• ই-পেপার

লোকসংখ্যা বাড়ছে, মানুষ বাড়ছে না

প্রস্তাবিত বাজেট ২০২৬-২৭ : সদিচ্ছার প্রতিফলন, তবে বাস্তবায়নের পথ কঠিন

মাহামুদ হোসেন
প্রস্তাবিত বাজেট ২০২৬-২৭ : সদিচ্ছার প্রতিফলন, তবে বাস্তবায়নের পথ কঠিন

ক্ষমতায় আসার পর একটি সরকারের প্রথম বাজেট সাধারণত তার রাজনৈতিক দর্শন, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার এবং জনকল্যাণের প্রতিশ্রুতির সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটায়। সেই বিবেচনায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট নিঃসন্দেহে বর্তমান সরকারের নীতি-অবস্থান বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এ বাজেটে জনকল্যাণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের প্রতি সরকারের সদিচ্ছা স্পষ্ট। তবে বাজেট কেবল ভালো উদ্দেশ্যের ঘোষণাপত্র নয়; এর প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় বাস্তবায়নের সক্ষমতা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার দৃঢ়তার মাধ্যমে।

এই বাজেটের ইতিবাচক দিকগুলো অস্বীকার করার সুযোগ নেই। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য খাতে প্রায় দ্বিগুণ বরাদ্দ, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও ই-হেলথ কার্ডের মতো উদ্যোগ একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের ধারণাকে সামনে আনে। বিশেষ করে ৪১ লাখ নারীকে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে মাসিক আর্থিক সহায়তা প্রদানের পরিকল্পনা নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ হতে পারে। একই সঙ্গে আগামী পাঁচ বছরের ব্যক্তিশ্রেণির করকাঠামো একসঙ্গে ঘোষণা করা, বৈদ্যুতিক যানবাহনে দীর্ঘমেয়াদি শুল্ক ছাড় এবং ক্রিয়েটিভ ইকোনমি ও স্পোর্টস ইকোনমিকে গুরুত্ব দেওয়ার মতো উদ্যোগ দূরদর্শী পরিকল্পনার ইঙ্গিত দেয়।

কিন্তু সদিচ্ছা যতই প্রশংসনীয় হোক, বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা হলো প্রশাসনিক কাঠামোর দুর্বলতা। বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, জবাবদিহির অভাব এবং অদক্ষতার ভার বহন করছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে কর প্রশাসনে মৌলিক সংস্কার অপরিহার্য। করদাতা হয়রানি বন্ধ, অটোমেশন বাস্তবায়ন এবং ফেসলেস অ্যাসেসমেন্ট চালু করা শুধু নীতিগত ঘোষণার বিষয় নয়; এগুলো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন মানসিকতা পরিবর্তন, দক্ষ জনবল এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা।

এডিপি বাস্তবায়নের অতীত রেকর্ডও সতর্কবার্তা দিচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের হার ধারাবাহিকভাবে কমেছে। লক্ষ্যমাত্রা বাড়লেও বাস্তবায়ন সক্ষমতা সেই হারে বাড়েনি। ফলে প্রস্তাবিত ৩ লাখ কোটি টাকার এডিপিতে উল্লেখযোগ্য বাস্তবায়ন ঘাটতির ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও ই-হেলথ কার্ডের মতো বড় উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের প্রশাসনিক সক্ষমতার ওপর। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মাঠপর্যায়ে ডিজিটাল অবকাঠামো এখনো দুর্বল, কর্মকর্তাদের প্রযুক্তিগত দক্ষতায় ঘাটতি রয়েছে এবং মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

অর্থনৈতিক নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আছে। একদিকে ব্যাপক করছাড় ও অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে রেকর্ড রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। মূল্যস্ফীতি কমানোর লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করা হলেও উচ্চ সুদের হার কমানোর সুস্পষ্ট রোডম্যাপ অনুপস্থিত। এসব লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জন করতে হলে শক্তিশালী সমন্বিত অর্থনৈতিক কৌশল দরকার, যা বাজেট বক্তৃতায় যথেষ্ট স্পষ্টভাবে দেখা যায় না।

বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয় হলো এনবিআর রাজস্ব ৫৬ শতাংশ বাড়ানোর মতো উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যের বিপরীতে বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনার অভাব। বেসরকারি বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি কয়েক গুণ বাড়ানোর লক্ষ্যও প্রশংসনীয়, কিন্তু বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, সুদের হার, নীতি-স্থিতিশীলতা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর না হলে এ লক্ষ্য বাস্তবায়ন কঠিন হবে। মূল্যস্ফীতি কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে রাজস্ব ও মুদ্রানীতির ঘনিষ্ঠ সমন্বয় অপরিহার্য; কিন্তু সেই সমন্বয়ের ধাপভিত্তিক রূপরেখা আরো পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।

সরকারের ঘোষিত পুনরুদ্ধার, পুনরুজ্জীবন ও পুনর্গঠনের ত্রিস্তরীয় কৌশল ধারণাগতভাবে সঠিক। কিন্তু প্রথম ধাপ মাত্র এক বছরে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা অতিমাত্রায় উচ্চাভিলাষী বলে মনে হয়। প্রতিটি ধাপের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা, মাইলস্টোন, দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান এবং জবাবদিহির কাঠামো না থাকলে এ ধরনের কৌশল শেষ পর্যন্ত আকর্ষণীয় স্লোগানেই সীমাবদ্ধ থেকে যেতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে সরকারের সামনে সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো বাস্তবায়ন সক্ষমতা বাড়ানো। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের জন্য ত্রৈমাসিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে এবং সেগুলো পূরণে ব্যর্থ হলে দৃশ্যমান জবাবদিহির ব্যবস্থা রাখতে হবে। একই সঙ্গে একটি বাস্তবসম্মত সংশোধিত বাজেটের প্রস্তুতিও এখন থেকেই নেওয়া উচিত। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পুনর্নির্ধারণ করা গেলে সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা কমবে না; বরং বাড়বে।

অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতার ঘাটতি পূরণে দেশীয় অর্থনীতিবিদ, পেশাদার হিসাববিদ, বেসরকারি খাতের বিশেষজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের প্রযুক্তিগত সহায়তা কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হবে। এটি দুর্বলতার স্বীকৃতি নয়; বরং দায়িত্বশীল ও দূরদর্শী নেতৃত্বের পরিচায়ক। পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ছাড়া বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। খেলাপি ঋণ কমানো, মূলধন পর্যাপ্ততা পুনরুদ্ধার এবং ব্যাংক পরিচালনায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি।

সব মিলিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে একটি সদিচ্ছাপূর্ণ ও জনকল্যাণমুখী বাজেট বলা যায়। তবে গণতান্ত্রিক সরকারের দায়িত্ব কেবল ভালো উদ্দেশ্য ঘোষণা করা নয়; সেই উদ্দেশ্যকে কার্যকর নীতিতে এবং নীতিকে দৃশ্যমান ফলাফলে রূপান্তর করা। সদিচ্ছা যদি বাস্তবে রূপ না পায়, তবে তা শেষ পর্যন্ত জনগণের কাছে হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই বাজেটের সাফল্য তাই সংখ্যার বিশালতায় নয়, বরং বাস্তবায়নের সততা, দক্ষতা এবং জবাবদিহির ওপর নির্ভর করবে।

মাহামুদ হোসেন এফসিএ
আর্থিক খাতের বিশ্লেষক ও সাবেক কাউন্সিল মেম্বার আইসিএবি

৬ শিশুর মৃত্যুর বিচার হয়, ৬০০ শিশুর ঘাতকরা শাস্তি পায় না!

অদিতি করিম
৬ শিশুর মৃত্যুর বিচার হয়, ৬০০ শিশুর ঘাতকরা শাস্তি পায় না!

বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।’ কিন্তু আমরা কি সংবিধানের এই মৌলিক অধিকারের বিধান মানছি? এই দেশে কিছু মানুষ আছেন যারা আইন ও বিচারের উর্ধ্বে। ধরাছোঁয়ার বাইরে।তারা অপরাধ করলেও বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ান। আদালতে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা যায় না। তাদের অপকর্মের প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত পর্যন্ত হয়না। সুশীল মুখোশ পরে এরা অনিয়ম করেন, কিন্তু কেউ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে না। সাম্প্রতিক সময়ে শিশু হত্যা নিয়ে আইনের বৈষম্য আমাদের চোখের সামনে উন্মোচিত হলো ঈদের আগের দিন রাজধানীর আদ-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। গোটা দেশ এই ঘটনায় শোকে স্তব্ধ হয়। সরকার এই ঘটনার তদন্ত শুরু করে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী আশ্বাস দেন, দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। স্বাস্হ্য মন্ত্রী তার কথা রেখেছেন। ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।গত বৃহস্পতিবার হাসপাতালটির নির্বাহী পরিচালক ও স্বত্বাধিকারী শেখ মহিউদ্দীনকে পাঠানো এক চিঠিতে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের পক্ষে আজ আদ্-দ্বীন হাসপাতালের স্বত্বাধিকারী শেখ মহিউদ্দীনকে চিঠিটি পাঠিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ)। চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, ‘লাইসেন্স বাতিলের পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে বাতিল আদেশের বিরুদ্ধে সরকারের কাছে আপনার আপিল বা পুনর্বিবেচনা করার আইনি সুযোগ রয়েছে।’

চিঠিটির বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ‘আদ্-দ্বীন হাসপাতাল, ২ বড় মগবাজার, ঢাকা-এর কারণ দর্শানোর জবাবের পরিপ্রেক্ষিতে প্রদত্ত সিদ্ধান্ত।’

চিঠিতে বলা হয়, গত ২৭ মে ছয় নবজাতকের আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনায় দ্য মেডিক্যাল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অধ্যাদেশ, ১৯৮২-এর ১১(১) ধারা অনুযায়ী গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ৪ জুন এই হাসপাতালটির ‘লাইসেন্স কেন বাতিল করা হবে না’ মর্মে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। ৭ জুন বিকেল পাঁচটার মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছিল। সেই নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে ৭ জুন আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কারণ দর্শানোর সময় বাড়ানোর জন্য আবেদন করলে এই সময়সীমা ৯ জুন বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত বাড়ানো হয়।

বিষয়টি উল্লেখ করে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের স্বত্বাধিকারীকে চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘৯ জুন আপনার প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে যে জবাব ও ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, তা কর্তৃপক্ষের কাছে সন্তোষজনক না হওয়ায় দ্য মেডিক্যাল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অধ্যাদেশ, ১৯৮২-এর ১১(২) (খ) ধারা অনুযায়ী আপনার হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা হলো।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গৃহীত পদক্ষেপ ছাড়াও ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশ মামলা করেছে। সেই মামলার তদন্ত চলছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলায় রোগীর মৃত্যুর ঘটনা এটাই প্রথম নয়, কিন্তু অতীতে কখনও স্বাস্থ্য অধিদফতর কঠোর হতে পারেনি। এধরনের ঘটনার পর তদন্ত কমিটি হয়েছে, কিছুদিন হৈচৈ হয়েছে, তারপর সবকিছু ধামাচাপা পড়ে গেছে। যারা বেসরকারি হাসপাতালের মালিক তারা প্রভাবশালী। যেকোন উপায়ে তারা সবকিছু ম‍্যানেজ করে নিয়েছেন। ফলে বেসরকারি হাসপাতাল গুলো ক্রমশ স্বেচ্ছাচারি হয়ে গেছে। রোগীদের সেবা প্রদানের চেয়ে তারা মুনাফা লাভে বেশি ব্যস্ত। বেসরকারি হাসপাতাল গুলো জবাবদিহিতার বাইরে চলে যায়। তাই আদ- দ্বীন হাসপাতালের মতো একটি প্রভাবশালী বেসরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে সরকার নিঃসন্দেহে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে। এটা শুধু আদ্-দ্বীন হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নয়, যেসব বেসরকারি হাসপাতাল চিকিৎসার নামে প্রতারণা করে, জনগণকে হয়রানি করে তাদের সবার জন্য একটি সতর্ক বার্তা। এজন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রী একটি ধন্যবাদ পেতেই পারেন। তিনি শুরু থেকেই এই বিষয়ে সোচ্চার এবং সংবেদনশীল ছিলেন। আদ্-দ্বীন হাসপাতালের বিরুদ্ধে সরকারের সিদ্ধান্ত, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। শুধু আদ্-দ্বীনের ঘটনা নয়, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বর্তমান সরকার বেশ কিছু দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছে।

পল্লবীর সাত বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যার মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে ঢাকার একটি আদালত মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছে। মাত্র ছয় দিনের মধ্যে এই রায় বাংলাদেশে ন‍্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। গত ১৯শে মে সকালে পল্লবীর মিরপুর-১১ নম্বর এলাকায় নিজেদের বাসার পাশের ফ্ল্যাটের একটি কক্ষ থেকে রক্তাক্ত ও খণ্ডিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় শিশু রামিসার মৃতদেহ। এই রায় সারাদেশে শিশু হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনা কমাতে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

কিন্তু সব ক্ষেত্রে কি সরকার আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারছে? এই প্রশ্ন উঠেছে কারণ, হামে শিশু মৃত্যুর মিছিল যখন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে তখনও সরকার দায়িদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারছে না। হামে শিশু মৃত্যু ছয় শ পেরিয়ে গেছে আরও আগে। বাংলাদেশে এভাবে এতো শিশুর মৃত্যু আগে কখনও ঘটেনি। সবাই জানে, কেন এই মৃত্যু। এনিয়ে সব গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। হামে শিশু মৃত্যুর ঘটনা কোন স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, এটি বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সীমাহীন গাফিলতির একটি উদাহরণ মাত্র। ইউনিসেফের সংবাদ সম্মেলনে ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, ইউনিসেফ অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে লেখা অন্তত পাঁচটি চিঠিতে সম্ভাব্য টিকা–সংকটের কথা বলে সতর্ক করেছিল। তারা ১০টি মিটিংয়ে সরকারের কর্মকর্তাদের কাছে একই কথা জানিয়েছিল। ইউনিসেফ মনে করে, অন্তর্বর্তী সরকার টিকা ক্রয়প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনায় দেশে সময়মতো টিকা আসেনি। এটি প্রমাণ করে  এই শিশুদের আসলে হত্যা করা হয়েছে। যে হত্যার দায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা এবং তার স্বাস্থ্য উপদেষ্টার। 

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, স্বাস্থ্য মন্ত্রী, তথ্য উপদেষ্টা সবাই একাধিক বক্তৃতায় বলেছেন, সাবেক সরকারের অবহেলায় কারণে এই বিপর্যয় ঘটেছে। কিন্তু সরকার এখন পর্যন্ত, এই ঘটনায় একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করেনি।

অনেক অভিভাবক ও সচেতন নাগরিক, এনিয়ে মামলা দায়ের করার উদ্যোগ নেন কিন্তু তাদের মামলা আদালত গ্রহণ করেনি। সর্বশেষ এবিষয়ে মামলা করেছিলেন একজন জনপ্রতিনিধি। ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে মামলার আবেদন করেন কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল। হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায় ব্যর্থতা ও মৃত্যুর ঘটনায় সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুরজাহান বেগমসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের এই আবেদনটি খারিজ করে দেয়া হয়।

এর আগে, সারাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব ও শিশু মৃত্যুর ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বে ব্যর্থতা অনুসন্ধানে একটি ইনকোয়ারি কমিশন গঠন কেন করা হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট।

গত ১৯ মে জনস্বার্থে দায়ের করা এক রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে বিচারপতি রাজিক আল জলিল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরী সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রুল দিয়েছিলেন। রুলে কেবিনেট সচিব, স্বাস্থ্য সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, জনপ্রশাসন সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্টদের জবাব দিতে বলা হয়েছিল।

আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব। তিনি জানান, চলমান শিশু মৃত্যুর ঘটনায় কারা দায়ী এবং কেন রাষ্ট্র দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে তা অনুসন্ধানের জন্য একটি ইনকোয়ারি কমিশন গঠনের বিষয়ে রুল দিয়েছেন আদালত।

গত ১৭ মে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এম আশরাফুল ইসলাম হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় রিট আবেদন দায়ের করেন। রিটে হামের টিকা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বাইরে বেসরকারি খাতে দেওয়ার অভিযোগ তুলে তদন্ত কমিটি গঠন এবং তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসসহ উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চাওয়া হয়।
৬ এপ্রিল এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছে একটি আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু এসব রীটে এখনও কোন প্রতিকার পাওয়া যায়নি।

এসব অভিযোগের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনও সাড়া নেই। সরকারের পক্ষ থেকে এনিয়ে তদন্তে অনাগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কিন্তু কেন? বর্তমান সরকার হাম প্রতিরোধে সকল ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। এই মৃত্যুর দায় কোনভাবেই বর্তমান সরকারের ওপর বর্তায় না। তাহলে এক্ষেত্রে দোষীদের শাস্তির আওতায় আনতে বাধ্য কোথায়? হামে ছয় শতাধিক শিশুর মৃত্যুর ঘটনার সঠিক তদন্ত এবং দোষীদের বিচারের আওতায় না আনা হলে, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পিছিয়েই থাকবে।

অদিতি করিম, লেখক ও নাট্যকার
ইমেইল : [email protected]

ইসলামী ব্যাংকের আসল পরীক্ষা ব্যাংকটির নয়, রাষ্ট্রেরও

জাহিদ হোসেন, অর্থনীতিবিদ
ইসলামী ব্যাংকের আসল পরীক্ষা ব্যাংকটির নয়, রাষ্ট্রেরও
জাহিদ হোসেন

ইসলামী ব্যাংক এক দিনে সংকটে পড়েনি। সাম্প্রতিক ঘটনাবলি হয়তো সংকটকে দৃশ্যমান করেছে; কিন্তু এর শিকড় বহু বছরের। তাই বর্তমান পরিস্থিতি বোঝার জন্য আমাদের তাৎক্ষণিক ঘটনাপ্রবাহের বাইরে গিয়ে দেখতে হবে ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থান, শাসনব্যবস্থা এবং আমানতকারীদের আস্থার বিবর্তনকে।

প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক অভিমতে জাহিদ হোসেন লেখেন, গত কয়েক বছরে ইসলামী ব্যাংক ঘিরে যে অভিযোগগুলো সামনে এসেছে—অস্বাভাবিক মাত্রায় ঋণ কেন্দ্রীভূত হওয়া, সম্পদের প্রকৃত মান নিয়ে প্রশ্ন, ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ এবং বিপুল প্রভিশন ঘাটতি; সেগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা ছিল না। এগুলো ইঙ্গিত করছিল যে ব্যাংকটির আর্থিক ভিত্তি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। পরবর্তীকালে বিভিন্ন নিরীক্ষা ও তদারক কার্যক্রমে সেই দুর্বলতার আরও স্পষ্ট চিত্র সামনে আসে।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ব্যাংকটির মালিকানা ও পরিচালনার কাঠামোতে পরিবর্তন আসে। বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন বোর্ড নিয়োগ করে এবং ব্যাংকটির ওপর নিবিড় তদারকি শুরু হয়। একই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য–সহায়তা এবং নতুন ব্যবস্থাপনার অধীনে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরে আসে। আমানতকারীদের মধ্যে আস্থাও আংশিকভাবে পুনরুদ্ধার হয়। শাখাগুলোতে স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম আবার চালু হতে শুরু করে এবং দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছিল।

তবে এই স্থিতিশীলতাকে পূর্ণাঙ্গ পুনরুদ্ধার বলে ধরে নেওয়া ভুল হতো। কারণ, তারল্যসংকট সাময়িকভাবে মোকাবিলা করা গেলেও মূল সমস্যাগুলো তখনো রয়ে গিয়েছিল। একটি দুর্বল ব্যালান্স শিট, বিপুল অপ্রদর্শিত ক্ষতি এবং আস্থার ভঙ্গুর ভিত্তি ব্যাংকটিকে ঝুঁকির মধ্যে রেখেছিল।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে কয়েকটি ঘটনা নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়। আর্থিক খাতের নীতিগত দিকনির্দেশনা, নিয়ন্ত্রক কাঠামোর পরিবর্তন, শীর্ষ পর্যায়ে পদত্যাগ এবং নতুন নিয়োগ—এসব নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ও বিতর্ক দেখা দেয়। এসব সিদ্ধান্তের পক্ষে এবং বিপক্ষে যুক্তি থাকতেই পারে; কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এগুলো ব্যাংকের ভেতরে ও বাইরে কী ধরনের বার্তা পাঠিয়েছে।

ব্যাংকিং খাতে বাস্তবতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সম্পর্কে মানুষের ধারণা। কোনো ব্যাংকের আমানতকারীরা সাধারণত নিরীক্ষা প্রতিবেদন পড়ে সিদ্ধান্ত নেন না। তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন আস্থা, প্রত্যাশা ও নিরাপত্তাবোধের ভিত্তিতে। ফলে কোনো ব্যাংক সম্পর্কে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে তার প্রভাব দ্রুত তারল্যের ওপর পড়তে পারে।

ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রেও সম্ভবত সেটিই ঘটেছে। নির্বাচন-পরবর্তী কিছু পদক্ষেপ ব্যাংকের ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা ও স্বাধীনতা নিয়ে আমানতকারীদের একাংশের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। সেই উদ্বেগের সঙ্গে যুক্ত হয় গুজব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা তথ্য এবং ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার খবর। ফলাফল ছিল—বিশাল অঙ্কের আমানত উত্তোলন এবং তারল্যের ওপর নতুন চাপ।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। বর্তমান সংকটের জন্য কোনো একক ঘটনা বা কোনো একক সিদ্ধান্তকে দায়ী করা কঠিন। একটি শক্তিশালী ও সুস্থ ব্যাংক সাধারণত বিতর্কিত নিয়োগ বা রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা সামাল দিতে পারে। ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে সমস্যা হলো ব্যাংকটি এমন ধাক্কা সামলানোর মতো অবস্থায় ছিল না। দীর্ঘদিনের আর্থিক দুর্বলতা তাকে একটি আস্থার সংকটের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল করে তুলেছিল।

এ কারণেই বর্তমান পরিস্থিতিকে কেবল রাজনৈতিক বা আর্থিক সংকট হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি মূলত একটি আর্থিকভাবে দুর্বল প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থার সংকটের অভিঘাত; আর এই দুই উপাদান—আর্থিক দুর্বলতা ও আস্থার অবক্ষয় পরস্পরকে শক্তিশালী করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক হস্তক্ষেপ সেই বাস্তবতারই স্বীকৃতি। বোর্ড বিলুপ্ত করে প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত মূলত একটি বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছে যে নিয়ন্ত্রক সংস্থা পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে এবং আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় সক্রিয় রয়েছে। স্বল্প মেয়াদে এটি পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে সাহায্য করতে পারে; কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে এটি কোনো সমাধান নয়।

কারণ, এখানেই সামনে আসে আরও কঠিন প্রশ্ন—এই পুনর্গঠনের কাজটি করবে কে?

প্রশাসক তারল্যসংকট মোকাবিলা করতে পারেন, দৈনন্দিন কার্যক্রম সচল রাখতে পারেন এবং পরিস্থিতির আরও অবনতি থেকে রক্ষা করতে পারেন; কিন্তু কোনো প্রশাসক দীর্ঘমেয়াদি অর্থে একটি ব্যাংক পুনর্গঠন করতে পারেন না। একটি ব্যাংকের পুনরুদ্ধারের জন্য দরকার মূলধন পুনর্গঠনের পরিকল্পনা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সংস্কার, ঋণশৃঙ্খলার পুনঃপ্রতিষ্ঠা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং বিশ্বাসযোগ্য শাসনব্যবস্থা। এগুলো এমন কাজ, যার জন্য একটি সক্ষম ও স্বাধীন পরিচালনা পর্ষদের প্রয়োজন। প্রশাসক আগুন নেভাতে পারেন; কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠান পুনর্নির্মাণের জন্য প্রয়োজন স্থপতি।

সমস্যা হলো—যে পরিবেশে এমন একটি বোর্ড সবচেয়ে বেশি দরকার, সেই পরিবেশই যোগ্য ও সুনামসম্পন্ন ব্যক্তিদের অংশগ্রহণকে সবচেয়ে বেশি নিরুৎসাহিত করে। বহু বছর ধরে বিতর্ক, রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও নানা ধরনের স্বার্থ সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা একটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নিতে স্বাভাবিকভাবেই অনেকে অনাগ্রহী থাকবেন। কারণ, সেখানে শুধু একটি দুর্বল ব্যালান্স শিটের দায় নয়, একটি জটিল উত্তরাধিকারও বহন করতে হয়। বোর্ডে যোগ দেওয়া মানে শুধু আর্থিক পুনর্গঠনের দায়িত্ব নেওয়া নয়; অনেক ক্ষেত্রে তা হয়ে ওঠে একটি গভীরভাবে বিভক্ত ও অবিশ্বাসপূর্ণ পরিবেশে কাজ করার চ্যালেঞ্জ। ফলে একটি দুষ্টচক্র তৈরি হয়। ব্যাংকটিকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও পেশাদার ভিত্তিতে পরিচালনা করার জন্য দরকার বিশ্বাসযোগ্য শাসনব্যবস্থা; কিন্তু সেই বিশ্বাসযোগ্য শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে আবার এমন একটি পরিবেশ প্রয়োজন, যেখানে পেশাদার সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা হবে না। পুনর্গঠনের প্রযুক্তিগত পথ মোটামুটি পরিষ্কার; কঠিন হলো সেই রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে সেই পথ অনুসরণ করা সম্ভব।

এ কারণেই ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান সংকট শেষ পর্যন্ত শুধু একটি ব্যাংকের সংকট নয়, এটি রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতারও পরীক্ষা। নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ কি যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্যতা সৃষ্টি করতে পারবে? রাজনৈতিক নেতৃত্ব কি পুনর্গঠনের প্রক্রিয়াকে প্রয়োজনীয় সময় ও স্বাধীনতা দেবে; এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—আমানতকারীরা কি বিশ্বাস করতে পারবেন যে ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ পেশাদার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে, প্রতিদ্বন্দ্বী স্বার্থগোষ্ঠীর প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নয়?

ইসলামী ব্যাংক শুধু একটি ব্যাংক নয়; এটি দেশের অন্যতম বৃহৎ আমানত গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে লাখ লাখ গ্রাহক, অসংখ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং পুরো ইসলামী ব্যাংকিং খাতের প্রতি জনসাধারণের আস্থা। ফলে এর সংকট দীর্ঘায়িত হলে প্রভাব একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না–ও থাকতে পারে। আস্থার সংকটের প্রকৃতি হলো এটি এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়তে পারে; বিশেষত যখন জনগণের মনে প্রশ্ন জাগে যে সমস্যাটি কি একটি ব্যাংকের, নাকি শাসনব্যবস্থার।

এখানেই বর্তমান সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিহিত। একটি ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠান বহু বছর আর্থিক দুর্বলতা নিয়ে টিকে থাকতে পারে, যদি মানুষ বিশ্বাস করে যে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা হচ্ছে; কিন্তু যখন সেই বিশ্বাস নড়বড়ে হয়ে যায়, তখন সংকট শুধু ব্যালান্স শিটে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা আস্থার সংকটে রূপ নেয়।

সুতরাং আজকের প্রশ্ন কেবল ইসলামী ব্যাংককে কীভাবে বাঁচানো যায়, তা নয়। প্রশ্ন হলো বাংলাদেশ কি এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ তৈরি করতে পারবে, যেখানে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বিষয় না হয়ে পেশাদার সক্ষমতা ও জবাবদিহির বিষয় হবে?

কারণ, ইসলামী ব্যাংকের ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত শুধু তার ব্যালান্স শিট দ্বারা নির্ধারিত হবে না, তা নির্ধারিত হবে এই প্রশ্নের উত্তরে—রাষ্ট্র কি নিজেকে যথেষ্ট সংযত রাখতে পারবে, যাতে প্রতিষ্ঠানগুলো সুস্থ হওয়ার সুযোগ পায়? যদি না পারে, তাহলে পরবর্তী সংকটও হয়তো কোনো হিসাবপত্র থেকে আসবে না। সেটিও আসবে আস্থার অবক্ষয় থেকে, একটি সংকেতের মাধ্যমে।

লেখক : বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ

সীমান্তে পুশ ইন প্রতিরোধে বিজিবির দৃঢ় অবস্থান

এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান
সীমান্তে পুশ ইন প্রতিরোধে বিজিবির দৃঢ় অবস্থান
সংগৃহীত ছবি

জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার রামরামপুর সীমান্ত। সম্প্রতি অবৈধ পুশ ইন চেষ্টা ঠেকানোর সময় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) নির্দেশ দিয়েছিল গুলির। বিজিবির এক সদস্যের পাল্টা হুঁশিয়ারি ছিল এমন—‘আপনি গুলি করলে আমি বসে থাকব? আমার কাছে গুলি নেই?’ বিজিবি সদস্যের এমন উচ্চারণই যেন স্পষ্ট করে তুলেছে দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সীমান্ত রক্ষায় নিজেদের ইস্পাত কঠিন মানসিকতাকে, যা অনুরণিত হচ্ছে সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরীদের কণ্ঠে কণ্ঠে। ছাড় দিচ্ছে না এক কদমও। 

প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটার স্থলসীমান্তে বিএসএফের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে কথা বলছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। মহাপরিচালকের দৃঢ় ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বিজিবির অকুতোভয় সদস্যরা নস্যাৎ করে দিচ্ছে বিএসএফের অবৈধ পুশ ইন অপচেষ্টাকে। এখন পর্যন্ত গত এক মাসে ৬০০টি অবৈধ পুশ ইন চেষ্টা সফল হতে দেয়নি বিজিবি। 

বিজিবির সঙ্গে একতাবদ্ধ হয়ে সীমান্ত পাহারা দিচ্ছে শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে জুওয়ান-বুড়োরাও। অবৈধ পুশ ইন প্রতিরোধে গাছের মগডালে ওঠে নজরদারি করছে শিশু-কিশোররা। এমন ভিডিও-ছবি ভাইরাল হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। বিএসএফের পুশ ইন চেষ্টার বিপরীতে বিজিবির কঠোর অবস্থানের সঙ্গে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছেন সীমান্তবাসীরাও।

বিজিবির দৃঢ়তার ফলেই কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুরে বিএসএফের পুশ ইনের চেষ্টার তিন দিন পর সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থান করা নারী-শিশুসহ ১২ জনকে গত সোমবার (১৫ জুন) ফেরত নিতে বাধ্য হয়েছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী। প্রতিটি সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্ক বিজিবি। বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারিও। জোরদার করা হয়েছে টহল ও অপারেশনাল কার্যক্রম। সীমান্ত সুরক্ষায় ক্ষিপ্র ও তৎপর রয়েছে তারা। রাতের নিরাপত্তায় ব্যবহার করা হচ্ছে থার্মাল ও ইনফ্রারেড ড্রোন।

চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকেই বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকীর দিকনির্দেশনায় সীমান্তবাসীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ বুকে বুক মিলিয়ে সীমান্তকে সুরক্ষিত করেছে বিজিবি। সীমান্ত হত্যা, পুশ ইন, কাঁটাতার স্থাপন, মাদক ও মানবপাচার প্রতিহত করা, দক্ষিণ-পূর্বে মায়ানমার সীমান্তের অস্থিতিশীলতা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নতুন উদ্দীপনায় রুখে দাঁড়াতে দেশপ্রেমে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ এক বিজিবিকে দেখেছে দেশের মানুষ। গত মে মাস থেকে সীমান্তের বিভিন্ন অংশ দিয়ে বিএসএফের অব্যাহতভাবে লোকজনকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অবৈধভাবে ঠেলে পাঠানোর বা পুশ ইন চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। একবারের জন্যও বিজিবি পিঠ দেখায়নি, বুক দেখাচ্ছে। জনআকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশার নতুন টোনে কথা বলছে, বিএসএফকে মোকাবেলা করেছে।পুশ ইন নিয়ে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই এবার দিল্লিতে চার দিনব্যাপী সীমান্ত সম্মেলনে বসেছিল বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি ও বিএসএফের। মহাপরিচালক পর্যায়ের ৫৭তম সীমান্ত সম্মেলনে আলোচনায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেয়েছে পুশ ইন ও সীমান্ত হত্যার বিষয়টি। বিজিবি মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী বিএসএফের মহাপরিচালক প্রবীণ কুমারকে পুশ ইন বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। সীমান্ত এলাকায় হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনার জন্য বিএসএফ ডিজিকে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্যও তিনি বলেছেন। সম্মেলনে উভয় পক্ষের গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহের সারসংক্ষেপ সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমেও জানিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।

কিন্তু এরপরও সম্মেলনে বিজিবির অবস্থান নিয়ে অনুমাননির্ভর তথ্য, বিশ্লেষণ ও মন্তব্য উপস্থাপনের মাধ্যমে সীমান্তরক্ষী বাহিনীটিকে নিয়ে গোলমাল পাকানোর ট্রায়াল রান শুরু হয়েছে। বেশ কিছু বিষয়ে জেনে-শুনে অসত্য, মিথ্যা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বয়ানকে ‘অলটারনেটিভ ফ্যাক্টস’ বা ‘বিকল্প তথ্য’ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। বাস্তবতাকে অস্বীকার করার পরিবর্তে একটি মিথ্যাকে গ্রহণযোগ্যরূপে প্রতিষ্ঠিত করার কসরত বিরাজমান। সত্যাসত্য বিচার-বিশ্লেষণ না করে অনেকেই আবার গুজবের ঢোল বাজাচ্ছেন। বর্তমান বাস্তবতায় মাথা নত না করে সাহসের সঙ্গে মুখোমুখি দাঁড়ানোর সময়টিতে এমন ভয়াবহ প্রবণতা সচেতনদেরও নিমজ্জিত করছে চরম বিষাদে। 

বিজিবির প্রেস উইং জানিয়েছে, মহাপরিচালক পর্যায়ের এই সম্মেলনে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ৩১টি এবং ভারতের পক্ষ থেকে ২১টি এজেন্ডা উপস্থাপন করা হয়েছে। এসব এজেন্ডাসমূহের ওপর অনুষ্ঠিত আলোচনার ভিত্তিতে গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহের প্রামাণিক দলিল ‘জয়েন্ট রেকর্ড অব ডিসকাশনস’ (জেআরডি) বিজিবি ও বিএসএফ মহাপরিচালক স্বাক্ষর করেছেন। তবুও দেখা গেলো, সীমান্ত হত্যাকে বিজিবি ডিজি সীমান্তে সংঘটিত মৃত্যু বলে উল্লেখ করেছেন এমন কথায় বিষ ছড়ানো হচ্ছে। অথচ মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক দলিল যা জয়েন্ট রেকর্ড অব ডিসকাশনস (জেআরডি) নামে পরিচিত সেখানে কিন্তু ‘বর্ডার কিলিং’ শব্দটিই ব্যবহার করা হয়েছে। কোনো রকম শৈথিল্য প্রদর্শন করে বিজিবি নিজেদের শক্ত অবস্থান থেকে সরে আসেনি। 

পুশইন, সীমান্ত হত্যা, আন্তর্জাতিক সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে অবৈধ অবকাঠামো নির্মাণ, মাদক চোরাচালান, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং পার্বত্য অঞ্চলের সশস্ত্র গোষ্ঠীর কার্যক্রম নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগ টু দ্য পয়েন্টে আলোচিত হয়েছে, জেআরডিতেও নথিবদ্ধ রয়েছে। এসব বিষয়বস্তুর সত্যতা সোমবার (১৫ জুন) প্রথম দফায় বিজিবির অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে ও পরবর্তীতে সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে পুনরায় দাবি করা হয়েছে। বিশেষ করে সীমান্তে বিজিবি বুক চিতিয়ে লড়াইয়ের মাধ্যমে যেখানে দেশের সাধারণ মানুষের আস্থা-বিশ্বাসের ভিত্তিকে সুসংহত করছে ঠিক তখন অবান্তর-অবাস্তব বিষয়কে মূল উপজীব্য করে বাহিনীর নেতৃত্বকে কলঙ্কিত করার অপচেষ্টায় নতুন করে হাইপ উঠানো হচ্ছে। 

আলোচিত-সমালোচনা হচ্ছে ‘পজিশন পেপার’ বিনিময় নিয়েও। সত্য-মিথ্যা মাপার থার্মোমিটারেও যেন গলদ ধরা পড়েছে। কারও কারও হয়তো জানা নেই, মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকের আগে উভয় পক্ষের মধ্যে আলোচ্য বিষয় ও এজেন্ডা পয়েন্টের শুধুমাত্র শিরোনাম বিনিময় নতুন নয়। এটি পুরোনো, প্রচলিত ও প্রতিষ্ঠিত একটি প্রক্রিয়া। এর সঙ্গে ‘গোপন তথ্য ফাঁস’ বা ‘নিরাপত্তা ব্যত্যয়’ এর বিষয়টি সংগতিপূর্ণ নয় মোটেও।

বিজিবির মতো বিএসএফও গত ১৪ মে অর্থাৎ বৈঠকের প্রায় একমাস পূর্বে তাদের এজেন্ডা পয়েন্টসমূহ বিজিবি সদর দপ্তরে প্রেরণের পর তাঁরা সেটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। এখন কোনো উদ্দেশে বিভ্রান্তিকর ও একপক্ষীয় মন্তব্যে বিষয়টিকে ফোকাস করা হচ্ছে সে নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে। শুধু তাই নয়, আয়োজক দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাধারণত দেশটিতে সফররত বাহিনী প্রধানের সৌজন্য সাক্ষাতের রীতি বা প্রথা দীর্ঘদিনের। বিজিবি-বিএসএফ সম্মেলনে সবসময়ই এই প্রথা বা রেওয়াজ চালু রয়েছে। স্বাভাবিক কূটনৈতিক রীতি অনুসরণ করেই বিজিবি মহাপরিচালক দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। 

গত বছর বিজিবি যখন ঢাকায় ৫৬তম সম্মেলনের আয়োজক ছিল তখন অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর সঙ্গে বিএসএফ মহাপরিচালক দালজিৎ সিং চৌধুরী সাক্ষাৎ করেন। তখন এ নিয়ে কোনো হৈচৈ হয়নি। কূটনৈতিক রীতি মেনেই এ ধরনের সাক্ষাতের বিষয়টি আগে থেকেই নির্ধারিত হয়। সরকারের অনুমতির পরই আয়োজক দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে অতিথি দেশের বাহিনীপ্রধান সাক্ষাৎ করেন। যেখানে বিজিবি ও বিএসএফের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ’র সঙ্গে বিজিবির প্রতিনিধি দলের সাক্ষাতেও বিজিবি মহাপরিচালক সীমান্ত হত্যা ও পুশ ইন বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে নিজেদের দৃঢ় অবস্থান তুলে ধরেন। ঠিক যেন জানান দিয়েছেন, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব অখণ্ড, এই মাটি কারো দয়ার বিষয় নয়।

সীমান্তে দিন-রাত অতন্দ্র পাহারায় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অবিচল বিজিবি। সুগভীর দেশপ্রেম, সততা, বুদ্ধিমত্তা, নির্ভরযোগ্যতা, আনুগত্য, তেজ ও উদ্দীপনাই এই বাহিনীর শৃঙ্খলা ও পেশাগত দক্ষতার মাপকাঠি। সামরিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরাও মনে করেন, এখন বিভাজনের সময় নয়। অপতথ্যে বিজিবি সদস্যদের মনোবল নষ্ট করার পরিবর্তে উৎসাহ দিয়ে তাদের পাশে দাঁড়ালে দেশের জন্য মঙ্গল হবে। ধৈর্য ও বিচক্ষণতা এই সময়ে যেমন কাম্য তেমনি সীমান্ত নিরাপত্তার বিষয়ে প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্বশীল ভূমিকা জাতীয় স্বার্থেই সময়ের সুতীব্র প্রয়োজন।

লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক সন্ধানী বার্তা; অ্যাকটিং এডিটর, কালের আলো.কম।

লোকসংখ্যা বাড়ছে, মানুষ বাড়ছে না | কালের কণ্ঠ