ঈমান শুধু কোনো সামাজিক উত্তরাধিকার নয়, কোনো পরিবেশের অন্ধ অনুসরণ নয়, কোনো বংশপরম্পরায় চলে আসা অভ্যাসও নয়; বরং ঈমান হলো এক মহান সত্য, যার ওপর আসমান ও জমিন প্রতিষ্ঠিত এবং যার ওপর নির্ভর করে দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতা।
মহান আল্লাহ আমাদের কাছে অন্ধ ঈমান চাননি কিংবা প্রমাণহীন কোনো বিশ্বাসও চাননি; বরং তিনি ঈমানকে দুটি মহান বিষয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছেন—
প্রথমত, সত্যকে চেনার জন্য বিবেক ও বুদ্ধির আলো।
দ্বিতীয়ত, অন্তরকে সঠিক পথ দেখানোর জন্য ওহির আলো। এ কারণেই আজকের আলোচনার বিষয়—‘আমরা কেন ঈমান আনি।’ গোটা বিশ্ব আল্লাহর অস্তিত্বের সাক্ষ্য দেয়।
প্রথমত, একটু চিন্তা করুন এই মহাবিশ্ব নিয়ে, যেখানে আমরা বসবাস করছি। একটি উঁচু আকাশ, বিস্তৃত পৃথিবী, সূর্য ও চন্দ্র, আর দিগন্তজুড়ে অসংখ্য নিদর্শন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আসমান ও জমিনের সৃষ্টিতে এবং রাত ও দিনের পরিবর্তনে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৯০)
এসব শুধু সৌন্দর্যের দৃশ্য নয়; বরং এগুলো হলো নিদর্শন, প্রমাণ ও ইঙ্গিত, যা আমাদের সেই স্রষ্টার দিকে নিয়ে যায়, যিনি সৃষ্টি করেছেন এবং নিখুঁত করেছেন।
সুস্থ বিবেক যখন এই মহাবিশ্বের শৃঙ্খলা ও নিখুঁত ব্যবস্থাপনা দেখে, তখন সে বুঝতে পারে—এর পেছনে অবশ্যই একজন প্রজ্ঞাময় স্রষ্টা রয়েছেন।
কোরআন এমন এক স্পষ্ট প্রশ্ন করেছে, যার পর অস্বীকারের কোনো সুযোগ থাকে না—‘তারা কি কোনো কিছু ছাড়াই সৃষ্টি হয়েছে, নাকি তারা নিজেরাই নিজেদের স্রষ্টা?’ (সুরা : আত-তুর, আয়াত : ৩৫)
মানুষ নিজেই আল্লাহর নিদর্শন
মহান আল্লাহ বলেন, ‘এবং তোমাদের নিজেদের মধ্যেও (নিদর্শন আছে), তবে কি তোমরা দেখতে পাও না?’ (সুরা : আজ-জারিয়াত, আয়াত : ২১)
নিজের দিকে তাকাও—একটি হৃদয়, যা তোমার অনুমতি ছাড়াই অবিরাম স্পন্দিত হচ্ছে। একটি শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যবস্থা, যা নিজে থেকেই চলছে। চোখ, যা দেখে। কান, যা শোনে। বুদ্ধি, যা চিন্তা করে, বিশ্লেষণ করে, তুলনা করে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
তুমি দীর্ঘ সময় ঘুমিয়ে থাকলেও তোমার ভেতরে একটি ব্যবস্থা অবিরাম কাজ করে যাচ্ছে—হৃৎস্পন্দনের নিয়মিততা, কোষের পুনর্গঠন, শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
এসব কে তোমার মধ্যে স্থাপন করেছেন? আল্লাহ বলেন, ‘যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তোমাকে সুবিন্যস্ত করেছেন এবং সুষম করেছেন। তিনি যেভাবে চেয়েছেন, সেভাবেই তোমাকে গঠন করেছেন।’ (সুরা : আল-ইনফিতার. আয়াত : ৭-৮)
মানুষের স্বভাব আল্লাহকে চিনতে প্রস্তুত
ঈমান কোনো আকস্মিক ধারণা নয়; বরং এটি অন্তরের একটি মূল স্বভাব। মানুষ আল্লাহকে চেনার স্বাভাবিক প্রবণতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। আল্লাহ বলেন, ‘এটাই আল্লাহর সেই স্বভাব, যার ওপর তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা : আর-রুম, আয়াত : ৩০)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক শিশু ফিতরাতের ওপর জন্মগ্রহণ করে। অতঃপর তার পিতা-মাতা তাকে ইহুদি, খ্রিস্টান অথবা অগ্নিপূজক বানায়।’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
তাই যখন ভয় তীব্র হয়, যখন বিপদ-সংকট নেমে আসে, যখন কঠিন পরীক্ষা আসে—তখন মানুষের অন্তরের পর্দাগুলো সরে যায় এবং তার প্রকৃত স্বভাব প্রকাশ পায়। তখন সে কী বলে? সে বলে—‘হে আমার রব! হে আল্লাহ!’ এ বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেন, ‘যখন তারা নৌযানে আরোহণ করে, তখন তারা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহকে ডাকে। অতঃপর তিনি যখন তাদের স্থলে পৌঁছে দেন, তখন তারা আবার শিরক করে।’ (সুরা : আল-আনকাবুত, আয়াত : ৬৫)
আল্লাহ আমাদের উদ্দেশ্যহীনভাবে ছেড়ে দেননি
যদি মানুষ কোনো উদ্দেশ্য ছাড়া সৃষ্টি হতো, তাহলে তার জীবন হতো এক বিভ্রান্তি। তখন সত্য ও মিথ্যার মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকত না। কিন্তু আল্লাহর রহমত ও প্রজ্ঞা এ কথা অনুমোদন করে না যে তিনি আমাদের সৃষ্টি করবেন এবং কোনো পথনির্দেশ ছাড়াই ছেড়ে দেবেন। আল্লাহ বলেন, ‘আমি রাসুলদের সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে পাঠিয়েছি, যাতে রাসুলদের পরে মানুষের জন্য আল্লাহর বিরুদ্ধে কোনো অজুহাত না থাকে।’ (সুরা : আন-নিসা, আয়াত : ১৬৫)
তিনি রাসুল পাঠিয়েছেন, কিতাব নাজিল করেছেন এবং সর্বশেষে মুহাম্মদ (সা.)-কে পাঠিয়েছেন। তাঁর মাধ্যমে দিয়েছেন মহান কোরআন—যা হলো আলো, হেদায়েত ও শেফা। আল্লাহ বলেন, ‘হে মানুষ! তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে প্রমাণ এসেছে এবং আমি তোমাদের প্রতি সুস্পষ্ট আলো নাজিল করেছি।’ (সুরা : আন-নিসা, আয়াত : ১৭৪)
কোরআন হলো আল্লাহকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার গ্রন্থ। জীবনের উদ্দেশ্য বুঝিয়ে দেওয়ার গ্রন্থ। ভুল ধারণা সংশোধনের গ্রন্থ; ন্যায় প্রতিষ্ঠার গ্রন্থ এবং আত্মাকে পবিত্র করার গ্রন্থ। এটিই মানুষকে ঈমানের পথে নিয়ে যায়।
ইবাদত মানুষকে তার প্রকৃত অবস্থানে ফিরিয়ে দেয়
আল্লাহ বলেন, ‘হে মানুষ! তোমরা তোমাদের সেই রবের ইবাদত কর, যিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা : আল-বাকারাহ, আয়াত : ২১)
আল্লাহ ইবাদতের সঙ্গে সৃষ্টির সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, তিনিই তোমার আনুগত্যের সর্বাধিক অধিকারী। যিনি তোমাকে রিজিক দিয়েছেন, তিনিই তোমার আশা করার সর্বাধিক যোগ্য। যিনি তোমার সব বিষয় পরিচালনা করেন, তাঁর ওপরই তোমার ভরসা করা উচিত।
ইবাদত মানে হলো অন্তরকে তার সঠিক স্থানে ফিরিয়ে আনা। তোমার হৃদয় আল্লাহর সঙ্গে থাকবে, প্রবৃত্তির সঙ্গে নয়। তোমার আশা আল্লাহর কাছে থাকবে; মানুষের কাছে নয়। তোমার নির্ভরতা আল্লাহর ওপর থাকবে; শুধু উপকরণের ওপর নয়। তাই আল্লাহ বলেন, ‘জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।’ (সুরা : আর-রাদ, আয়াত : ২৮)
ঈমান অন্তরকে সংশোধন করে, ফলে বাহ্যিক আচরণ সুন্দর হয়। ঈমান বিবেককে পবিত্র করে, ফলে চরিত্র সঠিক হয়। ঈমান মানুষকে মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে মানুষের রবের দাসত্বে নিয়ে যায়।
হে আল্লাহ! দুনিয়া ও তার সবকিছুর চেয়ে ঈমানকে আমাদের কাছে বেশি প্রিয় করে দিন।