মানুষ এই পৃথিবীতে নানা সম্পর্ক, স্বপ্ন, আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং সম্পদের মোহে জীবন অতিবাহিত করে। কেউ পরিবার-পরিজনের সুখের জন্য নিরলস পরিশ্রম করে, কেউ সম্পদ অর্জনের প্রতিযোগিতায় নিজেকে ব্যস্ত রাখে, আবার কেউ সম্মান ও মর্যাদার পেছনে ছুটে চলে। কিন্তু জীবনের এক চরম ও অবশ্যম্ভাবী সত্য হলো—মৃত্যু। যে মৃত্যুর হাত থেকে কোনো মানুষ, রাজা-বাদশাহ, ধনী-গরিব কিংবা শক্তিশালী ব্যক্তি রক্ষা পাবে না।
মৃত্যুর মুহূর্তে মানুষের সব দুনিয়াবি সম্পর্ক ও অর্জনের প্রকৃত মূল্য প্রকাশ পায়। তখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে, এই পৃথিবীতে যার জন্য মানুষ এত ব্যস্ত ছিল, তার অধিকাংশই মৃত্যুর পরে আর কোনো কাজে আসে না। এই বাস্তবতাকে অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী ভাষায় তুলে ধরেছেন মহানবী (সা.)। আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তিনটি বস্তু মৃত ব্যক্তির পিছু পিছু (কবর পর্যন্ত) যায়—তার পরিবার-পরিজন, তার ধন-সম্পত্তি এবং তার কৃতকর্ম। তারপর দুইটি বস্তু ফিরে আসে—তার পরিবার-পরিজন এবং তার ধন-সম্পত্তি; আর একটি বস্তু তার সঙ্গেই থেকে যায়, আর তা হলো তার কৃতকর্ম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৫১৪, সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৯৬০)
ক্ষণস্থায়ী সম্পর্কের নির্মম বাস্তবতা
পরিবার মানুষের জীবনের সবচেয়ে আপন আশ্রয়। পিতা-মাতা, স্ত্রী, সন্তান, ভাই-বোন এবং আত্মীয়-স্বজনের জন্য মানুষ কত ত্যাগই না করে! কিন্তু মৃত্যুর পর এই প্রিয়জনদের ভালোবাসারও একটি সীমা আছে। তারা মৃত ব্যক্তিকে গোসল করাবে, জানাজা পড়বে এবং কবর পর্যন্ত পৌঁছে দেবে। কিন্তু কবরের মাটিতে শুইয়ে দেওয়ার পর সবাই ফিরে যাবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।’ (সুরা : ইমরান, আয়াত : ১৮৫)
কবরের নিঃসঙ্গ অন্ধকারে তখন কোনো বন্ধু, আত্মীয় কিংবা সন্তান পাশে থাকবে না। মানুষ একাই তার রবের মুখোমুখি হবে।
ধন-সম্পদের অসারতা
পৃথিবীতে অধিকাংশ মানুষ সম্পদ অর্জনের জন্য জীবন ব্যয় করে। কখনো বৈধভাবে, কখনো অবৈধভাবে সম্পদ সঞ্চয় করে। কিন্তু মৃত্যুর পর সেই সম্পদের কোনো অংশই তার সঙ্গে যায় না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তোমাদের আমার নিকটবর্তী করতে পারবে না; বরং যারা ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে তারাই সফল হবে।’ (সুরা : সাবা, আয়াত : ৩৭)
কাফনের কাপড়ে কোনো পকেট থাকে না। মানুষ তার কোটি কোটি টাকার সম্পদ, জমি, বাড়ি, ব্যবসা কিংবা ব্যাংক-ব্যালান্সের কিছুই সঙ্গে নিতে পারে না। মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই এগুলো উত্তরাধিকারীদের হাতে চলে যায়। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ বলে, আমার সম্পদ, আমার সম্পদ। অথচ তার সম্পদ বলতে সে যা খেয়েছে ও শেষ করেছে, যা পরেছে ও পুরোনো করেছে, অথবা যা দান করেছে এবং তা নিজের জন্য সংরক্ষণ করেছে—এগুলোই তার প্রকৃত সম্পদ।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৯৫৮)
একমাত্র চিরস্থায়ী সঙ্গী—আমল
কবরের অন্ধকারে, হাশরের ময়দানে এবং আল্লাহর আদালতে মানুষের একমাত্র সঙ্গী হবে তার আমল। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতএব কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে তা দেখতে পাবে, আর কেউ অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করলে তা-ও দেখতে পাবে।’ (সুরা : জিলজাল, আয়াত : ৭-৮)
যদি মানুষের আমল হয় নামাজ, রোজা, দান-সদকা, কোরআন তিলাওয়াত, মানুষের উপকার, সততা ও তাকওয়া—তবে সেই আমল কবরকে আলোকিত করবে এবং আখিরাতে মুক্তির কারণ হবে। অন্যদিকে জুলুম, মিথ্যা, সুদ, ঘুষ, হারাম উপার্জন, গিবত, অপবাদ ও অন্যায় কাজ যদি জীবনের সঙ্গী হয়, তবে সেই আমলই কবর ও আখিরাতের শাস্তির কারণ হবে। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘বুদ্ধিমান ব্যক্তি সে-ই, যে নিজের হিসাব নেয় এবং মৃত্যুর পরের জীবনের জন্য আমল করে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৪৫৯)
কোরআনের আলোকে পরকালের প্রস্তুতি
মুমিনের জীবনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত আখিরাতের সফলতা। আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং প্রত্যেক ব্যক্তি যেন চিন্তা করে, সে আগামী দিনের জন্য কী প্রেরণ করেছে।’ (সুরা : হাশর, আয়াত : ১৮)
এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আজকের প্রতিটি কাজই আগামী জীবনের জন্য পুঁজি।
মৃত্যু এমন এক সত্য, যা প্রতিটি মানুষের দুয়ারে একদিন কড়া নাড়বে। সেই দিন আমাদের পরিবার, বন্ধু-বান্ধব কিংবা ধন-সম্পদ কেউই আমাদের সঙ্গে থাকবে না। কবরের নিঃসঙ্গ অন্ধকারে একমাত্র সঙ্গী হবে আমাদের আমল। তাই প্রকৃত বুদ্ধিমানের কাজ হলো দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী মোহে ডুবে না গিয়ে এমন আমল করা, যা মৃত্যুর পরও তার জন্য নূর, শান্তি এবং জান্নাতের পথপ্রদর্শক হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে নেক আমলের মাধ্যমে কবর ও আখিরাতের সফলতার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।




