বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশে নেমে আসার পরও নীতি সুদহার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। সংগঠনটির মতে, টানা ৪ বছর ধরে কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণ করা হলেও মূল্যস্ফীতি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নামেনি। ফলে প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগবান্ধব জাতীয় বাজেটের সুফল অনেকটাই ম্লান হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) এক বিবৃতিতে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকিন আহমেদ বলেন, বর্তমানে দেশের বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৫ শতাংশে নেমে এসেছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে অন্যতম নিম্নস্তর। এরপরও নীতি সুদহার ১০ শতাংশে বহাল রাখার সিদ্ধান্ত ব্যবসায়ী মহলের জন্য হতাশাজনক।
তিনি উল্লেখ করেন, মে মাসে দেশের মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।
ডিসিসিআইর মতে, সদ্য অনুমোদিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেটে ব্যবসা সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করতে বিভিন্ন কর ও শুল্ক সুবিধা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মুদ্রানীতিতে সেই প্রবৃদ্ধিমুখী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। এতে রাজস্বনীতি ও মুদ্রানীতির মধ্যে একটি স্পষ্ট অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে। উচ্চ নীতি সুদহার বহাল থাকায় ঋণের ব্যয়ও কমছে না, যা নতুন বিনিয়োগের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তবে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে গতি ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিলকে স্বাগত জানিয়েছে ডিসিসিআই। সংগঠনটি বলেছে, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এ তহবিলের সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে ক্ষতিগ্রস্ত ও টিকে থাকার সংগ্রামে থাকা ক্ষুদ্র, কুটির, মাঝারি ও অতি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা (সিএমএসএমই), রপ্তানিমুখী শিল্প এবং উৎপাদনমুখী খাতকে সহজ শর্তে দ্রুত এ সুবিধার আওতায় আনতে হবে।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প-কারখানা পুনরুজ্জীবিত করার পাশাপাশি ধ্বংসের ঝুঁকিতে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সহায়তা দেওয়া জরুরি। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের কাছে দ্রুত ও কার্যকরভাবে প্রণোদনা পৌঁছে দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
সরকারের ব্যাংকঋণের ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরশীলতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ডিসিসিআই। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি প্রায় ২৬ শতাংশে পৌঁছেছে, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক বেশি। ফলে ব্যাংক খাতের সীমিত তারল্যের বড় অংশ সরকারি খাতে চলে যাচ্ছে এবং বেসরকারি খাতের জন্য পর্যাপ্ত ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
অন্যদিকে, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬ দশমিক ৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই লক্ষ্য অর্জনও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছে ব্যবসায়ী সংগঠনটি।
ডিসিসিআইর মতে, জাতীয় বাজেটে ঘোষিত বিভিন্ন কর ও রাজস্ব প্রণোদনা যতই আকর্ষণীয় হোক না কেন, পর্যাপ্ত ও সাশ্রয়ী অর্থায়নের সুযোগ নিশ্চিত না হলে সেসব উদ্যোগের কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না। তাই বিদ্যমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা এবং বেসরকারি খাতনির্ভর টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির মধ্যে আরো কার্যকর সমন্বয় এবং নীতিগত সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে সংগঠনটি।