অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা দেশের আবাসন খাত বহুমুখী সংকটে জর্জরিত। করোনা মহামারির পর থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত এ খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেননি। আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতি, নির্মাণসামগ্রীর অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদের কারণে এই খাতে অচলাবস্থা বিরাজ করছে।
রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সভাপতি ড. আলী আফজাল কালের কণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ বিষয়ে নানা দিক তুলে ধরেন। তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয়, প্রস্তাবিত বাজেটে নির্মাণসামগ্রী ও আবাসন খাতে কর ও শুল্ক কাঠামোর পরিবর্তনের প্রভাব কেমন হবে? জবাবে তিনি বলেন, ‘অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ফ্ল্যাটের দাম ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তের জন্য ফ্ল্যাট কেনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে এবং নতুন বিনিয়োগও কমে যাবে।’ জানা গেছে, ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফ্ল্যাট বিক্রি প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। বিশেষ করে বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের ক্রেতা নেই বললেই চলে। এই পরিস্থিতিতে বাজেটে কর বৃদ্ধি ও শুল্ককাঠামোর পরিবর্তন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রিহ্যাব দীর্ঘদিন থেকে স্বল্প সুদে গৃহঋণ দাবি করে আসছে। এ প্রসঙ্গেও আলী আফজাল বলেন, ‘এবারের বাজেটে আমাদের মূল দাবিগুলো প্রতিফলিত হয়নি।’ এ ধরনের অপ্রাপ্তির তালিকা কম দীর্ঘ নয়। অথচ দেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় খাত আবাসন। এখানে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রায় ৫০ লাখ লোকের কর্মসংস্থান। প্রতিবছর রেজিস্ট্রেশন, ভ্যাট, ট্যাক্স ও অন্যান্য উৎস থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা রাজস্ব পায় সরকার।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, এই খাতে সংকট থাকলেও রয়েছে অপার সম্ভাবনা। আলী আফজাল জানান, ঢাকার বাইরে খুলনা, রাজশাহী, রংপুর, সিলেট, চট্টগ্রাম, বগুড়া, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন শহরে এরই মধ্যে উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার পরিকল্পনা।
আশ্রয় হলো মানুষের মৌলিক অধিকার। রাষ্ট্রকে বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। এ জন্য আবাসন খাতে যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, সেগুলো দূর করা প্রয়োজন। সিঙ্গল ডিজিট সুদের হোম লোন, ২০ থেকে ২৫ বছরের দীর্ঘমেয়াদি কিস্তি ব্যবস্থা, রেজিস্ট্রেশন খরচ ৩ থেকে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার দাবি অনেক দিনের। এ ছাড়া মধ্যবিত্তের জন্য বিশেষ হাউজিং ফান্ড ও অপ্রদর্শিত অর্থকে বৈধ পথে আনার বাস্তবসম্মত নীতির প্রতিফলন চায় খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সার্বিক দিক বিবেচনায় আলী আফজাল বলেছেন, ‘বাংলাদেশের জন্য স্বল্পমেয়াদি নয়, বরং ১০০ বছরের মাস্টারপ্ল্যান প্রয়োজন।’ আমরাও মনে করি, সঠিক পরিকল্পনা ও তার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন করা গেলে আবাসন খাত আবারও স্থিতিশীল ও প্রবৃদ্ধিমুখী হয়ে উঠবে।

