ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) বিগত ১৭ বছরের শাসনামলে বিভিন্ন বিভাগে ২০০ জন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় ছাড়া বিগত আওয়ামী আমলের অধিকাংশ নিয়োগে বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। নিয়োগ নিয়ে অসংখ্যবার বিশ্ববিদ্যালয়ে টাকা লেনদেনের অডিও ফাঁস, ভাঙচুর, আন্দোলন, সংঘর্ষ, হট্টগোল ও উপাচার্য পদত্যাগসহ বিভিন্ন অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনায় বিভিন্ন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি খবরের শিরোনাম হলেও দলীয় প্রভাবের কারণে কখনোই চূড়ান্ত শাস্তির আওতায় আসেনি অভিযুক্তরা।
এদিকে প্রায় ২০ বছর পর নতুন শিক্ষক নিয়োগের দিকে যাচ্ছে বিএনপিপন্থী প্রশাসন। তবে নিয়োগে পূর্বের দুর্নীতি-অনিয়মের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি চান না শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগের দাবি তাদের। এদিকে শিক্ষক নিয়োগে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের আশ্বাস দিয়েছেন নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান।
জানা যায়, ২০০৪ সালে প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ বাণিজ্য শুরু হয় অষ্টম উপাচার্য অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের সময়ে। তৎকালীন শিক্ষক সমিতির নেতৃবৃন্দ তার বিরুদ্ধে অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ তুললে মাত্র দুই বছরের মাথায় আন্দোলনের মুখে পদ ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। নবম উপাচার্য অধ্যাপক ফয়েজ সিরাজুল হক তাঁর মেয়াদে কোনো নিয়োগই দেননি। এরপর ২০০৯ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত পাঁচজন উপাচার্য দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রত্যেকের দায়িত্বের সময়েই নিয়োগসহ নানা বিষয়ে একাধিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। দশম উপাচার্য ড. এম আলাউদ্দিন ও একাদশতম উপাচার্য ড. আবদুল হাকিম সরকারের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠায় ইউজিসির দুর্নীতি তদন্ত এবং শিক্ষক সমিতির আন্দোলনে তাদের অব্যাহতি দেওয়া হয়। ২০১৬ সালে দ্বাদশ উপাচার্য ড. হারুন-উর-রশীদ আসকারী যোগদানের পর তিন দফায় নিয়োগ বাণিজ্যের অডিও ক্লিপ ফাঁস হয়। ১৩তম উপাচার্য ড. শেখ আবদুস সালামেরও নিয়োগ বাণিজ্য ও চাকরির পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের ১৪টি অডিও ফাঁস হয়েছিল। নিয়োগকে কেন্দ্র করে অফিস ভাঙচুর, উপাচার্যের কার্যালয়ে হট্টগোল, গাড়ি ভাঙচুর ও পুড়িয়ে দেওয়াসহ শিক্ষকদের ওপর হামলার মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েছিলো নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ। এছাড়া তৎকালীন প্রশাসনগুলোর আমলে অনিয়মের অভিযোগের প্রেক্ষিতে গঠিত তদন্ত কমিটি নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। এছাড়া বিগত আওয়ামী আমলের ১৫ বছরে নিয়োগ পাওয়া মোট ১৮৪ জন শিক্ষকের সবাই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামীপন্থি শিক্ষক সংগঠন শাপলা ফোরামের সর্বশেষ নির্বাচনের ভোটার তালিকায় তাদের সবার নাম পাওয়া গেছে।
এদিকে সর্বশেষ ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পরে ১৪তম উপাচার্য হিসেবে অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ দায়িত্বগ্রহণের পরে ১৬জন শিক্ষক নিয়োগ দেন। তবে এই নিয়োগকেও ‘দলীয় নিয়োগ’ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নিয়োগপ্রাপ্ত ১৬ জনের মধ্যে ১১জনই বিএনপিপন্থী শিক্ষক সংগঠন জিয়া পরিষদের সদস্য হওয়ার আবেদন করেছেন। এই সময়ে ট্যুরিজম বিভাগের নিয়োগ ঠেকাতে বিভাগের সভাপতিকে অপহরণের অভিযোগ ওঠে শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়কের বিরুদ্ধে।
এছাড়াও সাংবাদিকতা বিভাগের সভাপতি ও বিএনপিপন্থী শিক্ষক সংগঠন ইউট্যাবের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. রশিদুজ্জামানের অসহযোগিতায় বিভাগটির শিক্ষক নিয়োগবোর্ড স্থগিত হয়। পরে গত ১৪ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৫তম উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ও বিএনপিপন্থী শিক্ষক নেতা ড. এ কে এম মতিনুর রহমান। দায়িত্বগ্রহণের পর তিনি পূর্বের দুর্নীতি-অনিয়মের ইতিহাস ভুলে ইতিবাচক কাজের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নেওয়ার বার্তা দেন। তারই ধারাবাহিকতায় আজ (২৩ জুন) থেকে পূর্বে স্থগিত হওয়া সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক নিয়োগের মধ্য দিয়ে নতুন নিয়োগ শুরু করতে যাচ্ছে তার নেতৃত্বাধীন প্রশাসন। এছাড়াও আগামী ২৪ ও ২৫ জুন সমাজকল্যাণ ও ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের শিক্ষক নিয়োগ বোর্ড অনুষ্ঠিত হবে। নিয়োগ বোর্ডকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি মহল তৎপর হয়ে উঠেছে। পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দিতে জোর লবিং ও তোড়জোড় চলছে।
উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান বিভাগগুলোতে প্রচুর শিক্ষক সংকট এবং নতুন বিভাগগুলোতে শিক্ষক সংখ্যা মাত্র ২-৩ জন। বিভাগগুলোতে একাডেমিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আমরা নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যাচ্ছি। অ্যাকাডেমিক ও নিয়োগ নির্বাচনী কমিটির মাধ্যমে স্বচ্ছতা এবং অ্যাকাডেমিক দক্ষতার মধ্য দিয়ে যারা বিবেচিত হবেন তাদেরকেই চূড়ান্ত নিয়োগের বিষয়ে বোর্ড সুপারিশ করবে। আমি আশ্বস্ত করতে চাই, নিয়োগের বিষয়ে আমার জায়গা থেকে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে।







