• ই-পেপার

অর্থ পাচারেও চ্যাম্পিয়ন ইউনূস সরকার!

মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বাজেট বৈষম্য: প্রশ্নের মুখে উচ্চশিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাত

সাইফুল ইসলাম
মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বাজেট বৈষম্য: প্রশ্নের মুখে উচ্চশিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাত

২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য দেশের ৫৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) জন্য মোট ১২,৩০০ কোটি টাকার বাজেট অনুমোদন করা হয়েছে। এর মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১২,০০১.৮২ কোটি টাকা। উচ্চশিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির এ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে বাজেটের খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেশের মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বরাদ্দের দিকে তাকালে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—স্বাস্থ্যশিক্ষা ও চিকিৎসা গবেষণার বিকেন্দ্রীকৃত উন্নয়ন কি যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে?

প্রকাশিত বাজেট অনুযায়ী, বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৭৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা। অন্যদিকে রাজশাহী মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় পেয়েছে ১৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ১৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকা, খুলনা মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ৮ কোটি ১৭ লাখ টাকা এবং সিলেট মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় মাত্র ৬৩ লাখ টাকা। সংখ্যাগুলো স্বাভাবিকভাবেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অর্থায়ন কাঠামো নিয়ে আলোচনা সৃষ্টি করে।

অবশ্যই এ কথা স্বীকার করতে হবে যে, বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় দেশের সবচেয়ে বড় এবং দীর্ঘদিনের চিকিৎসা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এর অধীনে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী, শিক্ষক, রেসিডেন্ট চিকিৎসক, গবেষক এবং বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালিত হয়। উন্নত গবেষণাগার, উচ্চতর চিকিৎসা শিক্ষা এবং বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার কারণে এ প্রতিষ্ঠানের ব্যয়ও তুলনামূলকভাবে বেশি। ফলে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় বড় বরাদ্দ পাওয়ার যৌক্তিক ভিত্তি রয়েছে।

তবে এখানেই আলোচনার শেষ নয়। কারণ একটি আধুনিক রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যব্যবস্থা কেবল রাজধানীকেন্দ্রিক একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠে না। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও ভবিষ্যতের চিকিৎসক, গবেষক ও স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ তৈরিতে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রাজশাহী, চট্টগ্রাম, খুলনা ও সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অধীনে একাধিক মেডিকেল কলেজ, নার্সিং ও স্বাস্থ্যশিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়কে শক্তিশালী করা মানে দেশের স্বাস্থ্যশিক্ষার ভিত্তিকে শক্তিশালী করা।

বাজেট বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—শুধু বরাদ্দের অঙ্ক দেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন নির্ধারণে শিক্ষার্থী সংখ্যা, শিক্ষক সংখ্যা, অধিভুক্ত কলেজের সংখ্যা, গবেষণা কার্যক্রম, অবকাঠামোগত প্রয়োজন, নিজস্ব ক্যাম্পাস ও হাসপাতালের উপস্থিতি এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্প বিবেচনায় নিতে হয়। এসব সূচকের আলোকে বরাদ্দ নির্ধারিত হলে তা অধিকতর যৌক্তিক বলে বিবেচিত হয়।

কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যকর প্রশাসন, একাডেমিক কার্যক্রম, গবেষণা, তথ্যপ্রযুক্তি উন্নয়ন, গ্রন্থাগার পরিচালনা এবং শিক্ষার্থীসেবা নিশ্চিত করতে একটি ন্যূনতম আর্থিক সক্ষমতা প্রয়োজন। সে বিবেচনায় খুব কম বরাদ্দ পাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পক্ষে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী শিক্ষা ও গবেষণা পরিবেশ গড়ে তোলা কঠিন হয়ে যেতে পারে। বিশেষত নতুন ও বিকাশমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য অতিরিক্ত বিনিয়োগ অপরিহার্য।

বাংলাদেশ বর্তমানে চিকিৎসা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঘাটতি, গবেষণার সীমাবদ্ধতা, আন্তর্জাতিক মানের প্রকাশনা ও উদ্ভাবনের অভাব, আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তিতে দক্ষ জনবলের সংকট এবং স্বাস্থ্যসেবার আঞ্চলিক বৈষম্য এখনও বড় সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য শুধু হাসপাতাল নির্মাণ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন শক্তিশালী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাকেন্দ্র।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা দেখায়, স্বাস্থ্যখাতের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের মূল ভিত্তি হচ্ছে চিকিৎসা শিক্ষা ও গবেষণায় ধারাবাহিক বিনিয়োগ। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, জাপান কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো চিকিৎসা গবেষণাকে জাতীয় উন্নয়নের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। কারণ তারা জানে, চিকিৎসা বিজ্ঞানে বিনিয়োগ মানে মানুষের জীবনমান, উৎপাদনশীলতা এবং জাতীয় অর্থনীতির ভবিষ্যতে বিনিয়োগ।

বাংলাদেশেও মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য একটি স্বচ্ছ ও প্রয়োজনভিত্তিক অর্থায়ন নীতি প্রণয়ন সময়ের দাবি। বরাদ্দ নির্ধারণের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী সংখ্যা, গবেষণার পরিমাণ, অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা, আঞ্চলিক চাহিদা, অবকাঠামোগত ঘাটতি এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ পরিকল্পনাকে স্পষ্ট সূচক হিসেবে ব্যবহার করা উচিত। একই সঙ্গে নবীন ও আঞ্চলিক মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য একটি ন্যূনতম উন্নয়ন তহবিল গঠন করা যেতে পারে, যাতে তারা প্রাথমিক সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।

স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন নিয়ে আমরা প্রায়ই কথা বলি। কিন্তু উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভিত্তি নির্মিত হয় শ্রেণিকক্ষ, গবেষণাগার এবং প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে। আজকের মেডিকেল শিক্ষার্থীই আগামী দিনের চিকিৎসক, গবেষক, শিক্ষক ও স্বাস্থ্যনীতিনির্ধারক। তাই মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটকে কেবল ব্যয় হিসেবে নয়, বরং জাতীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বাজেটের অঙ্ক শুধু অর্থের পরিমাণ প্রকাশ করে না; এটি রাষ্ট্রের অগ্রাধিকারও নির্দেশ করে। তাই মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অর্থায়ন কাঠামো নিয়ে একটি গভীর ও তথ্যভিত্তিক জাতীয় আলোচনা প্রয়োজন। লক্ষ্য হওয়া উচিত কোনো প্রতিষ্ঠানকে অন্যটির বিপরীতে দাঁড় করানো নয়; বরং এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে দেশের প্রতিটি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা, গবেষণা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে কার্যকর অবদান রাখতে সক্ষম হয়। তাহলেই বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও শক্তিশালী ও টেকসই ভিত্তি লাভ করবে।

গণতন্ত্র ও দারিদ্র্য

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
গণতন্ত্র ও দারিদ্র্য

এটা খুবই সহজ কথা যে গণতন্ত্র ও দারিদ্র্য একসঙ্গে চলতে পারে না। সবাই বলে এ কথা। সরকারের মন্ত্রীরাও বলেন। আসলে দারিদ্র্য হচ্ছে একধরনের ব্যাধি। খুবই বাজে রোগ সে। মানুষকে হেয়, বিব্রত, বিপন্ন করে। ছোট করে ফেলে। খুবই আত্মসচেতন করে রাখে। বিপদে ফেলে দেয় যখনতখন যেখানেসেখানে। না, দারিদ্র্যের মধ্যে মাহাত্ম্য বলে কিছু নেই। অসামান্যদের কথা আলাদা, দারিদ্র্যের আগুনে পুড়ে পুড়ে তাঁরা অনেকেই খাঁটি সোনা হয়ে উঠেছেন এ আমরা জানি। জীবনীতে পড়েছি। তা ভিতরে সোনা ছিল বলেই ‘খাঁটি’ হয়েছেন, নইলে পুড়ে কয়লা হতেন, কিংবা ছাই : ব্যতিক্রম বাদ দিয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যা সত্য। কাজী নজরুল ইসলামের সেই ‘দারিদ্র্য’ কবিতাটি আমি যতবার পড়েছি, কিংবা তাঁর সম্পর্কে যতবার ভেবেছি, ততবারই মনে হয়েছে কবি ব্যতিক্রমীদের একজন। নইলে দারিদ্র্য মহৎ করেছে মানুষকে, এমন তো দেখিনি। পঙ্গু করেছে, পাত্র করেছে ভিক্ষার কিংবা তার চেয়েও যা খারাপ। ক্ষেত্র করেছে অবজ্ঞার-এই তো দেখে এলাম সারা জীবন। আমার বাপ-দাদাও তাই দেখে এসেছেন, এই গরিব দেশে।

আমাদের যত যত সমস্যা ও ব্যর্থতা, তার পেছনে যে দারিদ্র্য রয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে কি? যেমন পরিবার পরিকল্পনা। ছোট পরিবার সুখী পরিবার-এটা সত্য; কিন্তু তারও চেয়ে বড় সত্য হচ্ছে ধনী পরিবার মানেই ছোট পরিবার। পরিবার ছোট হলেই যে সুখী হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। অসুখবিসুখ, ঝগড়াকলহ, মনোমালিন্য, অধিক আদরে ছেলেমেয়ে নষ্ট-ইত্যাদি সমস্যা থাকতেই পারে। থাকেই। অনেকে তো বিয়েই করতে পারেনি। নিজেই নিজের পরিবার এবং পরিবার পরিকল্পনার দৃষ্টিকোণ থেকে আদর্শ বটে, কিন্তু তেমন পুরুষ কিংবা মহিলা, বিশেষ করে মহিলা, নিজেকে আদর্শ মানুষ কিংবা স্বর্গসুখ ভোগকারী ব্যক্তিত্ব বলে মনে করেন, এমনটা মনে হয় না। আলাপ করে দেখুন, বিষণ্ন হয়ে ফিরে আসবেন। এদের অনেকেই দুঃখের প্রতিমূর্তি।

ব্যতিক্রম সর্বক্ষেত্রেই সম্ভব, কিন্তু সাধারণভাবে বলতে গেলে বলা যাবে ধনী পরিবারেই পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি সফল হয়েছে। দরিদ্রদের মধ্যে তা ব্যর্থ। যেজন্য জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে কিছুতেই নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা যাচ্ছে না। শত চেষ্টা করেও কর্মসূচি উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করতে পারছে না। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোও এখন আগের তুলনায় সচেতন, তাদের ক্ষেত্রেও পরিবার এখন ছোট হয়ে আসছে। তবে মধ্যবিত্তও ধনীই বটে, বিপুলসংখ্যক দরিদ্র মানুষের তুলনায় ধনী।

দরিদ্র মানুষ আগামী বছরের কথা দূরে থাক, আগামীকালের কথাই ভাবতে পারে না। তারা সকালে ভাবে দুপুরে কী খাবে, দুপুরে ভাবে রাতের কথা, এর বেশি ভাববার ক্ষমতাই রাখে না। মনে করে ভবিষ্যৎ বলে কিছু নেই। এই হতাশা সবকিছু অপহরণ করে নেয়। গরিব মানুষ উচ্চতর জীবনের স্বপ্ন রাতেও দেখে না, দিনে তো নয়ই। ভাবে, এরকমই ছিল আমার বাবার, বাবার বাবা, এরকমই থাকব আমি, থাকবে আমার সন্তানসন্ততি। ভবিষ্যতহীন, চেতনাহীন, দায়িত্বজ্ঞানহীন এই মানুষদের কাছ থেকে অনেক কিছুই আশা করা যায় না, পরিবার পরিকল্পনাও নয়। এটা পরিবার পরিকল্পনার কর্মীরাও বোঝেন, কিন্তু অধিকাংশ সময়েই বলেন না। জানেন বলে লাভ হবে না, ক্ষতি হবারই আশঙ্কা।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীএখন দেশে শিক্ষার ব্যাপারে আগের আগ্রহ নেই। বিশেষ করে উচ্চপর্যায়ের শিক্ষায়। এর কারণটাও ওই দারিদ্র্যই। মানুষ দেখতে পাচ্ছে লেখাপড়া শিখে লাভ হচ্ছে না। চাকরি হচ্ছে না। উপার্জনের আশা নেই। এই পরিস্থিতিতে ছাত্রসমাজের মধ্যে খুব স্বাভাবিকভাবেই ব্যাপক হতাশা দেখা দিয়েছে। শিক্ষার ব্যাপারে অনীহা এবং ঠিক বিপরীতে সন্ত্রাসের ব্যাপারে আগ্রহ ওই হতাশারই দুটি ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ বটে।

মৌলবাদও দারিদ্র্যের সঙ্গে যুক্ত। দরিদ্র মানুষ ভরসা করবার মতো কিছু পাচ্ছে না, আশ্রয় নেই, বিচার নেই, ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি নেই, এরকম মানসিক অবস্থায় ইহজাগতিকতার চর্চা অসম্ভব। আমরা বিদ্যাসাগরের কথা জানি। বিদ্যাসাগরের পক্ষে ইহজাগতিকতার চর্চা অসম্ভব হতো, যদি গ্রামের দরিদ্র ব্রাহ্মণ থাকতেন, যদি তাঁকে পরনির্ভর হয়ে থাকতে হতো। সেটা ছিলেন না বলেই ইহজাগতিক হয়েছেন, অন্যরা হননি, তারা মন্ত্র পড়েছেন এবং দক্ষিণা কী পাওয়া যাবে বা যাবে না তার হিসাব করেছেন।

আমরা যে ব্যাপক হারে ইহকালের ভূমি ছেড়ে জীবিত অবস্থাতেই পরকালের দিকে প্রবল বেগে ধাবিত হতে পছন্দ করি, তার কারণ আর কিছুই নয়, ইহকালের দুরবস্থা ছাড়া। কেবলি উচ্ছেদ হচ্ছি, উদ্বাস্তু হয়ে পরকালে জায়গাজমির দরদাম করছি। এই যে অন্তঃসারশূন্য আধ্যাত্মিকতা, এই যে ফকিরি, উদাসীনভাব, এ বড়ই বাস্তবিক সত্য; এবং তা বাস্তবিক কারণ থেকেই উদ্ভূত। এর পেছনে কোনো অলৌকিক অনুপ্রেরণা নেই।

আর দারিদ্র্য তো আজকের নয়, যুগযুগান্তের। সেই অন্তহীন দারিদ্র্য ব্যক্তির জীবনে এমন হীনম্মন্যতা তৈরি করে রেখেছে যে অবস্থা ভালো হলেও গরিবই থেকে যাই-মনের দিক থেকে। ঈর্ষা, অবিশ্বাস, ক্ষুদ্র স্বার্থের পাহারাদারি, কলহ, কোন্দল কেবল যে কাজ হয়ে দাঁড়ায় তা নয়, প্রধান বিনোদনেও পর্যবসিত হয়। অন্য কোনো আনন্দে অভ্যাস নেই, ঝগড়াফ্যাসাদ ভিন্ন। আজকাল আমরা দারিদ্র্যও বিক্রি করছি দেশবিদেশে। কিন্তু দরিদ্র মানসিকতা বিক্রি করতে পারব না।

কেউ কিনবে না। বৈষয়িকভাবে মোটেই অভাবে নেই, কিন্তু দেখলেই মনে হবে অত্যন্ত অভাবগ্রস্ত। সাহায্য চাইছেন না, কিন্তু তবু মনে হবে চাইছেন। এরকম অবস্থাপন্ন কিন্তু তবু দুস্থ মানুষ কি আপনি দেখেননি, দেখেছি। আপনিও দেখেছেন, আমার দৃঢ়বিশ্বাস। দারিদ্র্য যখন কারও সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়ায়, তখন তাকে কাটিয়ে ওঠা দুঃসাধ্য। টাকাপয়সায় কাটে না। এক প্রজন্মে কাটতে চায় না। আর আগের প্রজন্মে আমরা কে-ই বা কী ছিলাম, বাপ-দাদা কীই-বা রেখে গেছেন, অভাব ছাড়া? শুধু ব্যাধি কেন বলব, দারিদ্র্য অত্যন্ত কঠিন ও জটিল ব্যাধি।

তাই বলে কি আমরা ভোগবিলাসের পক্ষে? না, অতিরিক্ত ভোগবিলাস কিংবা অপচয় কোনোটারই পক্ষে নই আমরা। আমরা চাই সুস্থ ও সমৃদ্ধ জীবন, তাতে আনন্দ থাকবে, অবকাশ থাকবে, থাকবে সৃষ্টিশীলতা। ভোগবিলাসে সৃষ্টি নেই, দেওয়া নেই, কেবল নেওয়াই আছে। দারিদ্র্যের সংজ্ঞা যে আপেক্ষিক তা-ও জানি। তবু দারিদ্র্য যে কী বস্তু, তা বাংলাদেশের মানুষ আমরা যদি না বুঝি, তবে কে বুঝবে।

এর সঙ্গে গণতন্ত্রের শত্রুতা একেবারেই স্বভাবগত। গণতন্ত্র ও দারিদ্র্য একে অন্য থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র স্বভাবের। গণতন্ত্রের একটি মূল বিষয় হচ্ছে অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া; কিন্তু দরিদ্র মানুষ কী ভাগ করবে, অভাব ছাড়া। অভাব তো অবিভাজ্য, যারটা তারই থাকে, ভাগ করতে গেলে নেওয়ার লোক পাওয়া যায় না খুঁজে। নাম শুনলেই দৌড়ে পালায়। গণতন্ত্র প্রকাশ্য, আবার গোপনীয়। গণতন্ত্র সবল, দারিদ্র্য দুর্বল। গণতন্ত্র মানুষকে মেলায়, দারিদ্র্য বিচ্ছিন্ন করে।

গণতন্ত্র জগৎমুখী, দারিদ্র্য আত্মত্বমুখী। গণতন্ত্র আলাপ করে দারিদ্র্য করে কলহ। না, গণতন্ত্র ও দারিদ্র্য কিছুতেই একসঙ্গে থাকতে পারে না। তার চেয়েও বড় কথা, দারিদ্র্য থাকলে গণতন্ত্র থাকে না, থাকতে পারে না। কেবল যে ভোট কেনাবেচা কিংবা ছিনতাই হয় তা-ই নয়, মানুষ মানুষে মিলনটাই গড়ে ওঠে না। উন্মুক্ত প্রান্তরে আসে না, অন্যের সঙ্গে সমঝোতা, সহযোগিতা কিছুই করে না। মন্ত্রীরা যখন বলেন দারিদ্র্যই গণতন্ত্রের প্রধান শত্রু, তখন খুবই যথার্থ কথা বলেন বটে। প্রকৃত গণতন্ত্রের প্রধান শত্রু হচ্ছে দারিদ্র্য।

কিন্তু দারিদ্র্যের কারণ কী তা তো কেউ বলেন না। না, সেটা বলেন না। বলেন যখনতখন আসল কথা না বলে আজেবাজে কথা বলেন। মুখ্যকে গৌণ করে, গৌণকেই ধরে টানাটানি করেন। বলেন, দারিদ্র্যের কারণ আমাদের আলস্য। আমরা কাজ করি না। ফাঁকি দিই। বলেন, দারিদ্র্যের কারণ আমাদের জনসংখ্যা। এত মানুষ, এদের কে খাওয়াবে, যা আছে খাওয়াতেই শেষ, উন্নতি কী করে হবে? কী করে ঘুচবে দারিদ্র্য? কেউ বলেন, অন্য কিছু নয়, দায়ী আমাদের দুর্নীতি। চোর। চোরে ছেয়ে গেছে দেশ। চাটার দল। বেত চাই। বেতাতে হবে। এসব বলেন, কিন্তু দারিদ্র্যের আসল কারণটা দেখেন না, বা দেখলেও মানতে চান না।

অন্য কারণ অবশ্যই রয়েছে, কিন্তু আসল কারণ হচ্ছে বৈষম্য। এই বৈষম্যই দারিদ্র্য সৃষ্টি করছে এবং করেছে। না, দারিদ্র্য বৈষম্য সৃষ্টি করেনি।  উল্টোটাই সত্য। বলা হবে, এবং হচ্ছে যে প্রতিযোগিতা থাকা ভালো। হ্যাঁ, তা ভালো বৈকি।

প্রতিযোগিতা ছাড়া উন্নতি নেই। কিন্তু কার সঙ্গে কার প্রতিযোগিতা, সেটা তো দেখতে হবে। হাত-পা বেঁধে পানিতে ফেলে দিয়ে যদি বলি তুমি আমার সঙ্গে সাঁতরাও দেখি, পাল্লা দাও, তাহলে লোকটি তো পারবে না, ডুবেই মরবে। সাঁতরাতে বলার আগে তার হাত-পায়ের বন্ধনগুলো কাটতে হবে, তাকে মুক্ত করতে হবে, তবেই সাঁতারের প্রশ্নটা উঠবে। নইলে তা নিষ্ঠুর বিদ্রুপ ছাড়া আর কী। দেশের অধিকাংশ মানুষই এই হাত-পা বাঁধা অবস্থায় রয়েছে, তারা নিক্ষিপ্ত হয়েছে দারিদ্র্যের জলাশয়ে। তাদের অবস্থা সাঁতরে তীরে ওঠার নয়, অবস্থা ডুবে মরবার।

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সীমান্তে পুশ ইনের চেষ্টা : মানবাধিকারের বিরুদ্ধে ভারতের আগ্রাসন

আহসান হাবিব বরুন
সীমান্তে পুশ ইনের চেষ্টা : মানবাধিকারের বিরুদ্ধে ভারতের আগ্রাসন

ভারতের সীমান্তে কথিত ‘পুশ ইন’ নীতির বিরুদ্ধে আমি অতীতের একাধিক লেখায় যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছি, সাম্প্রতিক হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদন যেন সেই আশঙ্কারই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তে ঘটে চলা ঘটনাগুলো এখন আর অনুমান বা অভিযোগের পর্যায়ে নেই—এগুলো এখন নথিভুক্ত মানবাধিকার উদ্বেগের অংশ বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে যা ঘটছে, সেটি আর কেবল সীমান্ত ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন নয়; এটি সরাসরি মানবাধিকার, নাগরিকত্ব, রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত। যখন কোনো রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তিকে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া, পরিচয় যাচাই ছাড়া, আদালতের সিদ্ধান্ত ছাড়া কিংবা সংশ্লিষ্ট দেশের সম্মতি ছাড়া সীমান্ত পেরিয়ে অন্য দেশে ঠেলে দেয়, তখন সেটিকে প্রশাসনিক পদক্ষেপ বলা যায় না—এটি আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, পশ্চিমবঙ্গের বহু মুসলিম বাঙালি বাসিন্দাকে কথিত বাংলাদেশি আখ্যা দিয়ে সীমান্তের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। অনেকের কাছে আধার কার্ড রয়েছে, দীর্ঘদিনের বসবাসের প্রমাণ রয়েছে, এমনকি পারিবারিক শিকড়ও ভারতের অভ্যন্তরে গভীরভাবে প্রোথিত। তবু তাদের আটক করা হচ্ছে, সীমান্তে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

এখানে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—কোনো ব্যক্তির প্রকৃত নাগরিকত্ব নির্ধারণের জন্যও কোনো গ্রহণযোগ্য ও স্বচ্ছ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে না। রাষ্ট্র যদি শুধুমাত্র সন্দেহ বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব নির্ধারণ শুরু করে, তাহলে নাগরিকত্ব আর আইনগত পরিচয় থাকে না; সেটি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার একটি অনিয়ন্ত্রিত অস্ত্রে পরিণত হয়।

বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের শুরু থেকে বিএসএফের অন্তত ২১টি পুশ ইনের চেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে। দুই শতাধিক মানুষ, যাদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে, তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। এই সংখ্যাগুলো কেবল পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে চরম মানবিক বঞ্চনা, অনিশ্চয়তা এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বহীনতার নির্মম বাস্তবতা।

সবচেয়ে বেদনাদায়ক দৃশ্যটি হলো সীমান্তের জিরো লাইনে আটকে পড়া মানুষদের চিত্র। কোনো রাষ্ট্রের নাগরিক নয়, কোনো দেশের নিরাপত্তার আওতায় নয়, কোনো আইনি সুরক্ষা ছাড়া—দুই সশস্ত্র সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মাঝখানে তারা যেন মানবিক অস্তিত্বের সবচেয়ে নিষ্ঠুর পরীক্ষার মুখোমুখি।

পঞ্চগড় সীমান্তের ঘটনাটি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। ঝড়-বৃষ্টি, অনিশ্চয়তা এবং আতঙ্কের মধ্যে মানুষকে ৭৫ ঘণ্টারও বেশি সময় নো-ম্যানস ল্যান্ডে আটকে থাকতে হয়েছে। খাদ্য, পানি, চিকিৎসা কিংবা মৌলিক নিরাপত্তা ছাড়া এভাবে মানুষকে ফেলে রাখা শুধু অমানবিকই নয়; আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের আলোকে এটি নিষ্ঠুর ও অবমাননাকর আচরণ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।

আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি আরো গুরুতর। জাতিসংঘের বিভিন্ন মানবাধিকার সনদ, নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি এবং শিশু অধিকার সনদ স্পষ্টভাবে বলে যে প্রতিটি ব্যক্তির মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং ন্যায্য আইনি প্রক্রিয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। কোনো রাষ্ট্র চাইলে কাউকে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করতে পারে, কিন্তু সেই ঘোষণার মাধ্যমে তার মৌলিক মানবাধিকার হরণ করার অধিকার রাষ্ট্রের নেই।

বিশেষত শিশুদের সীমান্তে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। একটি শিশু তার জন্মস্থান, জাতীয়তা কিংবা রাজনৈতিক বিতর্কের জন্য দায়ী নয়। অথচ আজ সেই শিশুকেই সীমান্ত রাজনীতির সবচেয়ে দুর্বল ও অরক্ষিত শিকার হিসেবে দেখা যাচ্ছে। এটি শুধু মানবাধিকারের সংকট নয়; এটি সভ্যতার নৈতিক ব্যর্থতাও।

ভারত নিজেদের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপন করলেও বাস্তব আচরণ সেই দাবির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি শুধু নির্বাচন বা অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে নয়; বরং দুর্বলতম মানুষের অধিকার রক্ষার মধ্যেই তার সত্যিকারের মানদণ্ড নির্ধারিত হয়।

আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ঘটনাগুলো কেবল বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক ত্রুটি হিসেবে দেখা কঠিন। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বক্তব্যে ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ ধরনের নীতিগত ভাষা একটি বৃহত্তর প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু কোনো নীতিই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অধিকার যেমন আছে, তেমনি মানবাধিকার রক্ষার বাধ্যবাধকতাও সমানভাবে বিদ্যমান।

বাংলাদেশের অবস্থান এখানে স্পষ্ট এবং নীতিগতভাবে যুক্তিসংগত। ঢাকা বারবার বলেছে, যাচাই-বাছাই ছাড়া কাউকে গ্রহণ করা হবে না। প্রত্যাবাসন হলে তা অবশ্যই দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা, প্রমাণ এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আইনি কাঠামোর মাধ্যমে হতে হবে। অন্যথায় এটি হবে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বেরও অবমাননা।

এই সংকটের আরেকটি গভীর দিক হলো আঞ্চলিক সম্পর্কের ওপর এর প্রভাব। দক্ষিণ এশিয়া ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত নানা চ্যালেঞ্জে জর্জরিত। এর মধ্যে সীমান্তকে যদি মানবাধিকারবিহীন একটি পরীক্ষাগারে পরিণত করা হয়, তাহলে পারস্পরিক আস্থা ক্ষয়প্রাপ্ত হবে এবং ভবিষ্যতে আরো জটিল কূটনৈতিক সংকট তৈরি হতে পারে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের পর্যবেক্ষণ তাই কেবল একটি প্রতিবেদন নয়; এটি একটি আন্তর্জাতিক সতর্কবার্তা। এটি মনে করিয়ে দেয় যে শক্তিশালী রাষ্ট্র হওয়া আর ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র হওয়া এক বিষয় নয়। প্রকৃত শক্তি পরিমাপ হয় দুর্বল মানুষের প্রতি আচরণের মাধ্যমে।

সীমান্ত কোনো মানুষের মানবিক পরিচয় মুছে দেওয়ার জায়গা হতে পারে না। কাঁটাতারের বেড়া কোনো রাষ্ট্রকে আইনের ঊর্ধ্বে তুলে দেয় না। নাগরিকত্ব নিয়ে বিতর্ক কখনোই একজন মানুষকে খাদ্য, পানি, চিকিৎসা কিংবা মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করার বৈধতা দিতে পারে না।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

কথার বন্যায় হারিয়ে যাচ্ছে শোনার সংস্কৃতি

হাসান আলী
কথার বন্যায় হারিয়ে যাচ্ছে শোনার সংস্কৃতি

কোনো সামাজিক অনুষ্ঠান, পারিবারিক মিলনমেলা কিংবা সভা-সমাবেশে গেলে একটি দৃশ্য প্রায়ই চোখে পড়ে। কেউ কেউ সুযোগ পেলেই কথা বলতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। হাতে মাইক এলে যেন কথার প্রবাহ থামতেই চায় না। নিজের অভিজ্ঞতা, মূল্যবোধ, নৈতিকতা, বিশ্বাস, রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি কিংবা জীবনের দর্শন নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা শুরু হয়। অনেক সময় শ্রোতারা আগ্রহী কি না, মনোযোগ ধরে রাখতে পারছেন কি না, কিংবা অন্য কারো কিছু বলার সুযোগ আছে কি না—সেসব বিষয় তেমন বিবেচনায় আসে না।

বিশেষ করে কিছু প্রবীণের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি দেখা যায়। অবশ্য এর পেছনে কারণও রয়েছে। দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা, অর্জন এবং সংগ্রামের গল্প তাদের কাছে মূল্যবান। তারা মনে করেন, এই অভিজ্ঞতা অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রেই এই ভাবনা আন্তরিক। কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন অভিজ্ঞতা বিনিময় একতরফা বক্তৃতায় পরিণত হয় এবং সংলাপের জায়গা সংকুচিত হয়ে যায়।

আসলে মানুষ কেন কথা বলতে এত ভালোবাসে? কারণ কথা বলা শুধু তথ্য আদান-প্রদান নয়, এটি নিজের অস্তিত্ব জানান দেওয়ারও একটি উপায়। আমরা কথা বলে বোঝাতে চাই—‘আমি আছি’, ‘আমার অভিজ্ঞতা আছে’, ‘আমার মতামত গুরুত্বপূর্ণ’। অনেক সময় কথা বলার মধ্যে স্বীকৃতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাও কাজ করে। ফলে কোনো অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে কিছু না বললে যেন নিজের উপস্থিতিই অদৃশ্য হয়ে যাবে—এমন একটি অচেতন অনুভূতি কাজ করতে পারে।

কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকে যায়। মানুষ কি সত্যিই কথার মাধ্যমে বদলায়?

বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে, কথার চেয়ে কাজের প্রভাব অনেক বেশি। একটি অনুপ্রেরণামূলক বক্তৃতা মানুষকে সাময়িকভাবে উৎসাহিত করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন সাধারণত আসে বাস্তব কর্মকাণ্ড থেকে। একজন মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা সততার কথা বলতে পারেন, কিন্তু একটি সৎ কাজ তার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী বার্তা দেয়। কেউ মানবতার গল্প বলতে পারেন, কিন্তু বিপদে এগিয়ে গিয়ে সাহায্য করা মানুষের মনে অনেক গভীর ছাপ ফেলে।

মজার বিষয় হলো, আমরা অনেক সময় কথা বলার ক্ষেত্রে উদার হলেও কাজের ক্ষেত্রে তুলনামূলক সংযত। সমাজ পরিবর্তনের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করতে আমরা আগ্রহী, কিন্তু বাস্তবে সেই পরিবর্তনের জন্য সময়, শ্রম বা সম্পদ ব্যয় করতে ততটা আগ্রহী নই। কোনো সামাজিক সমস্যার সমাধান নিয়ে দীর্ঘ বক্তৃতা দেওয়া সহজ, কিন্তু সমাধানের পথে ছোট একটি পদক্ষেপ নেওয়া তুলনামূলক কঠিন।

আজকাল বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আরেকটি প্রবণতা লক্ষ করা যায়। প্রায় সবাই কিছু না কিছু বলতে চান। কেউ শুভেচ্ছা জানাতে চান, কেউ অভিজ্ঞতা ভাগ করতে চান, কেউ পরামর্শ দিতে চান। এর মধ্যে অনেক ইতিবাচক দিকও আছে। মানুষ অংশগ্রহণ করতে চায়, নিজেকে যুক্ত রাখতে চায়। কিন্তু কখনো কখনো এটি নিজের অবস্থান এবং উপস্থিতি স্মরণ করিয়ে দেওয়ার এক ধরনের প্রচেষ্টায় পরিণত হয়।

অথচ প্রকৃত দক্ষতা সবসময় বেশি কথা বলার মধ্যে নয়। বরং অল্প সময়ে, সহজ ভাষায় এবং পরিষ্কারভাবে মূল বক্তব্য তুলে ধরতে পারা একটি বড় গুণ। ইতিহাসে এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা দীর্ঘ বক্তৃতার জন্য নয়, বরং সংক্ষিপ্ত অথচ অর্থবহ কথার জন্য স্মরণীয় হয়ে আছেন। কারণ মানুষের মনোযোগ একটি সীমিত সম্পদ। দীর্ঘ বক্তব্যে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও হারিয়ে যেতে পারে।

আরো একটি বিষয় আমাদের ভাবা দরকার। আমরা কি সত্যিই শুনতে জানি?

বর্তমান সময়ে মনে হয়, অধিকাংশ মানুষ বক্তা হতে চায়, শ্রোতা নয়। সবাই নিজের কথা বলতে চায়, কিন্তু অন্যের কথা মন দিয়ে শোনার আগ্রহ তুলনামূলক কম। অথচ শোনা একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক দক্ষতা। একজন মনোযোগী শ্রোতা শুধু তথ্য গ্রহণ করেন না, তিনি অন্য মানুষকে সম্মানও দেন। অনেক সম্পর্ক ভেঙে যায় কথা কম বলার কারণে নয়, বরং কেউ কারো কথা মন দিয়ে না শোনার কারণে।

প্রবীণ বয়সে এই বিষয়টির গুরুত্ব আরো বেশি। দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা অবশ্যই মূল্যবান, কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা তখনই কার্যকর হয়, যখন তা বিনয়ের সঙ্গে ভাগ করা হয় এবং নতুন প্রজন্মের কথা শোনার জন্যও সমান আগ্রহ থাকে। জ্ঞান শুধু বলার মধ্যে নয়, শোনার মধ্যেও বৃদ্ধি পায়।

সবশেষে বলা যায়, মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য সবসময় দীর্ঘ বক্তব্য প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো একটি সংক্ষিপ্ত বাক্য, একটি সৎ কাজ, একটি সহানুভূতিশীল আচরণ কিংবা একটি মনোযোগী শ্রবণই সবচেয়ে শক্তিশালী বার্তা হয়ে উঠতে পারে।

হয়তো আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আরো কিছু বক্তা নয়, বরং আরো কিছু ভালো শ্রোতা। কারণ যে সমাজে সবাই কথা বলে কিন্তু কেউ শোনে না, সেখানে শব্দ বাড়ে; কিন্তু বোঝাপড়া বাড়ে না।

লেখক : প্রবীণবিষয়ক লেখক, সংগঠক