যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান শান্তি আলোচনায় ইতিবাচক অগ্রগতির জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম ফের বেড়েছে। এর মধ্য দিয়ে টানা তিন কার্যদিবস ধরে চলা দরপতনের অবসান ঘটল। সোমবার (২২ জুন) বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম কমে যাওয়ার বিষয়টিকে সোনার দাম বাড়ার পেছনে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। তবে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) কঠোর মুদ্রানীতির কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এখনো এক ধরনের অস্থিরতা কাজ করছে।
বাজারের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট গোল্ডের দাম ১ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ২০৮ দশমিক ৫৮ ডলারে পৌঁছায়। এর আগে গত শুক্রবার ধাতুটির দাম গত ১১ জুনের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গিয়েছিল। অন্যদিকে, আগস্টে সরবরাহের চুক্তিতে মার্কিন সোনার ফিউচার বা ভবিষ্যৎ সরবরাহ মূল্য শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ কমে ৪ হাজার ২২৬ দশমিক ৯০ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
স্বাধীন বাজার বিশ্লেষক রস নরম্যান বলেন, ‘তেল বাজার থেকে বিনিয়োগকারীরা গরম টাকা তুলে নিয়ে পুনরায় সোনার বাজারে খাটানোর কারণে সোনা এই মুহূর্তে কিছুটা সুবিধা পাচ্ছে।’
খবরে বলা হয়েছে, সুইজারল্যান্ডে সোমবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের প্রথম দফার বৈঠক শেষ হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম প্রেস টিভির বরাত দিয়ে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, আলোচনায় বেশ ভালো অগ্রগতি হয়েছে। গত এপ্রিলে দুই দেশের মধ্যে সম্মত হওয়া একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও অন্তত ৬০ দিন বাড়ানোর লক্ষ্যে গত সপ্তাহে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এরপরই এই দুই দেশ আনুষ্ঠানিক আলোচনায় বসল।
দুই দেশের এই ইতিবাচক আলোচনার খবর সামনে আসার পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমে যায়। লন্ডনের বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রায় ২ শতাংশ হ্রাস পায়।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দামের তীব্র বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছিল, যা মূলত কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সুদহার বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে জোরালো করে। সাধারণত সুদের হার বাড়লে সোনার আকর্ষণ কমে যায়, কারণ সোনা থেকে কোনো নিশ্চিত লভ্যাংশ বা সুদ পাওয়া যায় না।
রস নরম্যান আরো জানান, সোনার বাজার এখনই পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়িয়েছে—এমনটা বলার সময় এখনো আসেনি, বিশেষ করে ফেডারেল রিজার্ভ যেখানে তাদের কঠোর অবস্থান বজায় রাখছে।
গত সপ্তাহে এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ারশ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে দৃঢ় অবস্থানের কথা জানান। তবে ঠিক কী ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হলে সুদহার বৃদ্ধি পেছানো হতে পারে, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কোনো আভাস দেননি। তার এই বক্তব্য বাজারে এই ধারণাকে আরও পোক্ত করেছে যে, নিকট ভবিষ্যতেই সুদের হার বাড়তে পারে। সিএমই ফেডওয়াচ টুলের তথ্য অনুযায়ী, ব্যবসায়ীরা এখন আগামী ডিসেম্বরে সুদহার বৃদ্ধির সম্ভাবনা ৮৯ শতাংশ মনে করছেন, যা ফেডের বৈঠকের আগে ছিল ৬১ শতাংশ।
মার্কিন বহুজাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক মর্গ্যান স্ট্যানলির বিশ্লেষকরা এক পূর্বাভাসে জানিয়েছেন, ‘আমরা সোনার দাম বৃদ্ধির সম্ভাবনার পক্ষেই আছি। তবে ২০২৬ সালের দ্বিতীয় ভাগে সোনার দাম প্রতি আউন্স ৫ হাজার ২০০ ডলারে পৌঁছানো এখন মূলত গোল্ড ইটিএফ-এ নতুন করে বিনিয়োগ এবং তেলের কম দাম কীভাবে সুদের হারের পূর্বাভাসকে প্রভাবিত করে, তার ওপর নির্ভর করছে।’
এদিকে, আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম বাড়লেও যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে অস্থিরতার কারণে ব্রিটিশ পাউন্ডের মান কিছুটা কমে গেছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার পর পাউন্ডের এই দরপতন ঘটে।
সোনার পাশাপাশি অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর বাজারও সোমবার ছিল চাঙ্গা। স্পট সিলভারের (রুপা) দাম ২ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৬৬ দশমিক ৪১ ডলার হয়েছে। এছাড়া প্ল্যাটিনামের দাম শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৬৭৮ দশমিক ১৯ ডলারে দাঁড়িয়েছে এবং প্যালাডিয়ামের দাম ১ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ২৭৪ ডলার।
দেশের বাজারে ভ্যাটসহ প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) ২২ ক্যারেটের স্বর্ণের দাম পড়বে ২ লাখ ৩০ হাজার ৭৭২ টাকা। এছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ২০ হাজার ৩৯১ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ১ লাখ ৮৯ হাজার ২৪৮ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ১ লাখ ৫৪ হাজার ৬০৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এদিকে বর্তমানে ২২ ক্যারেটের এক ভরি রুপা বিক্রি হচ্ছে ৫ হাজার ২৪৯ টাকায়। এছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ৫ হাজার ১৬ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ৪ হাজার ২৫৭ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি রুপা ৩ হাজার ২০৮ টাকায় বেচাকেনা হচ্ছে।




