ফেসবুক পেজে অর্ডার নেওয়া, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসে (এমএফএস) মূল্য পরিশোধ এবং কুরিয়ারের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলায় ডেলিভারি দেওয়া হতো সিসা। এভাবেই গড়ে উঠেছিল অনলাইনভিত্তিক একটি সংঘবদ্ধ সিসা বাণিজ্য চক্র। এ ঘটনায় যমজ দুই ভাইসহ চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
শুক্রবার (৩ জুলাই) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (গোয়েন্দা) মোহাম্মদ বদরুদ্দীন।
গ্রেপ্তার যমজ দুই ভাই হলেন আহমেদ শরীফি (৩৪) ও মেহদাদ শরীফি (৩৪)। অপর ব্যক্তির নাম মো. মাকসুদ আলম (৪০)। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর একাধিক এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় ভাটারা থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা হয়েছে।
জানা গেছে, অভিযানে উদ্ধার হয়েছে ৬৫ কেজি ৯০০ গ্রাম সিসা, ৪১টি হুক্কাসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম। ডিএনসির দাবি, দেশের ইতিহাসে এক অভিযানে এটিই সর্বোচ্চ পরিমাণ সিসা উদ্ধারের ঘটনা।
মোহাম্মদ বদরুদ্দীন বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আহমেদ শরীফি ও মেহদাদ শরীফির মা-বাবা ইরানের নাগরিক। ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে তাদের মা-বাবা বাংলাদেশে আসেন এবং বাংলাদেশেই এই দুই ভাইয়ের জন্ম। ইরানে তাদের যাওয়া-আসা থাকায় সেখান থেকে তারা সিসা কারবারের পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা নেন। বাংলাদেশে ফিরে তারা ফেসবুকে পেজের মাধ্যমে কারবারের নেটওয়ার্ক গড়েন। ধীরে ধীরে বিভিন্ন জেলায় কার্যক্রম বিস্তৃত করেন।
গ্রেপ্তারের বর্ণনা দিয়ে তিনি বদরুদ্দীন বলেন, দুই ভাইয়ের নেতৃত্বে চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে একটি ফেসবুক পেজের মাধ্যমে ঢাকাসহ সারা দেশে অনলাইনে সিসা ও সিসা সেবনের উপকরণ সরবরাহ করে আসছে। বৃহস্পতিবার রাজধানীর ভাটারা এলাকায় প্রথম অভিযানে ওই ফেসবুক পেজের নামে পাঠানো ১ কেজি সিসাসহ একটি পার্সেল জব্দ করা হয়। একই দিনে মালিবাগ থেকে একই পেজের নামে পাঠানো আরো ১ কেজি সিসার পার্সেল জব্দ করা হয়। জব্দ পার্সেল দুটির প্রেরক-ঠিকানা যাচাই করে কালাচাঁদপুরে একটি ফ্ল্যাট থেকে মূল অভিযুক্ত দুই ভাইকে আটক করা হয়। তাদের ফ্ল্যাট তল্লাশি করে ৪৫ কেজি ৯০০ গ্রাম সিসা এবং ২০টি হুক্কা জব্দ করা হয়।
আটক দুই ভাইয়ের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ডিএনসি জানতে পারে, তাদের সরবরাহ করা সিসার একটি বড় অংশ আসত মাকসুদ আলমের কাছ থেকে। পরে ওই রাতে নূরেরচালা থেকে তাকে আটক করা হয়। পরবর্তীতে মাকসুদের বাসা তল্লাশি করে আরো ১৮ কেজি শিশা ও ২১টি হুক্কা জব্দ করা হয়। চার স্থান থেকে মোট ৬৫ কেজি ৯০০ গ্রাম সিসা, ৪১টি হুক্কা, ৪০ কেজি সিসা সেবনের কয়লা এবং মাদক কারবারের কাজে ব্যবহৃত ৫টি মোবাইলফোন জব্দ করা হয়।
শিশার কারবার ও অর্থ গ্রহণ যেভাবে
ডিএনসি জানায়, গ্রেপ্তার দুই ভাই ফেসবুক পেজের মাধ্যমে গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ, পণ্যের ছবি প্রকাশ, অর্ডার গ্রহণ, মূল্য নির্ধারণ এবং ডেলিভারির সমন্বয় করতেন। অর্ডার নিশ্চিত হওয়ার পর কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে পার্সেল পাঠানো হতো।
ডিএনসি কর্মকর্তা মোহাম্মদ বদরুদ্দীন বলেন, চক্রটি মূলত বিভিন্ন মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ব্যবহার করে পণ্যের মূল্য গ্রহণ করত। বিভিন্ন ব্যক্তির নামে নিবন্ধিত একাধিক মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে তারা অর্থ সংগ্রহ করত, যাতে প্রকৃত লেনদেনের উৎস ও সুবিধাভোগীদের পরিচয় গোপন রাখা যায়। ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে এসব আর্থিক লেনদেন, সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট এবং অর্থের প্রবাহ যাচাই করা হচ্ছে।
বিপুলসংখ্যক ক্রেতার তথ্য
মোহাম্মদ বদরুদ্দীন বলেন, অভিযানে জব্দ করা মোবাইলফোন, ডিজিটাল ডিভাইস এবং অনলাইন অ্যাকাউন্ট থেকে আমরা একটি বিস্তৃত গ্রাহক ডাটাবেস উদ্ধার করেছি। এতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলার অসংখ্য ক্রেতার তথ্য, যোগাযোগের ইতিহাস, অর্ডারের বিবরণ এবং লেনদেনসংক্রান্ত তথ্য পাওয়া গেছে। উদ্ধার করা তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিয়মিত ক্রেতা, পরিবেশক, সহযোগী এবং এই নেটওয়ার্কের অন্যান্য সদস্যদের শনাক্তের কাজ চলছে।









