দেশের ৩২ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘প্রধান শিক্ষক’ পদে নিয়োগ, শিক্ষকদের পদোন্নতি, বদলি, প্রেষণ নিয়ে জটিলতার সৃষ্টি হয়েছিল। সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে দীর্ঘদিনের সেই জটিলতার নিরসন হলো।
আজ বৃহস্পতিবার ৬ বছর আগে দেওয়া হাইকোর্টের এসংক্রান্ত রায় বাতিল করে দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার বিচারপতির আপিল বেঞ্চ। এর ফলে ২০১৩ সালে জাতীয়করণ ২৬ হাজার ১৯৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ মোট ৩২ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদে নিয়োগ, শিক্ষকদের পদোন্নতি, বদলি বা প্রেষণের ক্ষেত্রে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে আর কোনো বাধা থাকছে না বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা মো. রুহুল কুদ্দুস কাজলসহ সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা।
জানা যায়, ২০১৩ সালে সরকার ২৬ হাজার ১৯৩টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে অধিগ্রহণ করে। ওই বছরের ৯ জানুয়ারি রাজধানীর প্যারেড গ্রাউন্ডে এক শিক্ষক মহাসমাবেশে তৎকালীন সরকার প্রধান শেখ হাসিনা প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো জাতীয়করণের ঘোষণা দেন। পরে ১৯৭৪ সালের প্রাথমিক বিদ্যালয় (অধিগ্রহণ) আইনের ৬ ধারার ক্ষমতাবলে সরকার ওই বছর ৯ সেপ্টেম্বর ‘অধিগ্রহণকৃত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক (চাকরির শর্তাদি নির্ধারণ) বিধিমালা’ শিরোনামে বিধিমালা প্রণয়ন করে। ওই বিধিমালার আলোকে অধিগ্রহণ করা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে ওই বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ‘জাতীয়করণ’ করা হয়েছে বলে গণ্য করা হয়। ফলে এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের চাকরিও ২০১৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত হয়। কিন্তু জটিলতা তৈরি হয় এসব শিক্ষকদের পেনশন, সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেলের সুবিধা দেওয়ার দেওয়া নিয়ে। বিধিমালার ২(গ) বিধিতে বলা আছে, ‘অধিগ্রহণ বা জাতীয়করণের’ তারিখের আগে এই সব প্রাথমিকের শিক্ষকরা যত দিন চাকরি করেছেন (কার্যকর চাকরিকাল), তার অর্ধেক সময় ধরে সে অনুযায়ী পেনশন, সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল সুবিধা দেওয়া হবে। তবে তা চার বছরের কম হলে ‘কার্যকর চাকরিকাল’ হিসেবে গণ্য করা হবে না।
২০১৭ সালে ২(গ) এবং ৯(১) বিধির একটি অংশবিশেষ চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন কিছু শিক্ষক।
৯(১) বিধিতে বলা আছ, ‘বিধি ৪-এর অধীন কোনো শিক্ষকের নিয়োগ প্রদানের তারিখ হইতে কার্যকর চাকুরীকালের ভিত্তিতে শিক্ষক পদে তাহার জ্যেষ্ঠতা গণনা করা হইবে এবং উক্ত তারিখের অব্যবহিত পূর্বে নিয়োগ বিধির অধীন শিক্ষক পদে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত সর্বশেষ ব্যক্তির নিচে উক্ত শিক্ষকের অবস্থান নির্ধারিত হইবে।’
প্রাথমিক শুনানির পর হাইকোর্ট রুল জারি করেন। ৯(১) বিধির ‘এবং উক্ত তারিখের অব্যবহিত পূর্বে নিয়োগ বিধির অধীন শিক্ষক পদে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত সর্বশেষ ব্যক্তির নিচে উক্ত শিক্ষকের অবস্থান নির্ধারিত হইবে’ অংশটি কেন বেআইনি ও আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, জানতে চাওয়া হয় রুলে। চূড়ান্ত শুনানির পর হাইকোর্ট ৯(১) বিধির এই অংশ অবৈধ ঘোষণা করে ২০১৯ সালের ১১ মার্চ রায় দেন। এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন (লিভটু আপিল) করে সরকার। ২০২২ সালের ২০ নভেম্বর লিভটু আপিল মঞ্জুর করে সরকারকে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার অনুমতি দেন সর্বোচ্চ আদালত। পাশাপাশি হাইকোর্টের রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত করা হয়। পরে ২০২৩ সাল সরকার আপিল করে। পাশাপাশি ২০১৩ সালে প্রণীত বিধিমালার অধীনে জাতীয়করণ করা ওইসব বিদ্যালয়ে সরাসরি নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকরাও আপিল বিভাগে আবেদন করেন। শুনানি শেষে সরকারের আপিল মঞ্জুর করে গতকাল রায় দিলেন সর্বোচ্চ আদালত।
আদালতে আপিলের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ অনীক রুশদ হক, আইনজীবী মুনতাসির উদ্দিন আহমেদ। রিট আবেদনকারীদের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সালাহ উদ্দিন দোলন ও মো. মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরী। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী রমজান আলী শিকদার।
রায়ের পর নিজ কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে অ্যাটর্নি জেনারলে বলেন, ‘আইনি জটিলতার কারণে সারা দেশে প্রায় ৩২ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক ছিলেন না। অনেক ক্ষেত্রে হয়তো স্থানীয় আয়োজনে একজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সরকারের যে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া, বদলি করার যে ব্যাপার আছে, এই মামলার কারণে এত দিন তা কার্যকর হচ্ছিল না। প্রধান শিক্ষকের পদ খালি ছিল। সরকার নিয়োগ দিতে পারছিল না। নানা রকম জটিলতা। আজকের রায়ের পর সেই জটিলতা নিরসন হবে। সরকার প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারবে। একটা শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।’
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের স্থান থাকবে ওপরে। আর অধিগ্রহণ করা বেসরকারি স্কুল থেকে যাঁরা এসেছেন, তাঁদের স্থান থাকবে নিচে। এটাই আজ প্রতিষ্ঠিত হলো।’
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালে ২৬ হাজার ১৯৩টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় অধিগ্রহণ করার পর হাইকোর্টের রায়ের কারণে নতুন করে ৫ হাজার ৮০৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নিয়োগে জটিলতা সৃষ্টি হয় বলে কালের কণ্ঠকে জানান আইনজীবী মুনতাসির উদ্দিন আহমেদ।







