হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার জনগুরুত্বপূর্ণ নবীগঞ্জ-কাজির বাজার সড়কটি আজ উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি আর দীর্ঘশ্রুত অবহেলার এক ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়েছে। একসময়ের সহজ চলাচলের এই পথটি বর্তমানে পিচঢালা কোনো সড়ক নয়, বরং যেন শত শত খানাখন্দে ঘেরা এক মৃত্যুফাঁদ। সংস্কারহীনতার দীর্ঘসূত্রতায় সড়কটি এখন হাজারো মানুষের যাতায়াতের প্রধান প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় জনপদ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে, আর জনদুর্ভোগ পৌঁছেছে চরম সীমায়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সড়কের প্রশস্ততা কম নয়, কিন্তু এর বর্তমান রূপ বড্ড বিভীষিকাময়। পিচ, কার্পেটিং ও খোয়া উঠে গিয়ে সড়কের বুক চিরে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য ছোট-বড় গর্ত। সামান্য বৃষ্টিতেই এসব গর্তে জমে যায় কাদা-পানি, যা পথচারী ও চালকদের কাছে বিষাক্ত এক গোলকধাঁধার মতো। সিএনজি অটোরিকশা, ইজিবাইক থেকে শুরু করে মালবাহী ট্রাক—সব ধরনের যানই এখন এখানে এসে থমকে দাঁড়াচ্ছে। দিনের আলোয় যা কিছুটা এড়ানো সম্ভব হলেও রাতের অন্ধকারে তা হয়ে ওঠে দুর্ঘটনার প্রধান উৎস। প্রতিনিয়ত উল্টে যাচ্ছে ছোট যানবাহন, বিকল হচ্ছে মালবাহী ট্রাক। চাকা ভেঙে যাওয়া কিংবা অ্যাক্সেল ভেঙে যাওয়ার ঘটনা এখানে নিত্যদিনের চিত্র। এই সড়কের ওপর নির্ভরশীল স্থানীয় কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা আজ সবচেয়ে বেশি অসহায়। কৃষি পণ্য বাজারজাত করতে গিয়ে একদিকে পরিবহন খরচ বাড়ছে কয়েক গুণ, অন্যদিকে সময়মতো পণ্য বাজারে পৌঁছাতে না পেরে গুনতে হচ্ছে লোকসান।
স্থানীয় এক ব্যবসায়ী আক্ষেপ করে বলেন, ‘সড়কটির করুণ দশা আমাদের ব্যবসায়িক মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে। মালবাহী গাড়িগুলো এই রাস্তায় আসতে চায় না, আর এলেও ভাড়া দিতে হয় দ্বিগুণ। এই দুর্ভোগের শেষ কোথায়, তা আমরা জানি না।’ ভুক্তভোগী যাত্রী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সড়ক সংস্কারের দাবিতে স্থানীয় পর্যায়ে বারবার গুঞ্জন উঠলেও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের টনক নড়ছে না। প্রশাসনিক উদাসীনতা আর তদারকির অভাবে উন্নয়নের বরাদ্দ যেন এই সড়কের বেহাল দশা দেখেও দেখছে না। এলাকার স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে জরুরি প্রয়োজনে হাসপাতালে যাতায়াতকারী রোগী—সবাইকে এই মরণফাঁদ পাড়ি দিয়েই গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়। মুমূর্ষু রোগীদের নিয়ে চলাচলের সময় সড়কের ঝাঁকুনিতে তাদের অবস্থা আরও নাজুক হয়ে পড়ে, যা এক মানবিক বিপর্যয়ের শামিল।
স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, কেবল তালি দিয়ে সংস্কার বা দায়সারা মেরামতের দিন শেষ হয়েছে। সড়কটি টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন আধুনিক প্রকৌশলগত সমাধান ও কঠোর মনিটরিং। তারা মনে করেন, প্রশাসন যদি এখনই উদ্যোগী না হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে এখানে বড় ধরনের প্রাণহানির মতো ঘটনা ঘটে যাওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
ইতিমধ্যেই স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন, আর কোনো আশ্বাস নয়, তারা এখন সড়কের পূর্ণাঙ্গ সংস্কার ও এর স্থায়ী সমাধান চান। সড়কটি কি ফের চলাচলের উপযোগী হবে, নাকি অবহেলার এই অভিশপ্ত তকমা নিয়ে এটি আরও দীর্ঘ সময় ‘মরণফাঁদ’ হয়েই টিকে থাকবে—এখন সেই উত্তর খুঁজছেন নবীগঞ্জ ও কাজীগঞ্জের হাজারো মানুষ। দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের কাছে এলাকাবাসীর আকুতি একটাই—মানুষের জীবনের মূল্য কোনো প্রকল্পের চেয়ে কম নয়, তাই দ্রুত সংস্কারকাজ শুরু করে এই দুর্গম যাতায়াতের অবসান ঘটানো হোক।