• ই-পেপার

বাজেট বাস্তবায়ন এবং বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ

  • নিরঞ্জন রায়

রেলযোগাযোগ ও উন্নত যাত্রীসেবায় বাড়বে অভ্যন্তরীণ পর্যটন

মুস্তফা নঈম

রেলযোগাযোগ ও উন্নত যাত্রীসেবায় বাড়বে অভ্যন্তরীণ পর্যটন

আমরা রাস্তা যত বড় করব, তত গাড়ি নামবে এবং ট্রাফিক বাড়বে। তাই রেলকে আমরা উন্নত করতে চাই। রেলযোগাযোগ উন্নত হলে যাতায়াত খরচ কমবে, ব্যাবসায়িক খরচও কমবে। এ জন্য সরকার সারা দেশে রেলযোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। গত ২ মে সিলেটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এমন উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্য রেলপ্রিয় সাধারণ মানুষকে আশাবাদী করে তুলেছে। কারণ সড়কে প্রতিদিন বাড়ছে যানবাহন, বাড়ছে দুর্ঘটনাও। এতে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানি হচ্ছে। সে তুলনায় রেল বহুগুণে নিরাপদ, সাশ্রয়ী এবং পরিবেশবান্ধব। রেলযোগাযোগ উন্নত করা খুবই জরুরি। একই সঙ্গে রেলের যাত্রীসেবাও উন্নত করা দরকার। রেলসেবা উন্নত হলে ইনল্যান্ড ট্যুরিজম বা দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটন সম্প্রসারিত হবে। অন্যান্য পরিবহনের মধ্যে রেলপথ নিরাপদ ও সাশ্রয়ী। দেশের সাধারণ মানুষ দূরযাত্রায় সর্বপ্রথম ট্রেনের কথা চিন্তা করে। বিশেষ করে পরিবার-পরিজন নিয়ে দূরযাত্রায় ট্রেনকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। বর্তমানে উল্লেখযোগ্য প্রায় সব জেলা থেকে আন্ত নগর ট্রেন সার্ভিস রয়েছে ঢাকার সঙ্গে। এসব আন্ত নগর ট্রেনের টিকিট পেতে হিমশিম খেতে হয়। এতে সহজেই বোঝা যায় আন্ত নগর ট্রেনের প্রতি যাত্রীসাধারণের আগ্রহ। কয়েক বছর আগে রেলযোগাযোগে সংযুক্ত হয়েছে পর্যটন নগরী কক্সবাজার। ভ্রমণপিয়াসি নাগরিক সুদূর ঢাকা থেকে সাগর দর্শনে কক্সবাজার যাওয়ার জন্য ট্রেনযাত্রাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে আসছে। রেলওয়ের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে গড়ে প্রতিদিন প্রায় এক লাখ ৫০ হাজার যাত্রী নিয়মিত যাতায়াত করে। এর বার্ষিক হিসাব করলে সংখ্যাটি দাঁড়ায় প্রায় পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ কোটি যাত্রী।

রেল পরিবহন এখন সারা দেশে বিস্তৃত। বাংলাদেশ রেলওয়ে দুটি ডিভিশনে বিভক্তরেলওয়ে পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চল। বাংলাদেশ রেলযোগাযোগ ব্যবস্থার দৈর্ঘ্য তিন হাজার ৬০০ কিলোমিটার। এর মধ্যে মিটার গেজ দুই হাজার ২৫ কিলোমিটার, ব্রড গেজ এক হাজার ৫৭৫ কিলোমিটার। এই তিন হাজার ৬০০ কিলোমিটারের মধ্যে আবার ডুয়াল গেজের পরিমাণ হচ্ছে এক হাজার ৬০০ কিলোমিটার। সারা দেশে রেলস্টেশনের সংখ্যা হচ্ছে ৪৯৮। গড়ে প্রতিবছর প্রায় পাঁচ-ছয় কোটি লোক ট্রেনে যাতায়াত করে। সারা দেশে এর মালিকানায় প্রায় ৬০ হাজার একর জমি আছে। রেলযোগাযোগ উন্নত করার পাশাপাশি  যাত্রীসেবাও উন্নত করা যেমন দরকার, ঠিক তেমনি রেলওয়ের যে বিপুল পরিমাণ সম্পদ অবৈধ দখলে চলে গেছে, তা-ও উদ্ধার করা জরুরি।

বাংলাদেশে এখন মূলত দুই ধরনের ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়। ইএমডি লোকোমোটিভপুরো নাম ইলেকট্রোমোটিভ ডিজেল। এই ধরনের ডিজেল ইঞ্জিন টু স্ট্রোকের হয়। দি আমেরিকান লোকোমোটিভ কম্পানির তৈরি আলকো লোকোমোটিভস ধরনের ইঞ্জিন ফোর স্ট্রোক। এই দুটি ইঞ্জিন মূলত মার্কিন কম্পানির। উন্নত দেশগুলোতে ডিজেল ইঞ্জিন অনেকটা বাতিলের খাতায় থাকলেও বাংলাদেশে এখনো বেশ চলছে। ব্যয়বহুল ডিজেল ইঞ্জিনের পরিবর্তে ইলেকট্রিক ইঞ্জিনের বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কি না, এই মুহূর্তে জানা নেই।

ডিজেল ইঞ্জিন ব্যয়বহুল বললাম এই কারণে যে টু স্ট্রোকের ইএমডি লোকোমোটিভের ক্ষমতা চার হাজার ৫০০ জিএইচপি (গ্রস হর্সপাওয়ার)। এই ইঞ্জিন দাঁড়ানো (রেলওয়ের ভাষায় নিষ্ক্রিয়) অবস্থায় প্রতি ঘণ্টায় ১১ লিটার ডিজেল পোড়ায়। আর এইট নচ-এর ডিজেল লাগে প্রতি মিনিটে ১০ লিটার। নচ হলো ট্রেনের গতি পরিমাপক। এইট নচ হলো ট্রেনের জন্য সর্বোচ্চ গতি। বাংলাদেশে এই ইএমডি লোকোমোটিভ ইঞ্জিনটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। এই ইঞ্জিনের গতি ও ভর যত বেশি, জ্বালানির ব্যবহার তত বেশি হবে। তবে ট্রেনের বগিসংখ্যার ওপর নির্ভর করে ট্রেনের গতি।

একইভাবে দি আমেরিকান লোকোমোটিভ কম্পানির তৈরি আলকো লোকোমোটিভস ধরনের ইঞ্জিন ফোর স্ট্রোক। আর এর ক্ষমতা তিন হাজার ৩০০ জিএইচপি। এই ধরনের ইঞ্জিন কোনো স্থানে চালু অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকলে প্রতি ঘণ্টায় ২২ লিটার ডিজেল পোড়ায়। আর চললে সর্বোচ্চ এইট নচ গতিতে প্রতি মিনিটে ৯ লিটার ডিজেল পোড়ায়। বাংলাদেশে এই ইঞ্জিনগুলো প্রায় অনেক জায়গায় চলে বলে জানান রেল কর্মকর্তারা।

চট্টগ্রাম থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে (যেমনঢাকা বা কমলাপুর আইসিডি) রেলপথে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি পণ্যবাহী ওয়াগন বা কনটেইনারের ওজনের ওপর ভিত্তি করে হিসাব করা হয়। সাধারণত একটি ট্রেনে ৩০ থেকে ৪০টি ওয়াগন বা বগি যুক্ত থাকে। ওজনসীমা (অ্যাক্সেল লোড) বাংলাদেশ রেলওয়ের ব্রড গেজ ও মিটার গেজ লাইনে অ্যাক্সেল লোড বা প্রতিটি বগির সর্বোচ্চ অনুমোদিত ওজনসীমা সাধারণত ২২.৫০ টন।

চট্টগ্রাম ও ঢাকার মধ্যে চলাচলকারী প্রতিটি আন্ত নগর ট্রেনের যাত্রী ধারণক্ষমতা বা আসনসংখ্যা গড়ে ৭০০ থেকে ৯০০ জনের মধ্যে হয়ে থাকে। ট্রেনের বগি (কোচ) বা লোড সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে এই সংখ্যাটি নির্ধারিত হয়। চট্টগ্রাম-ঢাকা চলাচলকারী প্রধান আন্ত নগর ট্রেনগুলোর সাধারণ আসনসংখ্যা হচ্ছে ৮৯০। এর মধ্যে বিরতিহীন সুবর্ণ এক্সপ্রেস ট্রেনটির আসনসংখ্যা ৮৯০ হলেও সোনার বাংলা এক্সপ্রেস ট্রেনটির আসনসংখ্যা ৭৪৩। তবে যাত্রী চাহিদা বৃদ্ধি পেলে (যেমনঈদের সময়) কোচ বাড়িয়ে ধারণক্ষমতা আরো বাড়ানো হয়। তূর্ণা এক্সপ্রেস, মহানগর প্রভাতি ও গোধূলি এবং মহানগর এক্সপ্রেসসহ ট্রেনগুলোর স্বাভাবিক আসনসংখ্যাও ৭০০ থেকে ৮০০-র মধ্যে হয়ে থাকে।

ঢাকা থেকে পঞ্চগড় রুটে চলাচলকারী প্রধান আন্ত নগর ট্রেন পঞ্চগড় এক্সপ্রেসের মোট আসন প্রায় ৯০০-র মতো, যা একবারের যাত্রায় প্রায় ৮০০ থেকে এক হাজার জন যাত্রী পরিবহন করতে পারে। ট্রেনবিন্যাস : এতে ১২টি আধুনিক কোচ রয়েছে, যার মধ্যে এসি চেয়ার, শোভন চেয়ার, কেবিন এবং খাবার ও নামাজের কোচ অন্তর্ভুক্ত। এই রুটের অন্য ট্রেন দ্রুতযান এক্সপ্রেসও প্রায় একইসংখ্যক যাত্রী বহন করে। এই পরিমাণ যাত্রী পরিবহনে কতসংখ্যক বাস প্রয়োজন, তা সহজেই অনুমান করা যায়। একইভাবে পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকা-খুলনা রুটে চলাচলকারী আন্ত নগর ট্রেনগুলো জাহানাবাদ এক্সপ্রেস, সুন্দরবন এক্সপ্রেস, রূপসী বাংলা এক্সপ্রেস ও নকশিকাঁথা এক্সপ্রেসের মতো ট্রেনে আসনসংখ্যা প্রায় ৮৬০ থেকে ৯০৮ পর্যন্ত হয়ে থাকে। এই রুটে অন্যান্য ট্রেন : জাহানাবাদ এক্সপ্রেস ও সুন্দরবন এক্সপ্রেস। এই ধরনের একেকটি ট্রেনের যাত্রী পরিবহন করতে কমপক্ষে ৩৫ থেকে ৪০টি বাসের প্রয়োজন হবে। রেলপথ যত বাড়বে, চলাচলের জন্য ট্রেন সার্ভিস যত সম্প্রসারিত হবে, দেশে সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাস হওয়ার সম্ভাবনা ততই বাড়বে। রক্ষা পাবে সাধারণ নাগরিকের জীবন ও দেশের সহায়-সম্পদ।

লেখক : সাংবাদিক

প্রযুক্তিনির্ভর আগামীর কৃষিতে ‘ওয়ানস্টপ সার্ভিস’ সময়ের দাবি

মির্জা কিরণ

প্রযুক্তিনির্ভর আগামীর কৃষিতে ‘ওয়ানস্টপ সার্ভিস’ সময়ের দাবি

বাংলাদেশের অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ কর্মসংস্থানের মূলভিত্তি এখনো কৃষি। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর কৃষি আর শুধু বীজ, সার ও শ্রমনির্ভর নয়, আধুনিক কৃষি এখন সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, স্মার্ট প্রযুক্তি ও প্রকৌশল নির্ভর। অথচ বাংলাদেশের কৃষি প্রশাসনে এখনো সেচ, কৃষি প্রকৌশল ও কৃষি যান্ত্রিকীকরণ কার্যক্রম একাধিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিভক্ত। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) সেচ উইং, বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) প্রকৌশল উইং প্রায় একই ধরনের কাজ করছে। ফলে প্রশাসনিক জটিলতা, কাজের পুনরাবৃত্তি ও সম্পদের অপচয় দিন দিন বাড়ছে। তাই সময়ের দাবি হলো এই তিনটি সংস্থাকে একীভূত করে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি শক্তিশালী ও আধুনিক কৃষি প্রকৌশল অধিদপ্তর গঠন করা।

বর্তমানে বিএডিসির সেচ উইংয়ের অন্যতম প্রধান কার্যক্রমের মধ্যে হচ্ছে, সেচ দক্ষতা বৃদ্ধি ও সেচ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, খাল খনন/পুনঃখনন, সোলার ও বিদ্যুৎ চালিত গভীর নলকূপ ও এলএলপি স্থাপন, সেচ লাইসেন্স প্রদান, বিভিন্ন সেচ অবকাঠামো নির্মাণ, রাবার ড্যাম ও হাইড্রোলিক এলিভেটেড ড্যাম নির্মাণ, পানিসাশ্রয়ী সেচ প্রযুক্তি যেমনস্প্রিংকলার ও ড্রিপ সেচ ব্যবস্থার প্রচলন, ধান চাষে AWD পদ্ধতি সম্প্রসারণ, জলাবদ্ধতা নিরসন, ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ এবং সেচ সম্পর্কিত বিভিন্ন জরিপ কার্যক্রম সম্পাদন। অন্যদিকে বিএমডিএও ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাপনা, খাল পুনঃখনন, পানি সংরক্ষণ ও সেচ প্রকল্প পরিচালনা করে। আবার ডিএইর প্রকৌশল উইং কৃষিযন্ত্র বিতরণ, ক্ষুদ্র পর্যায়ে সেচ, কৃষি অবকাঠামো ও কৃষি যান্ত্রিকীকরণ নিয়ে কাজ করছে। অর্থাৎ তিনটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের কেন্দ্রে রয়েছে কৃষি প্রকৌশল। কিন্তু একই ধরনের কাজ তিনটি আলাদা প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় মাঠ পর্যায়ে সমন্বয়হীনতা সৃষ্টি হচ্ছে। অনেক সময় একই এলাকায়, বিশেষ করে উত্তর অঞ্চলে তিনটি সংস্থা একই কাজের জন্য আলাদা প্রকল্প গ্রহণ করছে, অথচ একটি সমন্বিত পরিকল্পনা নেই। এতে সরকারি অর্থ, সময় ও জনশক্তির অপচয় হচ্ছে।

বাংলাদেশ এখন জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। খরা, অনিয়মিত বৃষ্টি, বন্যা, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া এবং পানির সংকট কৃষিকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। এই বাস্তবতায় সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনাকে বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালনা করলে চলবে না। একটি সমন্বিত কৃষি প্রকৌশল অধিদপ্তর থাকলে জাতীয় পর্যায়ে একক পানি ও সেচ নীতি বাস্তবায়ন সহজ হবে। একই ডেটা বেইস, একই প্রযুক্তিগত মান এবং সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যানের মাধ্যমে পানিসম্পদের টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমবে এবং আধুনিক সেচ প্রযুক্তি দ্রুত সম্প্রসারণ করা যাবে।

বর্তমানে কৃষক বুঝতে পারেন না কোন সমস্যায় কোন দপ্তরে যেতে হবে। আবার প্রতিটি দপ্তরেরই জনবলের সংকট রয়েছে। কিন্তু তিন প্রতিষ্ঠানে পাঁচ সহস্রাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত, যাঁরা সমষ্টিগতভাবে কাজ করলে মাঠ পর্যায়ে যথাযথ কৃষিসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব। একীভূত দপ্তর হলে অভিযোগ ব্যবস্থাপনা সহজ হবে, মাঠ কর্মকর্তাদের জবাবদিহি বাড়বে, সেবা গ্রহণ দ্রুত হবে।

বর্তমানে বাংলাদেশের কৃষিতে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ দ্রুত বাড়ছে। কম্বাইন হার্ভেস্টার, রিপার, ট্রান্সপ্লান্টার, থ্রেশার, ড্রোন প্রযুক্তি ও স্মার্ট সেচ ব্যবস্থা কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। কিন্তু কৃষিযন্ত্র বিতরণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও কৃষক প্রশিক্ষণ এখনো সমন্বিত নয়। ডিএই কৃষিযন্ত্র ভর্তুকি দিচ্ছে, বিএডিসি সেচযন্ত্র পরিচালনা করছে এবং বিএমডিএ আলাদা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। ফলে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হচ্ছে না। একটি একক কৃষি প্রকৌশল অধিদপ্তর গঠিত হলে সেচ, কৃষিযন্ত্র, পানি ব্যবস্থাপনা ও কৃষক প্রশিক্ষণ একই কাঠামোর আওতায় চলে আসবে। পাশাপাশি বর্তমানে তিনটি প্রতিষ্ঠানের আলাদা প্রশাসন, অফিস ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনার কারণে যে অতিরিক্ত সরকারি ব্যয় হচ্ছে, সেটিও কমে আসবে। কৃষকরাও এক জায়গা থেকেই সেচ, কৃষিযন্ত্র ও পানি ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সব ধরনের সেবা পাবেন। ফলে কৃষি খাতে দক্ষতা, জবাবদিহি, প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিকায়ন বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের কৃষি আরো টেকসই ও উৎপাদনশীল হয়ে উঠবে। এতে কৃষকের জন্য ʻOne Stop Agricultural Engineering Serviceʼ নিশ্চিত হবে।

এ ছাড়া তিনটি প্রতিষ্ঠানের আলাদা প্রশাসনিক কাঠামো সরকারের জন্য অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণ। আলাদা অফিস, আলাদা যানবাহন, আলাদা প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক ব্যয় সরকারি অর্থের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। একীভূত অধিদপ্তর হলে প্রশাসনিক ব্যয় কমবে, প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়বে এবং জবাবদিহি শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে একটি শক্তিশালী কৃষি প্রকৌশল ক্যাডার গড়ে উঠবে, যেখানে প্রকৌশলীরা বিশেষায়িত দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবেন।

উন্নত বিশ্বের অভিজ্ঞতাও একই কথা বলে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, নেদারল্যান্ডস, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলো কৃষি, সেচ ও কৃষি যান্ত্রিকীকরণকে সমন্বিত প্রযুক্তিগত কাঠামোর আওতায় এনেছে। এসব দেশে কৃষি উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হলো কৃষি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা। বাংলাদেশেও যদি কৃষিকে আধুনিক, লাভজনক ও টেকসই করতে হয়, তবে বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক কাঠামোর পরিবর্তে সমন্বিত কৃষি প্রকৌশল ব্যবস্থায় যেতে হবে।

তবে এই একীভূতকরণ অবশ্যই পরিকল্পিতভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বার্থ, প্রশাসনিক ভারসাম্য ও বিশেষায়ন বজায় রাখার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি। সঠিক পরিকল্পনা থাকলে একটি শক্তিশালী কৃষি প্রকৌশল অধিদপ্তর বাংলাদেশের কৃষিকে প্রযুক্তিনির্ভর নতুন যুগে প্রবেশ করাতে পারে।

এই একীভূতকরণে সরকারকে তেমন কোনো বেগ পোহাতে হবে না। এরই মধ্যে তিন প্রতিষ্ঠানেরই উপজেলা পর্যায়েও জনবল সেটআপ, অফিস ভবন ও লজিস্টিক সাপোর্ট রয়েছে। ফলে একটি নতুন অধিদপ্তর গঠনে সরকারের অবকাঠামো নির্মাণ ও নতুন জনবল নিয়োগে যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন পড়ে, এখানে তার প্রয়োজন হবে না। শুধু প্রয়োজন হবে কৃষকের কষ্ট লাঘবের আন্তরিকতা ও প্রযুক্তিনির্ভর আগামীর বাংলাদেশের স্বপ্ন।

বাংলাদেশের কৃষির ভবিষ্যৎ এখন শুধু জমি বা শ্রমের ওপর নির্ভর করছে না, এটি নির্ভর করছে প্রযুক্তি, পানি ব্যবস্থাপনা ও দক্ষ প্রকৌশল ব্যবস্থার ওপর। তাই সময়ের প্রয়োজনে বিএডিসি, বিএমডিএ ও ডিএইর প্রকৌশল কার্যক্রমকে একীভূত করে আধুনিক কৃষি প্রকৌশল অধিদপ্তর গঠন এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং জাতীয় প্রয়োজন।

লেখক : কৃষি প্রকৌশলী, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)

মেধা হারানোর মহামারি ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সংকট

ড. শাহরীনা আখতার

মেধা হারানোর মহামারি ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সংকট

বাংলাদেশ আজ এক গভীর ও নীরব সংকটের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে, যা সরাসরি দেখা না গেলেও রাষ্ট্রের উন্নয়ন কাঠামোর ভেতরে ধীরে ধীরে ফাটল তৈরি করছে। উচ্চ শিক্ষিত, দক্ষ ও সম্ভাবনাময় তরুণদের একটি বড় অংশ দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। এটি শুধু ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার গঠনের সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি মানবসম্পদ ক্ষয়, যা কৃষি, গবেষণা, প্রশাসন, নীতিনির্ধারণ এবং সামগ্রিক উন্নয়ন সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

দেশে প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বিপুলসংখ্যক গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে। কৃষি, প্রকৌশল, চিকিৎসা, তথ্য-প্রযুক্তি এবং উন্নয়ন অধ্যয়নসহ নানা ক্ষেত্রে দক্ষ জনশক্তি তৈরি হচ্ছে। কিন্তু এই অর্জন যতটা না আশাব্যঞ্জক, তার চেয়ে বেশি উদ্বেগজনক হলো বাস্তবতা। এই মেধাবী তরুণদের একটি বড় অংশ দেশে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ মনে করছে না। ফলে একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে, শিক্ষিত ও দক্ষ তরুণদের বিদেশে পাড়ি জমানো। এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যার ফল। কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা, গবেষণার দুর্বল পরিবেশ, পেশাগত অনিশ্চয়তা এবং স্বীকৃতির অভাব এই প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করছে।

দেশে উচ্চ শিক্ষিত বেকারত্বের হার উচ্চ। লাখ লাখ তরুণ ডিগ্রি অর্জন করলেও তাদের উপযুক্ত কাজের সুযোগ সীমিত। অনেকেই নিজের যোগ্যতার সঙ্গে মিল রেখে চাকরি পাচ্ছেন না। ফলে তরুণদের মধ্যে একটি গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। শুধু তরুণদের মধ্যেই নয়, বাংলাদেশের সমাজে সব বয়সের মানুষের মধ্যেই এক ধরনের গভীর হতাশা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কর্মজীবী, মধ্যবয়সী এবং বিশেষ করে উচ্চ শিক্ষিত, মেধাবী ও পিএইচডিধারী পেশাজীবীরাও আজ গভীর অনিশ্চয়তা ও হতাশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। দীর্ঘ অধ্যয়ন, গবেষণা ও দক্ষতা অর্জনের পরও অনেকেই দেশে কাঙ্ক্ষিত মর্যাদা, স্থিতিশীলতা ও পেশাগত নিরাপত্তা পাচ্ছেন না। প্রকল্পভিত্তিক অস্থায়ী কাজ, সীমিত গবেষণা সুযোগ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতার অভাব তাঁদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে তুলছে। এই অনিশ্চয়তা তাদের মনে বারবার প্রশ্ন জাগায়, এই দেশে থেকে ভবিষ্যৎ কতটা নিরাপদ? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই অনেকে উন্নত দেশগুলোতে পাড়ি জমাচ্ছেন, যেখানে কর্মসংস্থান, গবেষণা এবং জীবনমান তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল।

বিদেশমুখিতার প্রধান কারণ শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে মর্যাদা ও স্বীকৃতির সংকট। অনেক তরুণ পেশাজীবী ও গবেষক মনে করেন, দেশে তাঁদের কাজের যথাযথ মূল্যায়ন হয় না। দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতার অভাব, ধীর প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং কখনো কখনো অদৃশ্য চাপ তাঁদের কাজের পরিবেশকে সীমিত করে তোলে। যোগ্যতার চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, প্রভাব বা আনুগত্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, এই ধারণা সব বয়সীদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করে। ফলে তারা এমন পরিবেশ খোঁজে, যেখানে পরিশ্রম ও মেধার সরাসরি প্রতিদান পাওয়া যায়।

বাংলাদেশের কৃষি খাত দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলেও এখানে দক্ষ মানবসম্পদের জন্য কাঙ্ক্ষিত পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবছর অনেক গ্র্যাজুয়েট বের হলেও বাস্তবমুখী ইন্টার্নশিপ, গবেষণা ও উদ্যোক্তা তৈরির কাঠামোবদ্ধ ব্যবস্থা দুর্বল। ফলে ডিগ্রি শেষের আগেই অনিশ্চয়তা তৈরি হয় এবং তারা বিদেশমুখী হয়ে পড়ে। দেশে তাৎক্ষণিক ক্যারিয়ার, গবেষণা সুযোগ ও মর্যাদার অভাব এই প্রবণতাকে আরো তীব্র করে তুলছে।

অনেক তরুণ কৃষিবিদ মনে করেন, দেশে গবেষণার চেয়ে প্রশাসনিক জটিলতা বেশি প্রাধান্য পায়। নতুন ধারণা বাস্তবায়ন করতে গেলে ধীর সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সীমিত গবেষণা তহবিল এবং নানা ধরনের বাধার মুখে পড়তে হয়। আন্তর্জাতিক মানের ল্যাব সুবিধা ও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রকল্পের অভাবও একটি বড় বাধা। ফলে যাঁরা উচ্চশিক্ষা বা স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে যান, তাঁদের একটি বড় অংশ আর ফিরে আসে না। এতে কৃষি খাতে উদ্ভাবন ও আধুনিকায়নের গতি ক্রমশ কমে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

শুধু কৃষি নয়, উন্নয়ন খাতেও একই ধরনের প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। জলবায়ু পরিবর্তন, সামাজিক উন্নয়ন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও টেকসই উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে দক্ষ পেশাজীবীরা কাজ করলেও তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখন বিদেশে স্থায়ী হওয়ার পথে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, উন্নয়ন খাতের পেশাজীবীদের মধ্যে বিদেশমুখিতা প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে, বিশেষ করে তরুণ ও মধ্যম স্তরের বিশেষজ্ঞদের মধ্যে। এর প্রধান কারণ হলো চাকরির অনিশ্চয়তা, প্রকল্পভিত্তিক অস্থায়ী নিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার নিরাপত্তার অভাব। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান যেখানে স্থিতিশীল কর্মপরিবেশ, গবেষণা সহায়তা এবং উন্নত সুবিধা প্রদান করে, সেখানে দেশে অনেকেই নিজেদের ভবিষ্যেক অনিশ্চিত মনে করেন এবং বিকল্প খুঁজতে বাধ্য হন।

এই পুরো প্রক্রিয়া শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; এটি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর দুর্বলতার স্পষ্ট প্রতিফলন। বাংলাদেশের গবেষণা ও উন্নয়নে জিডিপির মাত্র প্রায় ০.৩% ব্যয় হয়, যা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় অনেক কম। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানে আধুনিক অবকাঠামো ও ল্যাব সুবিধার ঘাটতি রয়েছে, পাশাপাশি মেধাভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর নয়। সবচেয়ে বড় সংকট হলো দীর্ঘমেয়াদি নীতির অভাব ও ধারাবাহিক পরিকল্পনার ঘাটতি, যা মেধা ধরে রাখার পরিবর্তে পরোক্ষভাবে দেশত্যাগকে উৎসাহিত করছে।

বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি উদ্বেগজনক চিত্রও লক্ষ করা যাচ্ছে। নতুন সরকার এলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় এখনো অনেক ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও দক্ষতার যথাযথ প্রতিফলন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা হয়। প্রশাসনিক কাঠামোর বিভিন্ন স্তরে অভিজ্ঞতা ও মেধাভিত্তিক নেতৃত্বের ঘাটতির অভিযোগও শোনা যায়, যা নীতি বাস্তবায়নকে ধীর করে দিচ্ছে। এই অনিশ্চয়তার কারণে অনেক পরিবার সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছে। উচ্চশিক্ষার নামে সন্তানদের বিদেশে পাঠানো এখন অনেক ক্ষেত্রে নিরাপদ ভবিষ্যৎ ও সম্ভাব্য স্থায়ী বসবাস এর সুযোগ পাওয়ার কৌশল হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে, যা সামাজিক বাস্তবতায় নতুন চাপ তৈরি করছে।

এই সংকট সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা সম্ভব নয়, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়ন অবশ্যই সম্ভব। প্রথমত, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন। কৃষি, প্রযুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং খাদ্যব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। দ্বিতীয়ত, মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও পদোন্নতি ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। তরুণদের মধ্যে এই আস্থা তৈরি করতে হবে যে দক্ষতা ও পরিশ্রমের মূল্য দেশে নিশ্চিতভাবে পাওয়া যায়। তৃতীয়ত, বিদেশফেরত গবেষক ও পেশাজীবীদের জন্য বিশেষ অনুদান, গবেষণা তহবিল এবং ক্যারিয়ার সহায়তা ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। অনেক দেশ এরই মধ্যে রিভার্স ব্রেইন ড্রেইন নীতির মাধ্যমে সফল হয়েছে। চতুর্থত, উন্নয়ন ও গবেষণা খাতে দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রকল্পভিত্তিক অস্থায়ী চাকরির পরিবর্তে স্থিতিশীল পেশাগত কাঠামো তৈরি করা জরুরি।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার তরুণ জনগোষ্ঠী। কিন্তু সেই জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে দক্ষ অংশ যদি একে একে দেশ ছাড়তে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতের উন্নয়ন কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়বে। উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়; এটি জ্ঞান, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং মানবসম্পদের ওপর নির্ভরশীল। সেতু, রেল বা প্রযুক্তি যতই আধুনিক হোক না কেন, মেধা ছাড়া কোনো জাতির টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আমরা কি আমাদের সেরা মেধাগুলোকে ধরে রাখতে পারব, নাকি তারা অন্য দেশের উন্নয়নের ভিত্তি হয়ে উঠবে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পথচলা, উন্নয়নের গতি এবং জাতীয় সক্ষমতার প্রকৃত শক্তি।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

প্রস্তাবিত বাজেট : কৃষি খাতে বরাদ্দ ও ভর্তুকি অপ্রতুল

ড. জাহাঙ্গীর আলম

প্রস্তাবিত বাজেট : কৃষি খাতে বরাদ্দ ও ভর্তুকি অপ্রতুল

গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা শিরোনামে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বাজেট প্রস্তাব সংসদে পেশ করেছেন অর্থমন্ত্রী। বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। চলতি বছরের মূল বাজেটের তুলনায় তা এক লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বা ১৮.৭৩ শতাংশ বেশি। এ বাজেটের আকার হচ্ছে জিডিপির ১৩.৭ শতাংশ। স্বাধীনতার পর দেশের প্রথম বাজেটের পরিমাণ ছিল ৭৮৬ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত নয়া বাজেট ওই বাজেট থেকে ১১৯৩ গুণ বেশি। বাংলাদেশে বাজেট বৃদ্ধির হার সাধারণত ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হয়ে থাকে।  এবার তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। অন্যান্য কারণের মধ্যে প্রধানত সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের অভিপ্রায় বাজেটের আকার সম্প্রসারিত করেছে। তবে দেশের বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির কথা বিবেচনায় নিয়ে সরকারের পরিচালন ব্যয় কমানোর মাধ্যমে একটি আঁটসাঁট বাজেট প্রস্তাবই এবার কাঙ্ক্ষিত ছিল।

প্রস্তাবিত বাজেটে মোট রাজস্ব প্রাক্কলন করা হয়েছে ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এটি চলতি  অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২৩ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা হলো পাঁচ লাখ ৬৯ হাজার কোটি টাকা, তবে প্রকৃত রাজস্ব আদায় পাঁচ লাখ কোটি টাকার বেশি হবে বলে মনে হয় না। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট রাজস্ব আদায় ছিল চার লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল তিন লাখ ৬৬ হাজার কোটি টাকা। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় আগামী বছর এবারের তুলনায় প্রায় ৩৯ শতাংশ রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। এটি অনেক বড় প্রত্যাশা। এটি সম্ভব না হলে বাজেট বাস্তবায়নের জন্য ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ গ্রহণ বাড়াতে হবে। তাতে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাবে। উৎপাদনশীল খাতগুলোকে এর ভার বহন করতে হবে। ফলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়বে।

প্রস্তাবিত বাজেট : কৃষি খাতে বরাদ্দ ও ভর্তুকি অপ্রতুলগত বাজেটে জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৫.৫ শতাংশ। প্রাথমিক হিসাবে অর্জনের পরিমাণ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম, ৪.১৪ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৩.৪৯ শতাংশ। এর আগের বছরে ছিল ৪.২২ শতাংশ। এবারের লক্ষ্যমাত্রা ৬.৫ শতাংশ। আগামী বাজেট বাস্তবায়নের হার ও গুণগত মান সন্তোষজনক না হলে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নাও হতে পারে। প্রস্তাবিত বাজেটে মূল্যস্ফীতির হার ধরা হয়েছে ৭.৫ শতাংশ। বাস্তবে এটা হয়তো আরো বেশি হবে। বর্তমানে গড় মূল্যস্ফীতির হার প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি রয়েছে। গত মে মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯.০৬ শতাংশ। সম্প্রতি দেশে কৃষির উৎপাদন বিশেষ করে বোরো ধানের উৎপাদন বিঘ্নিত হওয়ায় আগামী দিনগুলোতে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার অনমনীয় থাকবে বলে ধারণা করা যায়।

প্রস্তাবিত কৃষি বাজেট সংকুচিত হয়েছে। আগামী অর্থবছরে কৃষিবিষয়ক পাঁচটি মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪৬ হাজার ৮২১ কোটি টাকা। এ টাকা মোট বরাদ্দের ৪.৯৯ শতাংশ। এর মধ্যে শস্য কৃষি খাতের জন্য রাখা হয়েছে ২৮ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৩.০৮ শতাংশ। বাকি ১.৯১ শতাংশ মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, বন ও পরিবেশ, ভূমি ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়সমূহের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। এটা অপ্রতুল। দিনের পর দিন বাজেটে বৃহত্তর কৃষি খাতের হিস্যা হ্রাস পেয়েছে। ২০১১-১২ সালে বৃহত্তর কৃষি খাতের হিস্যা ছিল মোট বাজেটের ১০.৬৫ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে তা নেমে আসে ৫.৮৬ শতাংশে। এবার তা আরো কমে দাঁড়িয়েছে ৪.৯৯ শতাংশে। ২০০৯-১০ অর্থবছরে কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল ৬.৬৫ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা ২.৪২ শতাংশে নেমে আসে। এবার তা ২.৭৮ শতাংশ হবে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। উচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতি হ্রাস ও এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে খাদ্য এবং পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি ৪ থেকে ৫ শতাংশ নিশ্চিত করা উচিত। সে লক্ষ্যে ন্যূনপক্ষে মোট বাজেটের ১০ শতাংশ অর্থ কৃষিতে নিয়োজিত করা উচিত।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে ফসল খাতে ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ১৭,২৪১ কোটি টাকা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে তার পরিমাণ ধরা হয়েছে ১৭ হাজার এক কোটি টাকা। গত বছরের মূল বাজেট থেকে তা ২৪০ কোটি টাকা কম। ২০১১-১২ সালের সংশোধিত বাজেটে কৃষি ভর্তুকির হিস্যা ছিল ৬.৪ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা ২.১৮ শতাংশ নেমে আসে। এবার তা আরো কমে ১.৭৫ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। এভাবে কৃষি ভর্তুকির ক্রম হ্রাস অনাকাঙ্ক্ষিত। তাতে বিঘ্নিত হবে কৃষির উৎপাদন। খাদ্য নিরাপত্তা ব্যাহত হবে। কৃষি খাতে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় উৎপাদন বাড়িয়ে যেতে হলে কৃষি ভর্তুকির পরিমাণ মোট কৃষি উৎপাদন মূল্যের ১০ শতাংশ নিশ্চিত করা উচিত।

বাজেটে কৃষি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ ৬.০৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু কৃষিসংশ্লিষ্ট অন্যান্য চারটি মন্ত্রণালয়ের মোট বরাদ্দ ৫.৭৯ শতাংশ কমে গেছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ গত বছরের মূল বরাদ্দ থেকে ১৯.৬ শতাংশ এবং সেচ ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বাজেট ৫.৯৯ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। সার্বিক কৃষি উন্নয়ন ও গ্রামীণ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের বাজেট এবার ৪.৬৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। পাট মন্ত্রণালয়ের বাজেট কমেছে ১১.০৫ শতাংশ। শিল্প মন্ত্রণালয়ের বাজেট ১০.৫২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এভাবে দেশের উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সরাসরিভাবে জড়িত মন্ত্রণালয়সমূহের বরাদ্দ হ্রাস খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি দমনের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হয় না।

প্রস্তাবিত বাজেটে রেকর্ড পরিমাণ বরাদ্দ বেড়েছে জনপ্রশাসনে। এবারের মোট বরাদ্দ দুই লাখ ৬৩ হাজার ৯৪৫ কোটি টাকা। গত বছরের মূল বরাদ্দ থেকে ৭৭ হাজার ৮৫৭ কোটি টাকা বা ৪১.৮৪ শতাংশ বেশি। এ বরাদ্দ মোট বাজেটের ২৮.১৪ শতাংশ। এর সঙ্গে প্রতিরক্ষা, জনশৃঙ্খলা এবং জননিরাপত্তা যোগ করা হলে মোট বাজেটের প্রায় ৩৬ শতাংশ চলে যায়। এ ক্ষেত্রে সরকারের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। মন্ত্রণালয়গুলোতে কর্মচারীর সংখ্যা হ্রাস করে নথি অগ্রগমনের ধাপ কমানো উচিত। আগে নতুন পে স্কেল ঘোষণার ক্ষেত্রে ৫০/৬০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির কথা ভাবা হতো। গত আওয়ামী লীগ সরকার তা বাড়িয়ে দিয়েছিল ১২০ শতাংশেরও বেশি। এবারও বেতন বৃদ্ধির হার প্রায় কাছাকাছি। এ চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সেবাগ্রহণকারী ও কর প্রদানকারী ব্যক্তিদের দিয়ে নতুন পে স্কেল রিভিউ করা উচিত। দেশের সাধারণ মানুষ কিভাবে জীবন নির্বাহ করে সেদিকে লক্ষ রাখা উচিত। ভবিষ্যতে বাজেট প্রণয়নের সব কার্যক্রম সচিবালয়ের আমলাদের প্রভাবমুক্ত রেখে নিরপেক্ষ কমিশনের মাধ্যমে সম্পন্ন করা উচিত।

বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুই বিভাগে এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে এক লাখ ২২ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা। এটি মোট বাজেটের ১৩.০৬ শতাংশ। এ বরাদ্দ জিডিপির প্রায়ই ২ শতাংশ। স্বাস্থ্যসেবা খাতের দুটো বিভাগে মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬২ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। এটি মোট বরাদ্দের ৬.৭০ শতাংশ। আগের বাজেটের তুলনায় তা ২০ হাজার ৯৪৪ কোটি টাকা বেশি। মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এ দুটো খাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাজেট বৃদ্ধি সমর্থনযোগ্য।

প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা ও সমাজকল্যাণ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬২ হাজার ৪৪ কোটি টাকা। গত বাজেটে ছিল ৪৫ হাজার ৮৩ কোটি টাকা। বরাদ্দ বৃদ্ধির হার ৩৮.২৯ শতাংশ। এ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে একত্রে, পাঁচটি মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে (সমাজকল্যাণ, মহিলা ও শিশু, খাদ্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও মুক্তিযুদ্ধ)। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বর্তমানে বয়স্ক ভাতা প্রতি মাসে দেওয়া হচ্ছে ৬৫০ টাকা আর বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা নারী ভাতা ৯০০ টাকা। প্রস্তাবিত বাজেটে যথাক্রমে ৫০ ও ১০০ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়েছে ১১৭.৫৯ শতাংশ। গত বছরের মূল বাজেট ১৩ হাজার ৯৯১ কোটি টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে এবার হয়েছে ৩০ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা। উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো সম্প্রসারণের এই উদ্যোগ সমর্থনযোগ্য।

নয়া বাজেটে নাগরিকদের স্বস্তির জন্য বেশ কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে কর ও শুল্কহার হ্রাস করা হয়েছে। এর মধ্যে চাল, গম, তেলসহ কিছু নিত্যপণ্যের উৎস কর ১ শতাংশ থেকে ০.৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। ভোজ্যতেল উৎপাদনের ক্ষেত্রে পাঁচ বছর পর্যন্ত কর অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। শিশু খাদ্যের কাঁচামাল  আমদানিতে শুল্কহার ১৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে হ্রাস করা হয়েছে। মসলা ও খেজুর আমদানিতে ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে। কীট ও বালাইনাশক উৎপাদনে ব্যবহৃত ৩৬টি কাঁচামালের আমদানিতে মূল্য সংযোজন কর শূন্যে নামিয়ে আনা হয়েছে। জিং সালফেট সার উৎপাদনে ব্যবহৃত জিংক ত্র্যাশ আমদানিতে শুল্ক মওকুফ করা হয়েছে। ভেটেরিনারি মেডিসিন আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক রেয়াত দেওয়া হয়েছে। সারের ব্যবসায়ী পর্যায়ের প্রযোজ্য ৭.৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর অব্যাহতি এবং সব ধরনের কীটনাশক আমদানি পর্যায়ে প্রযোজ্য ৭.৫ শতাংশ আগাম কর অব্যাহতির প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপের ফলে পণ্যমূল্য হ্রাস পাবে। অন্যদিকে কাজুবাদামের ওপর আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির ফলে দেশের অভ্যন্তরে পণ্যটির উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ উৎসাহিত হবে। পাঙ্গাশ মাছের ফিলেটের ওপর ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করায় দেশে মৎস্যশিল্পের বাজার প্রতিরক্ষণ নিশ্চিত হবে। 

আগামী অর্থবছর থেকে প্র্রস্তাবিত বাজেটে ব্যক্তি শ্রেণির করমুক্ত আয়ের সীমা তিন লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে তিন লাখ ৭৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। মহিলা ও ৬৫ বছরের বা তদূর্ধ্ব বয়সের করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা বেড়ে হবে চার লাখ ২৫ হাজার টাকা। সর্বোচ্চ কর হার আগের মতো ৩০ শতাংশ রাখা হয়েছে। করমুক্ত আয়ের সীমা চার লাখ টাকায় বাড়ানো হলে নিম্ন আয়ের করদাতারা স্বস্তি পেতেন। 

অর্থনীতিতে গতি সঞ্চারের জন্য প্রথম ধাপে (এক বছর) পুনরুদ্ধার কার্যক্রম, দ্বিতীয় ধাপে (এক থেকে তিন বছর) অর্থনীতির উত্তরণ এবং তৃতীয় ধাপে (পাঁচ বছরের মধ্যে) সমৃদ্ধ অর্থনীতি বিনির্মাণের কথা বলা হয়েছে। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮.৫ শতাংশে উত্তরণ এবং মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে কর জিডিপির অনুপাত ৬.৮ শতাংশ থেকে ৯.৬ শতাংশে এবং রাজস্ব জিডিপির অনুপাত ৮ শতাংশ থেকে ১১ শতাংশে উন্নীত করা হবে। আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা হবে এবং দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে। তাতে কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধি পাবে। মানুষের দারিদ্র্য লাঘব হবে। স্বস্তি ফিরে আসবে দেশের সাধারণ মানুষের জীবনে। নয়া সরকারের বাজেট বাস্তবায়নে সাফল্য কামনা করি।

লেখক : একুশে পদকপ্রাপ্ত কৃষি অর্থনীতিবিদ। সাবেক উপাচার্য, ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজ (ইউজিভি); সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই)।