• ই-পেপার

ইসলামে উন্নত জীবনযাপনে প্রচেষ্টা প্রশংসনীয়

হাদিসের বাণী

যেকারণে খাবারের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ বলা গুরুত্বপূর্ণ

ইসলামী জীবন ডেস্ক
যেকারণে খাবারের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ বলা গুরুত্বপূর্ণ
সংগৃহীত ছবি

বিশিষ্ট সাহাবি হুজাইফা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা যখন মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে কোনো খাবারে উপস্থিত হতাম, তখন তিনি খাবার শুরু না করা পর্যন্ত আমরা তাতে হাত দিতাম না। (খাবার খেতাম না।) একবার আমরা মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে কোনো এক খাবারের মজলিসে উপস্থিত হলাম। তখন একটি বাচ্চা মেয়ে এমনভাবে দৌড়ে খাবারে হাত দিতে এলো, যেন তাকে (পিছন থেকে) ধাক্কা দেওয়া হচ্ছিল। তখন মহানবী (সা.) তার হাতটাকে ধরে ফেললেন, তখন একজন বেদুইনও সেভাবে দৌড়ে এলো, যেন তাকে তাড়িয়ে আনা হচ্ছে। মহানবী (সা.) তার হাতও ধরে বললেন, যে খাবারে আল্লাহর নাম না নেওয়া হয়, সেখানে শয়তান তার জন্য খাবারকে বৈধ করে নেয়, আর বাচ্চাটিকে শয়তানই মূলত নিয়ে এসেছে, যাতে তার মাধ্যমে সে নিজের খাবার বৈধ করতে পারে। কিন্তু আমি তো তার হাত ধরে ফেলতে সক্ষম হয়েছি। তারপর শয়তান এই বেদুইনকে নিয়ে এসেছিল, যাতে তার মাধ্যমেও শয়তান খাবার বৈধ করে নিতে পারে। আমি তার হাতও ধরে ফেললাম। সেই মহান সত্তার শপথ, যার হাতে আমার জীবন, ওই দুজনের হাতের সাথে শয়তানের হাতও পাকড়াও করা হয়েছিল। তারপর মহানবী (সা.) আল্লাহর নাম নিয়ে খাবার গ্রহণ করতে লাগলেন, (এবং উপস্থিত সাহাবিরাও তাঁর সঙ্গে খাবার খেতে শুরু করলো)। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৫২৫৯, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২৩২৪৯)

শিক্ষা ও বিধান
১. খাবার শুরু করার আগে ‘বিসমিল্লাহ’ বলা সুন্নত। কেননা আল্লাহর নাম নিয়ে খাবার শুরু করলে শয়তান তাতে অংশ নিতে পারে না।
২. শিশুদের ইসলামী আদব-কায়দা শেখানো অভিভাবকদের দায়িত্ব। তাই ছোটবেলা থেকেই ‘বিসমিল্লাহ’ বলে খাবার শুরু করানোর মধ্য দিয়ে এই অভ্যাস গড়ে তুলা উচিত।
৩. শয়তান মানুষকে গুনাহ ও অসতর্কতার দিকে প্ররোচিত করে। তাই সর্বদা সচেতন থাকা এবং আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করা জরুরি।
৪. শয়তানের কৌশল সূক্ষ্ম ও গোপন। সে কখনো শিশু বা অসচেতন ব্যক্তিকে মাধ্যম বানিয়ে মানুষকে সুন্নাহ থেকে দূরে সরাতে চায়।
৫. গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যের সত্যতা জোরালোভাবে বোঝাতে শপথ করা বৈধ। মহানবী (সা.) প্রয়োজনে আল্লাহর নামে শপথ করে বিষয়টির গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।

সারকথা, এই হাদিস আমাদের শিক্ষা দেয় যে, খাবারের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ বলা শুধু একটি সুন্নত নয়; বরং এটি শয়তানের অংশগ্রহণ থেকে খাবারকে রক্ষা করার গুরুত্বপূর্ণ আমল। তাই নিজেরা এ আমল করার পাশাপাশি পরিবার ও সন্তানদেরও এর শিক্ষা দেওয়া প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব ও কর্তব্য।

অহেতুক পেরেশানি থেকে মুক্তির দোয়া

মুফতি ওমর বিন নাছির
অহেতুক পেরেশানি থেকে মুক্তির দোয়া
সংগৃহীত ছবি

মানুষের জীবনে দুশ্চিন্তা, পেরেশানি ও মানসিক অস্থিরতা নতুন কোনো বিষয় নয়। কখনো ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা, কখনো জীবিকার সংকট, কখনো পারিবারিক জটিলতা, আবার কখনো অকারণ ভয় ও উদ্বেগ মানুষের হৃদয়কে ভারাক্রান্ত করে তোলে। তবে একজন মুমিন জানেন, জীবনের প্রতিটি অবস্থা আল্লাহর ইচ্ছার অধীন এবং তাঁরই স্মরণে অন্তর প্রশান্তি লাভ করে। তাই ইসলাম মানুষকে শুধু সমস্যার কথা বলেই থেমে যায়নি; বরং প্রতিটি দুশ্চিন্তা ও পেরেশানির মুহূর্তে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়ার সুন্দর দোয়াও শিক্ষা দিয়েছে। তীব্র পেরেশানির সময় আল্লাহর রাসুল (সা.) এই দোয়া বেশি বেশি পাঠ করতেন। 

لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ الْعَظِيمُ الْحَلِيمُ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ رَبُّ السَّمَوَاتِ، وَرَبُّ الْأَرْضِ، وَرَبُّ الْعَرْشِ الْكَرِيمِ

উচ্চারণ : লা ইলাহা ইল্লাল্লাহুল আজিমুল হালিম, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু রাব্বুল আরশিল আজিম, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু রাব্বুস সামাওয়াতি ওয়া রাব্বুল আরদ্বি ওয়া রাব্বুল আরশিল কারিম।

অর্থ : আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য মাবুদ নেই; যিনি সুমহান, সহিষ্ণু। আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই; যিনি সুবৃহৎ আরশের প্রতিপালক। আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য আরাধ্য নেই; যিনি আকাশমণ্ডলী, পৃথিবী ও সম্মানিত আরশের অধিপতি। (সহিহ্ বুখারি : হাদিস নং : ৬৩৪৬)

আজ পবিত্র কাবা শরিফ বার্ষিক ধৌতকরণ : সম্পন্ন হয়েছে সব প্রস্তুতি

ইসলামী জীবন ডেস্ক
আজ পবিত্র কাবা শরিফ বার্ষিক ধৌতকরণ : সম্পন্ন হয়েছে সব প্রস্তুতি
সংগৃহীত ছবি

আজ মুসলিম বিশ্বের সর্বাধিক পবিত্র স্থান পবিত্র কাবা শরিফ বার্ষিক ধৌতকরণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে নতুনভাবে সুশোভিত হবে। এ উপলক্ষে দুই পবিত্র মসজিদের তত্ত্বাবধায়ক সাধারণ কর্তৃপক্ষ অনুষ্ঠানটির পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি ও কার্যক্রমের বিস্তারিত প্রকাশ করেছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অত্যন্ত যত্ন, শৃঙ্খলা ও মর্যাদার সঙ্গে এই ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা হবে, যা বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের হৃদয়ে কাবা শরিফের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার প্রতীক।

প্রতিবছরের মতো এবারও কাবা শরিফ ধৌতকরণ কার্যক্রম সুপরিকল্পিত কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হবে। প্রথমে প্রস্তুতি পর্বে সকল প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা সম্পন্ন করা হয়। একই সঙ্গে ধৌতকরণ ও সুগন্ধিকরণের জন্য বিশেষ মিশ্রণ প্রস্তুত করা হয়। এ মিশ্রণে ব্যবহার করা হয় ১৫ লিটার পবিত্র জমজমের পানি, ১৫ লিটার তাইফের গোলাপ পানি, ১৫ লিটার গোলাপ তেল এবং ১০০ মিলিলিটার উৎকৃষ্ট মানের উদ (আগর) তেল। এ ছাড়া ধৌতকরণ চলাকালে কাবার গিলাফ সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে দরজার আবরণের নিচের অংশ সতর্কতার সঙ্গে উপরে তুলে রাখা হয়।

এরপর শুরু হয় মূল ধৌতকরণ পর্ব। বিশেষভাবে প্রস্তুত করা কাপড়ের সাহায্যে জমজমের পানি ও তাইফের গোলাপ পানির মিশ্রণ দিয়ে কাবা শরিফের অভ্যন্তরের দেয়াল, স্তম্ভ এবং মেঝে ধুয়ে পরিষ্কার করা হয়। সবশেষে সুগন্ধিকরণ ও ধূপন পর্ব। এ সময় কাবা শরিফের ভেতরের দেয়াল ও কোণাগুলো উৎকৃষ্ট মানের উদ তেল ও আম্বর দিয়ে সুগন্ধিত করা হয়। পরে মনোমুগ্ধকর সুগন্ধি ও ধূপের সুবাসে কাবার অভ্যন্তর ভরে ওঠে। এই আধ্যাত্মিক পরিবেশ প্রতিবছর মুসলিম বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে নতুন আবেগ ও ভালোবাসার সঞ্চার করে।

দুই পবিত্র মসজিদের সাধারণ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই মর্যাদাপূর্ণ অনুষ্ঠানকে ঘিরে ব্যবহৃত প্রতিটি উপকরণ ও সরঞ্জাম আগেভাগেই সর্বোচ্চ মান বজায় রেখে প্রস্তুত করা হয়েছে। বিশুদ্ধতা, নিরাপত্তা, গোপনীয়তা এবং সেবার সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত করেই সম্পন্ন করা হবে কাবা শরিফ ধৌতকরণের এই আধ্যাত্মিক আয়োজন।

আহলে বাইত : মহানবী (সা.)–এর পবিত্র পরিবার

মুফতি ওমর বিন নাছির
আহলে বাইত : মহানবী (সা.)–এর পবিত্র পরিবার
সংগৃহীত ছবি

মানবজাতির ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব হলেন মহানবী (সা.)। আল্লাহ তাআলা তাঁকে সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছেন। তাঁর প্রতি ঈমান, ভালোবাসা ও আনুগত্য যেমন ইসলামের মৌলিক দাবি, তেমনি তাঁর পবিত্র পরিবার—আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনও একজন মুমিনের ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ কারণেই প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে আমরা দরুদ শরিফ পাঠ করার সময় শুধু মহানবী (সা.)-এর জন্য নয়, তাঁর পরিবারবর্গের জন্যও আল্লাহর কাছে রহমত ও বরকতের দোয়া করি— 


اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ
এটি শুধু একটি দোয়া নয়; বরং মুসলিম উম্মাহর কাছে আহলে বাইতের মর্যাদা ও সম্মানের এক চিরন্তন ঘোষণা।

দুঃখজনক হলেও সত্য, আজ অনেক মুসলমান আহলে বাইত সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখেন না। কেউ তাঁদের প্রাপ্য মর্যাদা দিতে গিয়ে সীমা অতিক্রম করেন, আবার কেউ তাঁদের মর্যাদা ও অধিকার সম্পর্কে উদাসীনতা দেখান। অথচ ইসলামের শিক্ষা হলো মধ্যপন্থা—আহলে বাইতকে ভালোবাসতে হবে, সম্মান করতে হবে, তাঁদের আদর্শ অনুসরণ করতে হবে; তবে এমন কোনো বিশ্বাস পোষণ করা যাবে না, যা কোরআন ও সুন্নাহর সীমার বাইরে চলে যায়।

‘আহলে বাইত’ শব্দের অর্থ হলো ‘গৃহের লোক’ বা ‘পরিবারের সদস্য’। কোরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘হে আহলে বাইত! আল্লাহ তো শুধু চান তোমাদের থেকে সব ধরনের অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদের পূর্ণরূপে পবিত্র করতে।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৩৩)

এই আয়াত আহলে বাইতের বিশেষ মর্যাদার সুস্পষ্ট প্রমাণ। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই আয়াতের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী আয়াতগুলো সরাসরি মহানবী (সা.)-এর পবিত্র স্ত্রীদের উদ্দেশে নাজিল হয়েছে। তাই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের সর্বসম্মত আকিদা হলো, উম্মাহাতুল মুমিনীন তথা মহানবী (সা.)-এর সম্মানিত স্ত্রীরা আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত। পাশাপাশি আলী (রা.), ফাতিমা (রা.), ইমাম হাসান (রা.) ও ইমাম হুসাইন (রা.) আহলে বাইতের বিশেষ মর্যাদাপ্রাপ্ত সদস্য। সহিহ মুসলিমে বর্ণিত বিখ্যাত ‘হাদিসে কিসা’-তে আয়েশা (রা.) বলেন, একদিন মহানবী (সা.) একটি চাদরের নিচে হাসান, হুসাইন, ফাতিমা ও আলী (রা.)-কে একত্র করে উপরোক্ত আয়াত তিলাওয়াত করেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৪২৪)। এর মাধ্যমে তাঁদের বিশেষ ফজিলত ও সম্মান স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়।

এতেই আহলে বাইতের পরিধি শেষ নয়। অধিকাংশ মুহাদ্দিস ও ফকিহের মতে, বনু হাশিমের মুসলিম সদস্যরাও আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মহানবী (সা.)-এর চাচা আব্বাস (রা.) ও তাঁর বংশধর, আকিল (রা.)-এর পরিবার, জাফর (রা.)-এর পরিবার এবং হারিস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের বংশধররা। মহানবী (সা.) তাঁদের প্রতিও বিশেষ সম্মান প্রদর্শন করতেন এবং মুসলিম উম্মাহকে তাঁদের মর্যাদা রক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছেন।

আহলে বাইতের সম্মান এতটাই মহান যে তাঁদের জন্য সাধারণ জাকাত ও সাদকা গ্রহণ হারাম করা হয়েছে। যায়েদ ইবনে আরকাম (রা.) বর্ণনা করেন, মক্কা ও মদিনার মাঝখানে ‘গাদিরে খুম’ নামক স্থানে মহানবী (সা.) ভাষণ দিতে গিয়ে তিনবার বলেছিলেন, ‘আমি তোমাদেরকে আমার আহলে বাইতের ব্যাপারে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি।’ পরে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, তাঁর স্ত্রীরা আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত এবং যাঁদের জন্য সাদকা হারাম, তাঁরাও আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১৮৪৬৪)
আর সদকার মালের পরিবর্তে আল্লাহ তাআলা তাঁদের জন্য যুদ্ধলব্ধ সম্পদের (গনিমতের) নির্ধারিত অংশ রেখেছিলেন, যা তাঁদের মর্যাদারই বহিঃপ্রকাশ।

মহানবী (সা.) তাঁর পরিবারের সদস্যদের মর্যাদা সম্পর্কে বহু হাদিসে আলোকপাত করেছেন। গাদিরে খুমের ঘটনার প্রেক্ষাপটে তিনি বলেন, ‘আমি যার অভিভাবক (ঘনিষ্ঠ বন্ধু), আলীও তার অভিভাবক। হে আল্লাহ! যে আলীকে ভালোবাসে, আপনি তাকে ভালোবাসুন এবং যে তাঁর শত্রুতা করে, আপনি তার শত্রু হন।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ৯৬১)। 

একই ভাবে তিনি ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইন (রা.) সম্পর্কে বলেছেন, ‘হাসান ও হুসাইন জান্নাতি যুবকদের নেতা।’ (সুনান তিরমিজি, হাদিস : ৩৭৬৮)। 
আর তাঁর প্রিয় কন্যা ফাতিমা (রা.) সম্পর্কে বলেছেন, ‘ফাতিমা জান্নাতের নারীদের নেত্রী।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৭১৪)

 এসব হাদিস প্রমাণ করে যে আহলে বাইতের সদস্যরা শুধু নবীজির আত্মীয়ই নন; তাঁরা ইসলামের ইতিহাসে অনন্য মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব। তাই আহলে বাইতের প্রতি একজন মুমিনের প্রথম কর্তব্য হলো তাঁদেরকে অন্তর থেকে ভালোবাসা। এ ভালোবাসা শুধু আবেগের বিষয় নয়; এটি ঈমানের দাবি। দ্বিতীয় কর্তব্য হলো তাঁদের যথাযথ সম্মান করা এবং তাঁদের সম্পর্কে কোনো ধরনের অবমাননাকর মন্তব্য বা বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব থেকে বিরত থাকা। তৃতীয় কর্তব্য হলো তাঁদের জীবনাদর্শ অনুসরণ করা। 
 আলী (রা.)-এর জ্ঞান, ন্যায়পরায়ণতা ও সাহস, ফাতিমা (রা.)-এর ইবাদত, লজ্জাশীলতা ও ত্যাগ, ইমাম হাসান (রা.)-এর ধৈর্য ও উদারতা এবং ইমাম হুসাইন (রা.)-এর সত্যের জন্য আত্মত্যাগ—এসব প্রতিটি মুসলমানের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ।

তবে এ ক্ষেত্রেও ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষা স্মরণ রাখা জরুরি। আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসা কখনোই এমন পর্যায়ে পৌঁছানো উচিত নয়, যাতে তাঁদেরকে নবুয়তের মর্যাদায় উন্নীত করা হয় বা তাঁদের সম্পর্কে এমন বিশ্বাস পোষণ করা হয়, যার কোনো ভিত্তি কোরআন ও সহিহ সুন্নাহে নেই। আবার অন্যদিকে তাঁদের মর্যাদা অস্বীকার করা, তাঁদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা কিংবা তাঁদের অবমূল্যায়ন করাও মারাত্মক অন্যায়। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকিদা হলো—আহলে বাইত এবং সকল সাহাবায়ে কিরাম—উভয়ের প্রতিই ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শন করা। একজনের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অন্যজনকে হেয় করা কখনোই ইসলামের শিক্ষা নয়।

বিশেষভাবে লক্ষ্যনীয় বিষয় হলো— 
ইসলামের ইতিহাসে কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ে চিরস্থায়ী বেদনার স্মারক। ইমাম হুসাইন (রা.) ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের শাহাদাত নিঃসন্দেহে ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম হৃদয়বিদারক অধ্যায়। এ ঘটনার পর মুসলিম সমাজে নানা মতভেদ ও বিভক্তির সৃষ্টি হয়। কেউ আহলে বাইতের প্রতি অতিভক্তি দেখাতে গিয়ে অন্য সাহাবিদের অবমাননা করেছে, আবার কেউ সাহাবিদের সম্মান করতে গিয়ে আহলে বাইতের প্রাপ্য মর্যাদা উপেক্ষা করেছে। অথচ কোরআন ও সুন্নাহ আমাদের যে পথ দেখিয়েছে, তা হলো ন্যায়, ভারসাম্য ও সংযমের পথ। এক্ষেত্রে অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, সাহাবায়ে কেরাম সবাই ছিলেন ‘মিয়ারে হক’ তথা ‘সত্যের মাপকাঠি’। তাই কোনো ভাবেই তাঁদের কারো প্রতি কোনো ধরণের বিদ্বেষ বা রূঢ়মনোভাব পোষন করা যাবে না। 

আহলে বাইত ছিলেন ঈমান, তাকওয়া, জ্ঞান, ইবাদত, ত্যাগ, ধৈর্য ও সত্যের পথে অবিচল থাকার জীবন্ত প্রতীক। তাঁদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের সর্বোত্তম উপায় শুধু আবেগ নয়; বরং তাঁদের জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা, তাঁদের আদর্শকে নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করা এবং তাঁদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও দোয়া অব্যাহত রাখা। একই সঙ্গে সকল সাহাবায়ে কিরামের প্রতিও আন্তরিক ভালোবাসা ও সম্মান বজায় রাখা একজন সুন্নি মুসলমানের আকিদার অপরিহার্য অংশ। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে মহানবী (সা.)-এর সুন্নাহ দৃঢ়ভাবে অনুসরণ করার, তাঁর পবিত্র আহলে বাইতকে যথাযথভাবে ভালোবাসার এবং সকল সাহাবায়ে কিরামের মর্যাদা রক্ষা করার তাওফিক দান করুন। আমিন।