• ই-পেপার

ইরান সংকটের আসল পরীক্ষা শুরু

  • ড. ফরিদুল আলম

অবকাঠামো চাকচিক্যের চেয়ে মানবদক্ষতা জরুরি

অজেয় রোহিতাশ্ব আল্-কাযী

অবকাঠামো চাকচিক্যের চেয়ে মানবদক্ষতা জরুরি

বাংলাদেশ কি শুধু মেট্রো রেলে চড়ে, পদ্মা সেতু পেরিয়ে আর বাইরের আলোতে ঝলমল করা উন্নয়নের তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে থাকবে, নাকি এমন এক সমাজ গড়বে, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের দক্ষতা ও জীবনমান সত্যিকার অর্থে বিশ্বমানের হবে? আজকের বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এটিই। আমাদের সমস্যা আদৌ জটিল নয়, এটি আমাদের আত্মসন্তুষ্টি, অসংখ্য বিচ্ছিন্ন ও অদূরদর্শী পরিকল্পনা এবং সনদপত্রের প্রতি অন্ধবিশ্বাসের বিষাক্ত ফসল। দক্ষতার চেয়ে সার্টিফিকেটকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার এই মানসিকতা না বদলালে আমরা চিরকাল এক অভিশপ্ত মধ্যম আয়ের ফাঁদে আটকে থাকব, যেখানে প্রবৃদ্ধির সংখ্যা হয়তো বা চোখ ধাঁধাবে, কিন্তু মানুষের জীবন বদলাবে না।

দক্ষিণ কোরিয়ার পার্ক চুং-হি মডেলের দিকে যদি তাকাই, পার্ক শুধু কারখানা বানাননি। তিনি বুঝেছিলেন, শিল্পের জন্য সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো শিল্পোপযোগী মানুষ। তাই কোরিয়ার রূপান্তরের মূলে ছিল প্রযুক্তিগত শিক্ষা, পলিটেকনিকের বিস্তার এবং শিল্প-শিক্ষার লৌহ-দৃঢ় সংযোগ। তাদের লক্ষ্য ছিল ডিগ্রির ফুলঝুরি নয়, বাস্তব ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কফোর্স তৈরি করা। ফলে তাদের শ্রমশক্তি নিম্নমূল্যের উৎপাদন থেকে উচ্চমূল্যের প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে উত্তরণ ঘটিয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি, সীমিত শিল্পভিত্তি ও বিশাল জনসংখ্যা দ্রুত কর্মসংস্থানের দাবি করেছিল। জিয়াউর রহমানের যুগে বাজারমুখী নীতি, বেসরকারি উদ্যোগ, গ্রামীণ অর্থনীতি ও প্রবাসী রেমিট্যান্সের ওপর জোর দেওয়া হয়েছিলসেই সময়ের জন্য যা যৌক্তিক ছিল। কিন্তু সেই কর্মসংস্থানকে উচ্চ দক্ষতায় রূপান্তরের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো কখনোই তৈরি করা হয়নি। ঠিক এখানেই কোরিয়া ও বাংলাদেশের পথ আলাদা হয়ে গেছে। কোরিয়া কর্মসংস্থানকে দক্ষতার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি করেছিল, আমরা শুধু সংখ্যা বাড়িয়েছি, দক্ষতা তৈরি করিনি।

এ কারণে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক খাতে বিপুল সস্তা অর্ডার পায়চোখ-ধাঁধানো সংখ্যা, কিন্তু তা স্বল্পমূল্যের, সীমিত লাভের। জনশক্তি রপ্তানিতেও আমরা অদক্ষ ও স্বল্পদক্ষ শ্রমিক পাঠাই। গড় রেমিট্যান্স প্রতি মাসে প্রতি কর্মীর জন্য মাত্র ২০৩ ডলার, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন। এটি লজ্জাজনক ব্যর্থতা।

তথ্যগত বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের জিডিপির অর্ধেকের বেশি আসে সার্ভিস খাত থেকে; শিল্পের অবদান প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এবং কৃষির অবদান প্রায় ১১-১২ শতাংশ। অর্থাৎ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি এখন শিল্প ও সেবা খাত। জিডিপির প্রায় ৮৩ শতাংশ শিল্প ও সেবা এই দুটি খাত থেকে এলেও ওই দুটি খাতের প্রতিটি উপখাতের মূল পরিচালন বিভাগগুলোর জন্য স্পষ্ট, ইন্ডাস্ট্রি-ডিফাইন্ড সেট স্কিল আছে?

সরকার গঠিত আমলাতান্ত্রিক কাঠামোতে পরিচালিত এনএসডিসি এই উপখাতগুলোর উন্নয়নে রত হলেও এখনো এই ইন্ডাস্ট্রি-স্পেসিফিক স্কিল আর্কিটেকচারের কার্যকর উত্তর দিতে পারেনি। এই উত্তরহীনতা বাংলাদেশের জন্য আদৌ সুসংবাদ নয়। কেননা ওষুধশিল্পের মার্কেটিং ও চামড়াশিল্পের মার্কেটিং একই ধরনের নয়। ব্যাংকের এইচআরম্যানেজারের কাজ আইটিসার্ভিস প্রতিষ্ঠানের এইচআরের কাজ মেলে না। কিন্তু আমাদের কারিকুলাম প্রায়ই একই ছাঁচে ফেলে দেয় : জেনারেল বিজনেস/ম্যানেজমেন্ট এবং প্রত্যাশা করে এক সার্টিফিকেট দিয়েই সব কাজ হবে।

মানবসম্পদ তখনই মূল্যবান, যখন দক্ষতায় রূপান্তরিত হয়, দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষাশিল্প সংযুক্তি এই বাস্তবতাই প্রমাণ করে। আর সেই বাস্তবতাকে মাথায় রেখেই ইন্ডাস্ট্রি-পেশাজীবী-একাডেমিয়া এবং সরকারের সমন্বয়ে ন্যাশনাল স্কিল আইডেন্টিফিকেশন কমিটি (এনএসআইসি) গঠন করতে হবে, যা আমলাকেন্দ্রিক হবে না, বরং উদ্যোক্তা-পেশাজীবী-একাডেমিয়া নির্ভর হবে এবং দায়বদ্ধ থাকবে সরকারপ্রধানের কাছে।

উদ্যোক্তা-পেশাজীবী-একাডেমিয়া সমন্বয়ে ন্যাশনাল স্কিল আইডেন্টিফিকেশন কমিটি (এনএসআইসি) তৈরি  করে পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে প্রথমে ১০টি উপখাতের মূল পরিচালন বিভাগগুলোর কম্পিটেন্সি ম্যাপ (গার্মেন্টস, ফার্মা, লেদার, ফুড, ব্যাংকিং, আইটি, হেলথ, এডুকেশন, কনস্ট্রাকশন, এনার্জি) তৈরি করা হবে। সেই কম্পিটেন্সি ম্যাপ অনুযায়ী একাডেমিয়া নিজের কারিকুলাম তৈরি করবে, যা মনিটর ও বাস্তবায়ন করবে ন্যাশনাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট ব্যুরো (এনএসডিবি), যা উদ্যোক্তা-পেশাজীবী সমন্বয়ে গঠিত ব্যুরো।

আগের ব্যর্থতার কথা মাথায় রেখে এনএসডিসিকে বাংলাদেশের স্বার্থেই শুধু সমন্বয়কের ভূমিকায় রাখতে হবে। এনএসডিসি শুধু নীতি সহায়তা দেবে, কিন্তু এনএসডিবির হাতে থাকবে বাস্তবায়নের ক্ষমতা, বাজেট ব্যয়ের স্বাধীনতা এবং জবাবদিহি সরকারপ্রধানের কাছে। এই ভারসাম্য না এলে আমাদের দক্ষতা উন্নয়ন চিরকাল অন্ধকারেই থেকে যাবে। বাস্তবায়নকারী হিসেবে এনএসডিবিকে আন্তর্জাতিক মানের কারিকুলাম ও সার্টিফিকেট সুনিশ্চিত করতে হবে, যা বিদেশে গিয়ে ছাত্রদের অথই জলে ফেলবে না। তাহলেই রেমিট্যান্স টেকসইভাবে বাড়বে। এ জন্য ত্রিস্তরীয় কর্মকৌশল জরুরি।

স্বল্পমেয়াদি (১-৩ বছর) : দ্রুত রিটার্ন ও প্রবাস আয় বৃদ্ধি। মোট বাজেট জিডিপির ১ শতাংশ। ভোকেশনাল ট্রেনিংয়ে ০.৭ শতাংশ১০০টি নতুন পলিটেকনিক, শর্ট কোর্সে ৫০-১০০ হাজার প্রবাসী-যোগ্য কর্মী। ইন্ডাস্ট্রি-লেড স্কিল ম্যাপিং পাইলট। ন্যাশনাল স্কিল আইডেন্টিফিকেশন কমিটি গঠন। প্রবাসী প্রস্তুতিতে ০.৩০ শতাংশ। পদ্মা ব্যারাজ, তিস্তা প্রকল্পের পাশাপাশি চীন সরকারের সঙ্গে মানবসম্পদ উন্নয়নে অংশীদারি শুরু করতে হবে।

চীন সরকারকে নিয়ে আমরা একটি নতুন যাত্রা শুরু করতে পারি। ১০টি নতুন প্রশিক্ষণকেন্দ্র, যেখানে কর্মীরা শিখবে অগ্রসরমাণ যন্ত্রপাতি ব্যবহার, ডিজিটাল দক্ষতা ও স্মার্ট শিল্পায়ন। সেখানে চীনাদের করপোরেট অ্যাপ্রেনটিসশিপ মডেল চালু হবে, হাতে-কলমে কাজ শিখবে, কাজে লাগাবে। আর চীনের তিন বছরের ডিজিটাল কর্মী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ৫০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী প্রশিক্ষণ পাবেতাদের সার্টিফিকেট হবে আন্তর্জাতিক, চাকরি হবে দেশে আর বিদেশে।

মধ্যমেয়াদি (৩-৭ বছর) : কাঠামোগত রূপান্তর। শিক্ষা ব্যয় জিডিপির ৩ শতাংশে উন্নীত। টেকনিক্যাল অংশ ১.১৫ শতাংশ। সরকার প্রথম দুই বছরের সিড ফান্ড দেবে; পরে ইন্ডাস্ট্রি ফিস + সিএসআর + পাবলিক গ্র্যান্টস দ্বারা টেকসই রাখবে। ৩০০ পলিটেকনিক, এক লাখ অ্যাপ্রেনটিসশিপ স্লট। আরঅ্যান্ডডি ম্যাচিং ফান্ড ০.১০ শতাংশ।

দীর্ঘমেয়াদি (৭-১৫ বছর) : উচ্চমূল্যের অর্থনীতি। শিক্ষা ব্যয় ৫ শতাংশ, আরঅ্যান্ডডি ১ শতাংশ। ইনোভেশন হাব, রিজিওনাল ইন্ডাস্ট্রি-এডুকেশন ক্লাস্টার। ফিন্যান্সিংয়ের উৎস সিএসআর, ডেভেলপমেন্ট বন্ড ও প্রবাসী বন্ড। কিন্তু সবকিছুর মূলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা। স্পষ্ট তিন বছরের কর্মপরিকল্পনা, বার্ষিক মনিটরিং ও ক্ল-ব্যাক ব্যবস্থা ছাড়া কিছুই হবে না। বর্তমান শিক্ষিত বেকারত্বের সংকট রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও আমলাতন্ত্রের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনাহীনতা ও অদূরদর্শিতার ফল। গ্র্যাজুয়েট বেকারত্ব ১৩ শতাংশের ওপরেএটি অত্যন্ত পীড়াদায়ক বাস্তবতা।

এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে  রাজনৈতিক নেতৃত্বকেসফলতা কি পরীক্ষা পাসের শতাংশ কিংবা সেতু-মেট্রো রেলের সংখ্যা দিয়ে মাপা হবে, নাকি মানুষের দক্ষতাকে প্রধান পাথেয় করে টেকসই উন্নয়নের পথে হাঁটবে বাংলাদেশ? মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্রের আগামী উন্নয়ন প্রতিযোগিতা কিন্তু অবকাঠামোতে নয়, বরং সক্ষম জনগোষ্ঠী দ্বারাই নির্ধারিত হবে।

 লেখক : প্রাবন্ধিক, রাষ্ট্রচিন্তক

চীনের আধুনিকায়ন ও গ্লোবাল সাউথের উন্নয়নে রোডম্যাপ

মোহাম্মদ ছাইয়েদুল ইসলাম ও মোহাম্মদ শাকিল ভূইয়া

চীনের আধুনিকায়ন ও গ্লোবাল সাউথের উন্নয়নে রোডম্যাপ

চীনা জাতি দীর্ঘকাল ধরে বিশ্বের সবচেয়ে সমৃদ্ধ ও প্রভাবশালী সভ্যতাগুলোর মধ্যে অন্যতম এবং চীনা সভ্যতা অত্যন্ত গৌরবময়। মানুষের সামগ্রিক বিকাশ চীনা শৈলীর আধুনিকায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চীনা শৈলীর আধুনিকায়নের তত্ত্ব ও অনুশীলন মানব উন্নয়নের ধারণাকে আরো বিস্তৃত করেছে এবং ক্রমাগত তা চীনা শৈলীর আধুনিকায়নের সামগ্রিক প্রক্রিয়ায় বাস্তবে রূপ দিয়ে চলেছে। এটি একটি বহুমাত্রিক সামাজিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া। মানুষ যখন বস্তুজগতের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে, তখন একই সঙ্গে আধ্যাত্মিক জগৎ ও সামগ্রিক বিকাশের প্রতিও তাদের আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে। এই ধারণাটিকে আরো স্পষ্ট করে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ২০তম জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে চীনা আধুনিকায়ন হলো এমন একটি আধুনিকায়ন, যা বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক সভ্যতার রূপকে একীভূত করে। এটি এমন একটি আধুনিকায়ন, যা সামগ্রিক বস্তুগত সমৃদ্ধি ও ব্যক্তির পরিপূর্ণ বিকাশকে একসূত্রে গেঁথে তোলে।

চীনা ধাঁচের আধুনিকায়ন হলো বিশাল জনসংখ্যার একটি পরিপূর্ণ আধুনিকায়ন, যেখানে সব মানুষ সচ্ছল, বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক সভ্যতা একই গতিতে এগিয়ে চলে, মানুষ ও প্রকৃতি সহাবস্থান করে এবং শান্তিপূর্ণ উন্নয়নের পথ অনুসরণ করা হয়।

আধুনিকায়নের পথে চীনের যাত্রা কার্যকর নেতৃত্ব, কৌশলগত পরিকল্পনা এবং অগ্রগতির প্রতি অবিচল প্রতিশ্রুতির প্রভাব স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। বিস্তৃত ইতিহাস, বিশাল ভূখণ্ড এবং বিপুল জনসংখ্যার দেশ চীন গত কয়েক দশকে প্রচলিত উন্নয়নের ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে। ঐতিহাসিক জ্ঞানের সঙ্গে আধুনিক উদ্ভাবনকে একীভূত করে চীন এমন একটি অনন্য পথ তৈরি করেছে, যা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এই মডেল কোটি কোটি মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করেছে এবং চীনকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শক্তি ও টেকসই উন্নয়নের আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

শিল্প বিপ্লব ও ঔপনিবেশিক সম্প্রসারণে চিহ্নিত পশ্চিমা উন্নয়নের পথের বিপরীতে চীনের পদ্ধতি তার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, সমাজতান্ত্রিক নীতি ও বৈশ্বিকায়নের সঙ্গে বাস্তবসম্মত সম্পৃক্ততার ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। এই সামগ্রিক ও বহুমাত্রিক পদ্ধতি অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও পরিবেশগত দিককে অন্তর্ভুক্ত করে, যা বৈশ্বিক পরিসরে একে স্বতন্ত্র করে তোলে।

এই বিশিষ্ট পথের একটি উল্লেখযোগ্য ফলাফল হলো সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ নীতি, যার মাধ্যমে চীন পরিকল্পিত অর্থনীতি থেকে সমাজতান্ত্রিক বাজার অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হয়েছে। এই পরিবর্তন শক্তিশালী উৎপাদন খাতের বিকাশ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের প্রসার এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সহযোগিতায় সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সম্ভব করেছে। এর ফলে বর্তমানে চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে এবং বৈশ্বিক শিল্প শৃঙ্খলে একটি অপরিহার্য অবস্থান অর্জন করেছে। বহির্মুখী কৌশলের আরো প্রমাণ হিসেবে বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ এর রুট বরাবর অবস্থিত দেশগুলোর মধ্যে সমষ্টিগত উন্নয়ন ও পারস্পরিক সমৃদ্ধি অর্জনের সুযোগ তৈরি করছে।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি চীন সামাজিক উন্নয়নের অংশ হিসেবে জনগণের জীবনমান উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেয়। ব্যাপক দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি কোটি কোটি মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করেছে, যা মানব ইতিহাসে দারিদ্র্য হ্রাসের ক্ষেত্রে একটি অসাধারণ মাইলফলক। একই সঙ্গে জনগণের জীবনমান ও সার্বিক কল্যাণ বৃদ্ধির জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সংশ্লিষ্ট খাতে বিনিয়োগ ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে পরিচালিত, যা চীনা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার শক্তিমত্তার ওপর জোর দেয়। এই ব্যবস্থা দক্ষতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নে সক্ষম, গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করতে পারে এবং উল্লেখযোগ্য অবকাঠামো উন্নয়ন ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলায় শক্তিশালী পদক্ষেপ নিতে পারে।

সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে সহায়তা করার পাশাপাশি চীন তার উত্কৃষ্ট ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির উত্তরাধিকার ও প্রসারের ওপর গুরুত্ব দেয় এবং একই সঙ্গে বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক অর্জনগুলো আত্মস্থ করে সাংস্কৃতিক উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করে। সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস জোরদার করা, জাতির সাংস্কৃতিক নরম শক্তি বৃদ্ধি করা এবং আধুনিকায়নের জন্য শক্তিশালী আধ্যাত্মিক প্রেরণা জোগানোএগুলো চীনের সাংস্কৃতিক নীতির মূল লক্ষ্য।

পরিবেশ সংরক্ষণের প্রশ্নে চীন স্বচ্ছ পানি ও সবুজ পাহাড় অমূল্য সম্পদ’—এই ধারণাটি সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপন করেছে। দেশটি সক্রিয়ভাবে সবুজ উন্নয়নের প্রচার করছে, পরিবেশগত শাসন ও সুরক্ষায় প্রচেষ্টা জোরদার করছে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যে একটি ইতিবাচক মিথস্ক্রিয়া স্থাপনের চেষ্টা করছে।

মানুষের সর্বাঙ্গীণ বিকাশ অর্জনের জন্য একটি সুদৃঢ় বস্তুগত ভিত্তি অপরিহার্য। শক্ত বস্তুগত ভিত্তির নিশ্চয়তা ছাড়া সর্বাঙ্গীণ মানব উন্নয়ন নিছক একটি অর্থহীন স্লোগান মাত্র। মানুষের সামগ্রিক বিকাশের জন্য শুধু বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক সভ্যতার যৌথ উন্নয়নই নয়, এই দুটির সমন্বিত বিকাশও প্রয়োজন। শুধু এই দুটি সত্তার যৌথ প্রচার ও সমন্বিত বিকাশের মাধ্যমেই মানুষের সামগ্রিক বিকাশের পরিস্থিতি তৈরি করা সম্ভব।

চীনের পদ্ধতি আধুনিকায়নের একটি স্বতন্ত্র পথ প্রদর্শন করে এবং গ্লোবাল সাউথের যেসব দেশ নিজস্ব উন্নয়নের মডেল খুঁজছে, তাদের জন্য একটি প্রাসঙ্গিক রেফারেন্স হিসেবে কাজ করে।

লেখক : মোহাম্মদ ছাইয়েদুল ইসলাম, পিএইচডি, চীনের ফুচিয়ান প্রদেশের সানমিং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ওভারসিজ এডুকেশনের (স্কুল অব ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজেস) সিনিয়র লেকচারার ও গবেষক এবং বাংলাদেশের ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির বেল্ট অ্যান্ড রোড রিসার্চ সেন্টারের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো

মোহাম্মদ শাকিল ভূইয়া, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষক এবং চীনের শানসি বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক

শিশুদের যৌন নির্যাতন সমাজের এক নীরব সংকট

ড. মো. রুহুল আমিন সরকার

শিশুদের যৌন নির্যাতন সমাজের এক নীরব সংকট

শিশু মানবসমাজের সবচেয়ে কোমল, নিষ্পাপ ও নিরাপত্তাহীন সদস্য। একটি শিশুর শৈশব নিরাপদ, আনন্দময় ও মর্যাদাপূর্ণ হওয়ার কথা। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, বর্তমান সময়ে শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রায় প্রতিদিনই সংবাদমাধ্যমে শিশু ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, বলাৎকার, নির্যাতন কিংবা হত্যার খবর প্রকাশিত হচ্ছে। কিছু ঘটনা জাতীয়ভাবে আলোচিত হয়, কিন্তু অসংখ্য ঘটনা নীরবে চাপা পড়ে যায়। আড়ালে থাকা সেসব ঘটনা হয়তো আরো বেশি ভয়াবহ।

সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত রামিসা হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন শিশু নির্যাতনের ঘটনা আমাদের বিবেককে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। একটি শিশুর ওপর সংঘটিত যৌন সহিংসতা শুধু একটি অপরাধ নয়, এটি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। কারণ একটি শিশু আত্মরক্ষার সক্ষমতা রাখে না, সে তার ওপর সংঘটিত অপরাধের প্রকৃতি বুঝতে পারে না এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সে নির্যাতনকারীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার শক্তিও রাখে না। ফলে শিশুর ওপর যৌন নির্যাতন হলো ক্ষমতার নির্মম অপব্যবহার, যা সভ্য সমাজে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, শিশু নির্যাতনকারী সব সময় সমাজের প্রান্তিক বা অপরিচিত মানুষ নয়। অনেক ক্ষেত্রে তারা শিক্ষক, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী কিংবা সমাজে সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবেই পরিচিত। বাইরে থেকে তাদের স্বাভাবিক, ভদ্র এবং ধার্মিক মনে হলেও আড়ালে তারা এমন সব কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকে, যা কল্পনা করাও কঠিন। বহু মামলায় দেখা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে শিশুদের ওপর নির্যাতন চলেছে, কিন্তু ভয়, লজ্জায় এবং সামাজিক চাপে বিষয়টি প্রকাশ পায়নি।

চাকরিজীবনের অভিজ্ঞতায় এমন বহু মামলার তদন্ত হয়েছে, যেখানে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক বা তত্ত্বাবধায়ক কোমলমতি শিশুদের ওপর অমানবিক যৌন নির্যাতন চালিয়েছেন। কিছু ক্ষেত্রে নির্যাতনের ফলে শিশুদের শরীরে গুরুতর আঘাত সৃষ্টি হয়েছে। তারা শারীরিক যন্ত্রণা নিয়ে দিনের পর দিন নীরবে কষ্ট সহ্য করেছে। ভয়, লজ্জা ও হুমকির কারণে তারা কাউকে কিছু বলতে পারেনি। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে বা অভিভাবকরা বিষয়টি টের পেলে সত্য প্রকাশিত হয়েছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—কেন একজন মানুষ একটি অসহায় শিশুর ওপর এমন বর্বর নির্যাতন চালায়? আধুনিক মনোবিজ্ঞান ও অপরাধবিজ্ঞান এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বহু গবেষণা করেছে। গবেষণায় দেখা যায়, শিশু যৌন নির্যাতনের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে। কিছু মানুষের মধ্যে শিশুদের প্রতি বিকৃত যৌন আকর্ষণ তৈরি হতে পারে। আবার অনেক ক্ষেত্রে এটি শুধু যৌন আকর্ষণের বিষয় নয়, বরং ক্ষমতা প্রদর্শন, আধিপত্য প্রতিষ্ঠা, সহিংসতা এবং আত্মসংযমের অভাবেরও বহিঃপ্রকাশ। কিছু অপরাধী শিশুর অসহায়ত্বকে ব্যবহার করে নিজের বিকৃত মানসিক তৃপ্তি অর্জন করে।

তবে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সব ধরনের শিশু যৌন নির্যাতনকে শুধু মানসিক রোগ বলে ব্যাখ্যা করা সঠিক নয়। কারণ বেশির ভাগ অপরাধী জানে যে সে অপরাধ করছে। সে জানে তার কাজ অনৈতিক, অবৈধ ও শাস্তিযোগ্য। তার পরও সে অপরাধ করে। অর্থাৎ এখানে শুধু মানসিক সমস্যা নয়; নৈতিক অবক্ষয়, অপরাধপ্রবণতা, জবাবদিহির অভাব এবং সামাজিক নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতাও কাজ করে।

বিশ্বজুড়ে পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, যৌন নির্যাতনের শিকার শিশুদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ক্ষতি তৈরি হয়। অনেক শিশু ভয়, উদ্বেগ, দুঃস্বপ্ন, বিষণ্নতা, আত্মবিশ্বাসহীনতা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার শিকার হয়। তারা মানুষকে বিশ্বাস করতে পারে না। অনেকের মধ্যে আত্মঘাতী চিন্তাও দেখা দেয়। কেউ কেউ প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও সেই মানসিক আঘাত থেকে পুরোপুরি বের হতে পারে না।

বিশেষ করে ছেলেশিশুদের ওপর সংঘটিত যৌন নির্যাতন নিয়ে সমাজে এক ধরনের নীরবতা বিদ্যমান। অনেক পরিবার বিষয়টি প্রকাশ করতে চায় না। সামাজিক লজ্জা ও ভুল ধারণার কারণে ছেলেদের নির্যাতনের ঘটনা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আড়ালে থেকে যায়। ফলে ভুক্তভোগী শিশু প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, আইনি সহায়তা ও মানসিক পুনর্বাসন থেকে বঞ্চিত হয়।

আমাদের সমাজে একটি বড় সমস্যা হলো শিশুদের কথা গুরুত্ব দিয়ে না শোনা। অনেক সময় শিশু কোনো অভিযোগ করলে তাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। তাকে বলা হয়, ‘এসব কথা বোলো না’, ‘ভুল দেখেছ’, ‘ভুল বুঝেছ’ অথবাচুপ থাকো’। এই মনোভাব অপরাধীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করে। শিশুদের বিশ্বাস করা, তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া শিশু সুরক্ষার প্রথম ধাপ।

বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর যুগে শিশুদের জন্য নতুন ধরনের ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। ইন্টারনেট, স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে অনেক অপরাধী শিশুদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে। ধীরে ধীরে তারা শিশুর বিশ্বাস অর্জন করে এবং পরে শোষণের ফাঁদে ফেলে। তাই শিশু সুরক্ষার আলোচনায় ডিজিটাল নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

শিশু যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে পরিবারকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। শিশু যেন নির্ভয়ে তার অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলতে পারে, সেই পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। শিশুকে ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে তার শরীর তার নিজের। কোন স্পর্শ নিরাপদ এবং কোন স্পর্শ অনিরাপদ, তা বয়স উপযোগী ভাষায় বোঝাতে হবে। কোনো ব্যক্তি তাকে অস্বস্তিকরভাবে স্পর্শ করলে সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বস্ত বড়দের জানাতে হবে—এই শিক্ষা দিতে হবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও শিশু সুরক্ষা বান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে সতর্কতা, অভিযোগ গ্রহণের নিরাপদ ব্যবস্থা, সিসিটিভি পর্যবেক্ষণ, নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং শিশু সুরক্ষা নীতিমালা বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি। একইভাবে আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, এতিমখানা, হোস্টেল এবং ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর দায়িত্বও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশু নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত তদন্ত, বৈজ্ঞানিক প্রমাণ সংগ্রহ, ভুক্তভোগী শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং দ্রুত বিচার অপরিহার্য। বিচার বিলম্বিত হলে ভুক্তভোগী পরিবার হতাশ হয় এবং সমাজে ভুল বার্তা যায়।

একটি সভ্য সমাজের পরিচয় নির্ধারিত হয় সেই সমাজ তার শিশুদের কতটা নিরাপত্তা দিতে পারে তার ওপর। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়; এটি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। শিশুদের প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। অপরাধী যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি শিশুর কান্না শুধু একটি পরিবারের কান্না নয়, সেটি পুরো সমাজের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। একটি শিশু যখন নির্যাতনের শিকার হয়, তখন ভবিষ্যতের একজন নাগরিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একটি সম্ভাবনা ধ্বংস হয়ে যায়। একটি স্বপ্ন ভেঙে যায়। তাই শিশু সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

আজ সময় এসেছে শিশুদের নিরাপত্তার প্রশ্নে শূন্য সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করার। কোনো অজুহাত, কোনো সামাজিক মর্যাদা, কোনো ধর্মীয় পরিচয় কিংবা কোনো রাজনৈতিক প্রভাব যেন অপরাধীর রক্ষাকবচ না হতে পারে। শিশুদের নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করা মানবিক দায়িত্ব, নৈতিক কর্তব্য এবং রাষ্ট্রের সাংবিধানিক অঙ্গীকার।

আমরা এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে কোনো শিশু ভয়ে কুঁকড়ে থাকবে না; যেখানে কোনো শিশু নির্যাতনের শিকার হয়ে নীরবে কাঁদবে না; যেখানে প্রতিটি শিশু নিরাপদে বেড়ে উঠবে, শিক্ষা গ্রহণ করবে, স্বপ্ন দেখবে এবং মানবিক মর্যাদার সঙ্গে জীবন গড়ে তুলবে। কারণ শিশুদের রক্ষা করা মানেই ভবিষ্যেক রক্ষা করা। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানেই একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও সভ্য সমাজ নির্মাণ করা।

 

লেখক : অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার, সিআইডি, ঢাকা

মোটরসাইকেল সংস্কৃতি : হারিয়ে যাওয়া প্রাণ

আবু সাঈদ মো. নাজমুল হায়দার

মোটরসাইকেল সংস্কৃতি : হারিয়ে যাওয়া প্রাণ

‘ছেলের আবদার মিটাইতেই বাইকটা কিনে দিছিলাম, সেই আবদারই আজ আমার একমাত্র ছেলেকে চিরতরে কেড়ে নিল।’—একজন অসহায় বাবার এই আর্তনাদ বাংলাদেশের বেশির ভাগ পত্রিকায় গত ৩০ মে ২০২৬ প্রকাশিত হওয়া কলেজছাত্র আফতাব শাহরিয়ার মাহিরের মৃত্যুর পর উচ্চারিত হয়েছিল। ঈশ্বরগঞ্জ সরকারি কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী মাহির মাত্র চার মাস আগে তার বাবার কাছ থেকে একটি মোটরসাইকেল পেয়েছিল। বন্ধুদের মতো তারও একটি মোটরসাইকেল চাই। বাবা আপত্তি করেছিলেন, বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সন্তানের জেদের কাছে শেষ পর্যন্ত হার মানতে হয়েছিল। চার মাস পর সেই মোটরসাইকেলই হয়ে উঠেছিল তার জীবনের শেষযাত্রার বাহন।

মাহিরের মৃত্যুসহ এমন মৃত্যু নিছক একটি সড়ক দুর্ঘটনার সংবাদ নয়, এটি সমকালীন বাংলাদেশের এক গভীর সামাজিক সংকটের প্রতীক। এটি এমন এক বাস্তবতার প্রতিফলন, যেখানে তরুণদের কাছে মোটরসাইকেল শুধু পরিবহনের মাধ্যম নয়, বরং পরিচয়, স্বাধীনতা, সামাজিক মর্যাদা এবং অনেক ক্ষেত্রে আত্মপ্রদর্শনের একটি উপকরণে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশে মোটরসাইকেলের সংখ্যা গত এক দশকে অভূতপূর্ব হারে বেড়েছে। সহজ কিস্তি সুবিধা, তুলনামূলক কম দাম এবং দ্রুত চলাচলের সুবিধার কারণে মোটরসাইকেল এখন দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তিগত যানবাহনগুলোর একটি। কিন্তু এই জনপ্রিয়তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে দুর্ঘটনা, অক্ষমতা এবং মৃত্যুর সংখ্যা। সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের একটি বড় অংশ মোটরসাইকেল আরোহী। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে এক বছরে ছয় হাজার ৯২৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় সাত হাজার ২৯৪ জন নিহত এবং ১২ হাজার ১৯ জন আহত হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, নিহতদের মধ্যে দুই হাজার ৬০৯ জনই মোটরসাইকেল আরোহী, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৩৬ শতাংশ। আরো তাৎপর্যপূর্ণ হলো, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার ছিল প্রায় ৪০ শতাংশ, যা অন্য যেকোনো যানবাহনের তুলনায় অনেক বেশি। বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করে আসছেন যে মোটরসাইকেলচালকদের ঝুঁকি অন্যান্য যানবাহনের যাত্রীদের তুলনায় অনেক বেশি।

এই বাস্তবতা আমি ব্যক্তিগতভাবেও প্রতিনিয়ত প্রত্যক্ষ করি। আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকায় বসবাস করি। হরহামেশাই সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এই সড়কে মোটরসাইকেল নিয়ে তরুণদের বেপরোয়া প্রতিযোগিতা চলে। কখনো দুটি, কখনো তিন বা চারটি মোটরসাইকেল পাশাপাশি ছুটতে দেখা যায়। অনেক সময় বিকট শব্দ শুনেই বোঝা যায় যে তারা গতি বাড়িয়ে একে অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এই দৃশ্য শুধু বিরক্তিকর নয়, এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

প্রশ্ন হলো, কেন তরুণদের মধ্যে এই বেপরোয়া মোটরসাইকেল সংস্কৃতি গড়ে উঠছে? এর একটি বড় কারণ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মোটরসাইকেল ঘিরে অসংখ্য ভিডিও, রিলস এবং কনটেন্ট তৈরি হচ্ছে, যেখানে গতি ও ঝুঁকিকে অনেক সময় বীরত্ব হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। বাস্তব জীবনের ঝুঁকি সেখানে অনুপস্থিত থাকে। তরুণরা দেখতে পায় প্রশংসা, জনপ্রিয়তা ও উত্তেজনা, কিন্তু দেখতে পায় না হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, অপারেশন থিয়েটার কিংবা শোকাহত পরিবারের কান্না। দ্বিতীয়ত, অনেক ক্ষেত্রে মোটরসাইকেলকে পুরুষত্ব, আধুনিকতা কিংবা সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। বন্ধুবান্ধবের মধ্যে কারো মোটরসাইকেল থাকলে অন্যদের মধ্যেও সেটি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। মাহিরের ঘটনাও সেই সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন। তৃতীয়ত, আইন প্রয়োগ ও নিরাপত্তা সংস্কৃতির ঘাটতি রয়েছে। লাইসেন্স ছাড়া চালানো, হেলমেট ব্যবহার না করা, অতিরিক্ত গতি কিংবা ট্রাফিক আইন অমান্য করা—এসব আচরণ অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সড়ক দুর্ঘটনা শুধু একজন মানুষের মৃত্যু ঘটায় না; এটি একটি পরিবার, একটি ভবিষ্যৎ এবং অনেক সময় একটি সমাজের সম্ভাবনাকেও ধ্বংস করে দেয়।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রথমত, মোটরসাইকেল চালনার ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সিং ব্যবস্থাকে আরো কার্যকর করতে হবে। দ্বিতীয়ত, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সড়ক নিরাপত্তা শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। তরুণদের বুঝতে হবে যে দক্ষ চালক হওয়া মানে দ্রুত চালানো নয়, বরং নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানো। তৃতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দায়িত্বশীল বার্তা প্রচার করতে হবে। বেপরোয়া গতি ও ঝুঁকিপূর্ণ স্টান্টকে আকর্ষণীয় হিসেবে উপস্থাপনের পরিবর্তে নিরাপদ চালনাকে সামাজিক মূল্যবোধ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। চতুর্থত, দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলোতে বিশেষ নজরদারি প্রয়োজন।

সবচেয়ে বড় কথা, অভিভাবকদেরও কঠিন কিন্তু দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সন্তানের প্রতি ভালোবাসা মানে সব আবদার পূরণ করা নয়। অনেক সময় ‘না’ বলতে পারাও ভালোবাসারই অংশ। মোটরসাইকেল কিনে দেওয়ার আগে সন্তানের প্রশিক্ষণ, দায়িত্ববোধ এবং নিরাপদ চালনার মানসিকতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।

কলেজ শিক্ষার্থী মাহির আর ফিরে আসবে না, কিন্তু তার মৃত্যুর ঘটনা আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা হয়ে থাকতে পারে। আমরা যদি এই বার্তাটি উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হই, তাহলে হয়তো আগামীকাল আরেকজন মাহির, আরেকটি পরিবার এবং আরেকটি স্বপ্ন একইভাবে হারিয়ে যাবে। গতি মানুষের জীবনকে সহজ করে, কিন্তু বেপরোয়া গতি জীবন কেড়ে নেয়। তাই মোটরসাইকেলের হ্যান্ডেলে হাত রাখার আগে আমাদের মনে রাখতে হবে, বেপরোয়া বাইক চালিয়ে কয়েক মিনিট আগে গন্তব্যে পৌঁছানোর চেয়ে নিরাপদে ধীরস্থিরভাবে জীবিত পৌঁছানো অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, লোকপ্রশাসন বিভাগ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়