কঙ্গো ও উগান্ডায় ছড়িয়ে পড়া ইবোলা রোগের বর্তমান পরিস্থিতিকে সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব হিসেবে উল্লেখ করেছে আফ্রিকার রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (আফ্রিকা সিডিসি)। সংস্থাটি জানিয়েছে, প্রাদুর্ভাব শনাক্ত হওয়ার প্রথম এক মাসেই ২০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসা সন্দেহভাজন মানুষের সংখ্যা ৩৫ হাজার পর্যন্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আফ্রিকা সিডিসির চিকিৎসা মহামারি বিশেষজ্ঞ ডা. ওয়েসাম মানকৌলা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত ৮৯৪টি ইবোলা সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। তুলনামূলকভাবে ২০০০ সালে উগান্ডায় একই পর্যায়ে ইবোলা প্রাদুর্ভাবের সময় ২৮১টি সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছিল। সেই হিসাবে বর্তমান পরিস্থিতি প্রায় তিন গুণ বেশি গুরুতর। তিনি বলেন, প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে। কারণ, রোগ ছড়িয়ে পড়ার কয়েক সপ্তাহ পর, গত ১৫ মে এই প্রাদুর্ভাব আনুষ্ঠানিকভাবে শনাক্ত ও নিশ্চিত করা হয়। ফলে শুরুতে অনেক সংক্রমণের তথ্য নথিভুক্ত হয়নি বলে ধারণা করা হচ্ছে। আফ্রিকা সিডিসির তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহেই সংক্রমণ ৩৮ শতাংশ বেড়েছে। বর্তমানে রোগটি পূর্ব কঙ্গোর ৩২টি স্বাস্থ্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবারের প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী 'বান্দিবুগিও' নামের একটি বিরল ইবোলা ভাইরাস। এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো অনুমোদিত টিকা বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। এমনকি প্রাদুর্ভাবের শুরুতে এই ভাইরাস শনাক্তের জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষাও করা হয়নি। কঙ্গোতে এর আগে হওয়া অধিকাংশ ইবোলা প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী ছিল 'জায়ের' ভাইরাস। সেই ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর টিকা রয়েছে। কিন্তু বর্তমান প্রাদুর্ভাবে ব্যবহারের মতো কোনো অনুমোদিত টিকা না থাকায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে। তবে চিকিৎসকদের প্রচেষ্টায় এখন পর্যন্ত পূর্ব কঙ্গো ও উগান্ডায় ৭৪ জন রোগী সুস্থ হয়েছেন। পাশাপাশি বান্দিবুগিও ভাইরাসের বিরুদ্ধে মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডিভিত্তিক পরীক্ষামূলক চিকিৎসা পদ্ধতি তৈরির কাজও চলছে। প্রাদুর্ভাবের সবচেয়ে বড় কেন্দ্র হলো কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলের ইতুরি প্রদেশ। মোট আক্রান্তের ৯০ শতাংশের বেশি এই অঞ্চলেই শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া উত্তর কিভু ও দক্ষিণ কিভু প্রদেশেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে রোগটি সীমান্ত অতিক্রম করে প্রতিবেশী দেশ উগান্ডাতেও পৌঁছে গেছে। সেখানে ১৯টি সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে এবং অন্তত দুইজনের মৃত্যু হয়েছে।
ডা. মানকৌলা বলেন, আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসা মানুষদের খুঁজে বের করা এখনো সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, রোগপ্রবণ অনেক এলাকাই দুর্গম এবং সেখানে নিরাপত্তা পরিস্থিতিও অত্যন্ত নাজুক। তিনি আরো বলেন, ৮৯৪ জনের নিশ্চিত সংক্রমণের ক্ষেত্রে সাধারণত ১৭ হাজার থেকে ৩৫ হাজার মানুষের সংস্পর্শে আসার তালিকা থাকার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত মাত্র চার হাজার মানুষের খোঁজ পাওয়া গেছে এবং তাদের পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। তার মতে, শনাক্ত হওয়া এই চার হাজার মানুষ সম্ভাব্য সংস্পর্শে আসা মোট মানুষের ১৫ শতাংশেরও কম। ফলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের ঝুঁকি রয়ে গেছে।
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা বিষয়ক দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ইতুরি প্রদেশে দীর্ঘদিন ধরে চলা সংঘাতের কারণে প্রায় ১০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এই বাস্তুচ্যুতি রোগ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে আরো কঠিন করে তুলেছে। অনেক মানুষ হামলা ও সহিংসতা এড়াতে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। আবার অনেকেই বারবার স্থান পরিবর্তন করছেন। ফলে কারা কারা আক্রান্ত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে এসেছেন, তা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এছাড়া ইতুরি একটি বিশাল ও দুর্গম অঞ্চল। ঘন বন, দুর্বল সড়ক যোগাযোগ এবং প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে পৌঁছানোর জটিলতা স্বাস্থ্যকর্মীদের কাজকে আরো কঠিন করে তুলেছে। অনেক গ্রামে পৌঁছাতে কয়েক দিন পর্যন্ত সময় লেগে যায়। খনিজসম্পদে সমৃদ্ধ এই অঞ্চলে হাজার হাজার খনি শ্রমিক নিয়মিত এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যাতায়াত করেন। তাদের চলাচলের কারণে সংক্রমণের শৃঙ্খল শনাক্ত করা এবং সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা আরো কঠিন হয়ে উঠেছে।
এদিকে প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় অর্থ ও জনবলের বড় সংকটের কথাও জানিয়েছে আফ্রিকা সিডিসি। সংস্থাটি বলছে, পরিস্থিতি সামাল দিতে ৯০ কোটি ডলারের বেশি সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত মাত্র ৯ কোটি ডলার দেওয়া হয়েছে। একইভাবে প্রয়োজনীয় জনবলেরও ঘাটতি রয়েছে। আফ্রিকা সিডিসির হিসাবে, এই সংকট মোকাবিলায় অন্তত ৫৪০ জন বিশেষজ্ঞ ও কর্মী প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে কাজ করছেন মাত্র ৮৪ জন। ডা. মানকৌলা বলেন, আন্তর্জাতিক অংশীদার এবং সদস্য দেশগুলোর দেওয়া প্রতিশ্রুতি দ্রুত বাস্তবায়ন করা জরুরি। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দেশগুলোকে সহায়তা দিতে প্রতিশ্রুত অর্থ দ্রুত দেওয়া হবে।
আফ্রিকা সিডিসির মতে, রোগ শনাক্তে দেরি, সংস্পর্শ অনুসন্ধানের দুর্বল ব্যবস্থা, নিরাপত্তাহীনতা, মানুষের ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি এবং অর্থ ও জনবলের ঘাটতির কারণে কঙ্গো ও উগান্ডায় ইবোলা নিয়ন্ত্রণের কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে পরিস্থিতি দ্রুত উন্নতির বদলে আরো উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে।




