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে বিবেচনা করেছে। কারও অনুপস্থিতিতে তার দোষচর্চা, অপবাদ, কুৎসা রটনা কিংবা বিদ্বেষ ছড়ানো ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করে। তাই কোরআন এদের জন্য কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—

 وَيْلٌ لِّكُلِّ هُمَزَةٍ لُّمَزَةٍ 

অর্থ : ‘ধ্বংস প্রত্যেক নিন্দাকারী ও পরনিন্দাকারীর জন্য।’ (সুরা : হুমাজাহ, আয়াত : ১)
তাই কোনো মানুষের সম্মানহানি করা একজন মুমিনের চরিত্র হতে পারে না।

২. যারা আন্দাজ ও অনুমানের ভিত্তিতে কথা বলে
প্রমাণ ছাড়া কথা বলা, গুজব ছড়ানো, অনুমানের ওপর ভিত্তি করে অভিযোগ তোলা কিংবা মিথ্যা তথ্য প্রচার করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আল্লাহ তাআলা বলেন, 

 قُتِلَ الْخَرَّاصُونَ 

অর্থ : ‘ধ্বংস হোক সেইসব লোকের, যারা অনুমান ও আন্দাজের ভিত্তিতে কথা বলে।’ (সুরা : জারিয়াত, আয়াত : ১০)
বর্তমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এই নির্দেশনা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। তাই যাচাই ছাড়া কোনো সংবাদ প্রচার করা একজন মুমিনের শোভনীয় নয়।

৩. যারা আল্লাহর সঙ্গে শরিক করে
শিরক হলো আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বড় গুনাহ। একমাত্র তাওবার মাধ্যমে এ গুনাহ থেকে মুক্তি সম্ভব। আল্লাহ তাআলা বলেন—

 فَوَيْلٌ لِّلْمُشْرِكِينَ

অর্থ : ‘অতএব ধ্বংস সেই মুশরিকদের জন্য।’ (সুরা ফুসসিলাত, আয়াত : ৬)
তাই তাওহিদের ওপর অবিচল থাকা একজন মুসলিমের সর্বপ্রথম দায়িত্ব।

৪. যারা আল্লাহর নামে মিথ্যা কথা বলে
ধর্মের নামে মনগড়া কথা বলা, প্রমাণ ছাড়া কোনো বিষয়কে হালাল বা হারাম ঘোষণা করা কিংবা আল্লাহর বিধান বিকৃত করা অত্যন্ত ভয়াবহ অপরাধ। আল্লাহ তাআলা বলেন, 

 وَلَا تَقُولُوا لِمَا تَصِفُ أَلْسِنَتُكُمُ الْكَذِبَ هَٰذَا حَلَالٌ وَهَٰذَا حَرَامٌ لِّتَفْتَرُوا عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ ۚ إِنَّ الَّذِينَ يَفْتَرُونَ عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ لَا يُفْلِحُونَ 

অর্থ : ‘তোমাদের জিহ্বা মিথ্যা বলে যা বর্ণনা করে, তা বলে দিও না—'এটি হালাল, এটি হারাম'; এভাবে আল্লাহর নামে মিথ্যা আরোপ করো না। নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর নামে মিথ্যা রচনা করে তারা কখনো সফল হবে না।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ১১৬)

৫. যারা মানুষকে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ ও অপমান করে
অহংকার, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য, বিদ্রূপ ও অপমান মানুষের হৃদয়ে ক্ষত সৃষ্টি করে এবং সমাজে বিদ্বেষের জন্ম দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন,

 وَيْلٌ لِّكُلِّ هُمَزَةٍ لُّمَزَةٍ

অর্থ : ‘ধ্বংস প্রত্যেক বিদ্রূপকারী ও দোষারোপকারীর জন্য।’ (সুরা : হুমাজাহ, আয়াত : ১)
তাই একজন প্রকৃত মুমিন মানুষের সম্মান রক্ষা করে, তাকে অপমান করে না।

৬. প্রত্যেক মিথ্যাবাদী ও পাপাচারী
মিথ্যা মানুষের ঈমানকে দুর্বল করে এবং যারা পাপকে নিজেদের অভ্যাসে পরিণত করে। তাই কোরআন এদের জন্যও কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,

 وَيْلٌ لِّكُلِّ أَفَّاكٍ أَثِيمٍ 

অর্থ : ‘ধ্বংস প্রত্যেক মিথ্যাবাদী ও পাপাচারীর জন্য।’ (সুরা : জাসিয়াহ, আয়াত : ৭)
তাই একজন মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো সত্যবাদিতা এবং আমানতদারিতা।


৭. যারা ওজনে ও পরিমাপে কম দেয়
ইসলামে ব্যবসা-বাণিজ্যে সততা অপরিহার্য। ওজনে কম দেওয়া, প্রতারণা করা কিংবা মানুষের হক নষ্ট করা বড় গুনাহ। আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَيْلٌ لِّلْمُطَفِّفِينَ

অর্থ : ‘ধ্বংস তাদের জন্য, যারা মাপে ও ওজনে কম দেয়।’ (সুরা : মুতাফফিফিন,আয়াত : ১)
এই আয়াত ব্যবসায়িক সততা ও ন্যায়পরায়ণতার মৌলিক শিক্ষা প্রদান করে।

অতএব, আসুন, আমরা কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে নিজেদের আকিদা, চরিত্র ও আমলকে শুদ্ধ করি। সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা, সততা, বিনয় ও মানুষের সম্মান রক্ষার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কোরআনের সতর্কবার্তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে নেক আমলের জীবন গড়ে তোলার তাওফিক দান করুন। আমিন।

স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক মনোমালিন্য এড়াতে নববী নির্দেশনা

মুফতি ওমর বিন নাছির
স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক মনোমালিন্য এড়াতে নববী নির্দেশনা
সংগৃহীত ছবি

মানুষের জীবনে এমন কোনো সম্পর্ক নেই যেখানে কখনো মতভেদ, অভিমান বা ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয় না। বন্ধুত্ব, আত্মীয়তা কিংবা দাম্পত্য—প্রত্যেক সম্পর্কেই কখনো না কখনো পরীক্ষার মুহূর্ত আসে। তবে একটি সম্পর্কের সফলতা নির্ভর করে মতভেদ না হওয়ার ওপর নয়; বরং মতভেদকে কীভাবে প্রজ্ঞা, ধৈর্য, ক্ষমাশীলতা ও ভালোবাসার মাধ্যমে সমাধান করা হয়, তার ওপর।

ইসলাম দাম্পত্য জীবনকে শুধু একটি সামাজিক চুক্তি হিসেবে নয়, বরং পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়া, সম্মান ও দায়িত্বের এক পবিত্র বন্ধন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

 وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُمْ مِّنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِّتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَوَدَّةً وَرَحْمَةً 

অর্থ : ‘আর তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে একটি হলো, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি লাভ করো। আর তিনি তোমাদের মধ্যে সৃষ্টি করেছেন ভালোবাসা ও দয়া।’ ‍(সুরা : রূম, আয়াত : ২১)

এই আয়াত আমাদের শেখায়, দাম্পত্য জীবনের ভিত্তি হলো সাকিনা (প্রশান্তি), মাওয়াদ্দাহ (ভালোবাসা) এবং রহমাহ (দয়া)। তাই টানাপোড়েন দেখা দিলেও সম্পর্ক রক্ষা করার মানসিকতাই একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য।

অনেকেই মনে করেন, পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ, মহানবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর সংসারে কখনো কোনো মতভেদ বা অভিমান ছিল না। বাস্তবতা কিন্তু ভিন্ন। ইসলাম মানুষকে কল্পনার জগৎ নয়, বাস্তব জীবনের শিক্ষা দেয়। নবীজির সম্মানিত স্ত্রীগণেরও স্বাভাবিক আবেগ, অনুভূতি, অভিমান ও চাওয়া-পাওয়া ছিল। আর রাসুলুল্লাহ (সা.) অসীম ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও ন্যায়পরায়ণতার মাধ্যমে সেসব পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছেন। এ কারণেই তাঁর সংসার প্রতিটি মুসলিম পরিবারের জন্য আদর্শ।

রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত সাদাসিধে জীবনযাপন করতেন। এমনও মাস কেটে যেত যখন তাঁর ঘরে রান্নার জন্য চুলা জ্বলত না। তিনি ও তাঁর পরিবার খেজুর ও পানি খেয়ে দিন অতিবাহিত করতেন। অথচ আল্লাহ চাইলে পৃথিবীর সমস্ত সম্পদ তাঁর সামনে এনে দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি দুনিয়ার চাকচিক্যের পরিবর্তে আখেরাতের স্থায়ী সফলতাকেই বেছে নিয়েছিলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৪৫৯)

দাম্পত্য জীবনে মতবিরোধ দেখা দিলে কীভাবে সংযমী আচরণ করতে হয়, তার একটি সুন্দর দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় হাফসা (রা.)-এর একটি ঘটনায়। একবার কথোপকথনের সময় ওমর (রা.) তাঁর কন্যা হাফসা (রা.)-এর একটি আবেগপূর্ণ কথায় অসন্তুষ্ট হয়ে পড়েন। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে শান্ত করেন এবং পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত হতে দেননি। এ ঘটনা আমাদের শেখায়, রাগের মুহূর্তে উচ্চারিত প্রতিটি কথাকে বড় করে দেখা কিংবা সম্পর্ক নষ্ট করার কারণ বানানো উচিত নয়। বরং সংযম ও সহনশীলতাই প্রকৃত প্রজ্ঞার পরিচয়। (সিরাতে হালাবিয়্যা, ৩/২১৭)

এক সময় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সম্মানিত স্ত্রীরা সংসারের ভরণপোষণে কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্য কামনা করেছিলেন। বিষয়টি জানার পর আবু বকর (রা.) ও ওমর (রা.) নিজেদের কন্যাদের শাসন করতে চাইলেও রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁদের সে সুযোগ দেননি। কারণ, স্বামীর কাছে প্রয়োজন বা সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু চাওয়া কোনো অপরাধ বা অবাধ্যতা নয়। তিনি বিষয়টিকে পারিবারিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। (হায়াতুস সাহাবা, ২/৬৮৪)

তবে যখন দুনিয়াবি চাহিদার বিষয়টি বারবার সামনে আসে, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) মানসিকভাবে কষ্ট পান। সেই কষ্টে তিনি প্রায় এক মাস স্ত্রীদের থেকে আলাদা অবস্থান করেন। এ সময় সমাজে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, তিনি নাকি তাঁদের তালাক দিয়েছেন। পরে ওমর (রা.) এসে সত্যতা যাচাই করেন এবং জানতে পারেন, তালাকের ঘটনা ঘটেনি। তারপর তিনি পরিবেশকে স্বাভাবিক করতে হাস্যরসের মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মন প্রফুল্ল করার চেষ্টা করেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫১৯১, সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৪৭৯)

এরপর আল্লাহ তাআলা একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা অবতীর্ণ করেন। তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে নির্দেশ দেন, তাঁর স্ত্রীদের সামনে দুটি পথ উপস্থাপন করতে—একদিকে দুনিয়ার আরাম-আয়েশ, অন্যদিকে আল্লাহ, তাঁর রাসুল ও আখেরাতের সফলতা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُل لِّأَزْوَاجِكَ إِن كُنتُنَّ تُرِدْنَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا فَتَعَالَيْنَ أُمَتِّعْكُنَّ وَأُسَرِّحْكُنَّ سَرَاحًا جَمِيلًا ۝ وَإِن كُنتُنَّ تُرِدْنَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَالدَّارَ الْآخِرَةَ فَإِنَّ اللَّهَ أَعَدَّ لِلْمُحْسِنَاتِ مِنكُنَّ أَجْرًا عَظِيمًا

অর্থ : ‘হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদের বলুন, যদি তোমরা পার্থিব জীবন ও তার সৌন্দর্য কামনা কর, তবে এসো, আমি তোমাদের কিছু ভোগ-সামগ্রী দিয়ে সুন্দরভাবে বিদায় করে দেব। আর যদি তোমরা আল্লাহ, তাঁর রাসুল ও আখেরাত কামনা কর, তবে জেনে রাখো, আল্লাহ তোমাদের মধ্যে সৎকর্মশীলদের জন্য মহাপুরস্কার প্রস্তুত করে রেখেছেন। (সুরা : আহজাব, আয়াত : ২৮–২৯)

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সকল স্ত্রী আল্লাহ, তাঁর রাসুল এবং আখেরাতকেই বেছে নিয়েছিলেন। এ সিদ্ধান্ত তাঁদের ঈমান, ত্যাগ ও আল্লাহভীতির অনন্য দৃষ্টান্ত। এ ছাড়াও রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বামীদের উদ্দেশ্যে বলেছেন,

خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ، وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي

অর্থ : ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে তার পরিবারের সঙ্গে সর্বোত্তম আচরণ করে। আর আমি আমার পরিবারের সঙ্গে তোমাদের সবার চেয়ে উত্তম আচরণ করি।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ৩৮৯৫)
আবার আল্লাহ তাআলা স্বামীদের নির্দেশ দিয়ে বলেন,

وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ

অর্থ : ‘তোমরা তাদের সঙ্গে উত্তম ও সদাচরণে জীবনযাপন কর।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১৯)
এসব শিক্ষা আমাদের বুঝিয়ে দেয়, একটি সুখী সংসারের জন্য ধৈর্য, ক্ষমাশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সংযম, ন্যায়বিচার এবং আন্তরিক যোগাযোগ কতটা অপরিহার্য। রাগের মুহূর্তে কঠোর সিদ্ধান্ত না নেওয়া, অভিমানকে দীর্ঘস্থায়ী না করা এবং একে অপরের অনুভূতির মূল্য দেওয়াই নববি আদর্শ।

নবী করিম (সা.)-এর দাম্পত্য জীবন ছিল বাস্তব জীবনের একটি পরিপূর্ণ আদর্শ। সেখানে মতভেদ ছিল, অভিমান ছিল, পারিবারিক চাহিদা ছিল; কিন্তু ছিল না অবিচার, প্রতিশোধ, অপমান কিংবা সম্পর্ক ভেঙে দেওয়ার তাড়াহুড়ো। বরং ছিল ধৈর্য, ন্যায়, প্রজ্ঞা, ভালোবাসা, ক্ষমা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে সর্বাগ্রে রাখার মানসিকতা।

আজ আমাদের অনেক সংসার ভেঙে যায় সামান্য ভুল বোঝাবুঝি, অহংকার, রাগ বা যোগাযোগের অভাবে। অথচ যদি আমরা মহানবী (সা.) শিক্ষা অনুসরণ করি—রাগের সময় সংযম অবলম্বন করি, একে অপরকে ক্ষমা করি, পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখি এবং আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে সংসার পরিচালনা করি—তবে ইনশাআল্লাহ আমাদের পরিবার হবে শান্তিময়, ভালোবাসায় পরিপূর্ণ এবং আখেরাতের সফলতার একটি মাধ্যম। সত্যিই, নববি আদর্শ অনুসরণই একটি সুখী, স্থিতিশীল ও বরকতময় দাম্পত্য জীবনের সর্বোত্তম পথ।