কানাডার মন্ট্রিয়ল শহরে সোমবার স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ১১টার দিকে এক বন্দুকধারীর হামলায় তিনজন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একজন পুলিশ কর্মকর্তা, একজন সাধারণ নাগরিক এবং হামলাকারী নিজেও রয়েছেন। এ ঘটনায় আরো এক নারী পুলিশ কর্মকর্তা গুরুতর আহত হয়েছেন। তবে তার অবস্থা বর্তমানে শঙ্কামুক্ত বলে জানিয়েছে পুলিশ।
মন্ট্রিয়লের কোট-দে-নিজ নামক এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এলাকাটি শহরের অন্যতম জনবহুল এলাকা। এখানে ইহুদি সম্প্রদায়ের অনেক মানুষ বসবাস করেন। এলাকাজুড়ে রয়েছে ইহুদি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, কোশের বাজার ও বিভিন্ন রেস্তোরাঁ।
ঘটনার পর পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থল ঘিরে ফেলে এবং ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে। মন্ট্রিয়ল পুলিশের প্রধান ফাদি দাঘের জানান, বন্দুক হামলার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। সেখানে পৌঁছানোর পর গোলাগুলি শুরু হয়। হামলাকারী একটি ভবনের ভেতর থেকে লম্বা একটি বন্দুক ব্যবহার করে গুলি চালাচ্ছিল। পরে পুলিশের পাল্টা অভিযানে হামলাকারী নিহত হয়। পুলিশ মনে করছে, সে একাই এ হামলা চালিয়েছিল। এক সংবাদ সম্মেলনে ফাদি দাঘের ঘটনাটিকে 'একটি ট্র্যাজেডি' এবং 'একটি দুঃস্বপ্ন' বলে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, হামলায় এক পুরুষ পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। তবে তার পরিচয় এখনো প্রকাশ করা হয়নি। পুলিশ আরো জানায়, হামলাকারীর পরনে সামরিক পোশাকের মতো পোশাক ছিল। তবে তার উদ্দেশ্য কী ছিল, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ঘটনার সময় এলাকায় থাকা অনেক মানুষ ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। ফ্রাঙ্ক ভোগাস নামে ৭১ বছর বয়সী এক ব্যক্তি জানান, তিনি একটি দোকান থেকে রং কিনছিলেন। হঠাৎ গুলির শব্দ শুনতে পান। তিনি বলেন, হঠাৎ দেখলেন চারদিক থেকে পুলিশ ছুটে আসছে। তাদের হাতে অস্ত্র ছিল। পরে তারা দোকানে থাকা সবাইকে মেঝেতে নিচু হয়ে থাকতে বলে।
আরেক প্রত্যক্ষদর্শী ড্যানি উইল্ক জানান, তিনি প্রথমে একটি গুলির শব্দ শুনেছিলেন। এরপর পরপর আরো কয়েকটি গুলি ছোড়া হয়। তিনি বলেন, তিনি যখন নিরাপদে থাকার জন্য একটি পিৎজার দোকানে ঢোকার চেষ্টা করছিলেন, তখন হামলাকারীকে দেখতে পান। মনে হচ্ছিল, সে আবারো গুলি চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। উইল্ক আরো জানান, তিনি মাটিতে পড়ে থাকা নিহত পুলিশ কর্মকর্তাকে দেখেছিলেন। কিছুক্ষণ পর পুলিশ হামলাকারীকে গুলি করে নিস্তেজ করে ফেলে।
হামলার কারণ নিয়ে এখনো তদন্ত চলছে। পুলিশ এখন পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যের কথা জানায়নি। তবে কানাডার সরকারি ফরাসি ভাষার সংবাদমাধ্যম রেডিও কানাডা জানিয়েছে, হামলাকারীর সঙ্গে তথাকথিত 'ইনসেল' মতাদর্শের সম্পর্ক থাকতে পারে। ইনসেল শব্দটির অর্থ হলো 'অনিচ্ছাকৃতভাবে সঙ্গীহীন'। এই মতাদর্শে বিশ্বাসী কিছু ব্যক্তি নারী সঙ্গী না পাওয়ার হতাশা থেকে নারীদের প্রতি ঘৃণা ও চরমপন্থী চিন্তাধারার দিকে ঝুঁকে পড়ে। ২০১৮ সালে টরন্টোতে এমন মতাদর্শে বিশ্বাসী এক ব্যক্তি গাড়ি তুলে দিয়ে হামলা চালিয়েছিল। ওই ঘটনায় ১০ জন নিহত হয়েছিলেন। সেটি কানাডার ইতিহাসের অন্যতম প্রাণঘাতী হামলা হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে সোমবারের হামলার সঙ্গে এই মতাদর্শের সরাসরি কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত করেনি পুলিশ।
তবে এটি ইহুদিবিরোধী হামলা কি না, তা নিয়েও বেশ জল্পনা-কল্পনা চলছে। ঘটনাস্থলটি ইহুদি সম্প্রদায়ের বসবাসের এলাকা হওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত নানা ধরনের গুজব ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে ধারণা করতে থাকেন, এটি হয়তো ইহুদিবিরোধী হামলা। তবে পুলিশ এ ধরনের কোনো তথ্য নিশ্চিত করেনি। পুলিশ প্রধান ফাদি দাঘের বলেন, এই মুহূর্তে গুজব ছড়ানো থেকে সবাইকে বিরত থাকতে হবে। তদন্তে এখন পর্যন্ত হামলার উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। এলাকার ধর্মীয় নেতা গেটজি মার্কোভিটজও একই আহ্বান জানান। তিনি বলেন, অনেকে জানতে চাইছেন, এটি কি ইহুদি সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে হামলা ছিল কি না। কিন্তু এখনই এমন মন্তব্য করলে দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দেয়া হবে। তার ধারণা, এই হামলাটি পুলিশের বিরুদ্ধে সংঘটিত হয়েছে।
ঘটনার পর কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, এই সহিংস ঘটনায় তিনি 'ভীষণ আতঙ্কিত' ও মর্মাহত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি নিহত ও আহতদের পরিবার, স্থানীয় বাসিন্দা এবং দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান। ক্যুবেকের প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টিন ফ্রেশেতও শোক প্রকাশ করেন। তিনি সবাইকে ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়ার আগে যেকোনো ধরনের জল্পনা না করার আহ্বান জানান।
এদিকে বিকেলের দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পর পুলিশ ধীরে ধীরে নিরাপত্তা বলয় তুলে নিতে শুরু করে। এলাকায় যান চলাচলও স্বাভাবিক হতে থাকে। তবে হামলার কারণ, হামলাকারীর পরিচয় এবং তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে তদন্ত এখনো চলছে।