• ই-পেপার

আশুরার দিনে শুক্রবারই কি কিয়ামত সংঘটিত হবে?

সুন্দর উপদেশ মানুষকে বিনয়ী হতে সাহায্য করে

ইসলামী জীবন ডেস্ক
সুন্দর উপদেশ মানুষকে বিনয়ী হতে সাহায্য করে
সংগৃহীত ছবি

সুন্দর উপদেশ (মাওয়িজাহ হাসানাহ) মানুষের হৃদয়কে জাগ্রত করার, গাফিলতি থেকে সতর্ক করার এবং অন্তরের সংশোধন ও রোগ নিরাময়ের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। এটি সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করার সেই মহান দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত, যেখানে উৎসাহ ও সতর্কতার মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করা হয় এবং কল্যাণকর নসিহত করা হয়। এর ফলস্বরূপ হৃদয় কোমল হয়, অন্তর বিনয়ী হয়, মানুষ ভয়াবহ পরিণতি থেকে মুক্তি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় এবং কাঙ্ক্ষিত কল্যাণ লাভের আশায় সৎকর্মের দিকে অগ্রসর হয়।

সুন্দর উপদেশ দুইভাবে গ্রহণ করা যায়-

প্রথমত, শ্রবণের মাধ্যমে অর্থাৎ হেদায়েত, সঠিক পথ ও কল্যাণকর নসিহত শোনা, পড়া ও তিলাওয়াতের মাধ্যমে উপকৃত হওয়া, যা নবী-রাসুলদের বাণী এবং তাঁদের প্রতি তাঁদের রবের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ ওহির মাধ্যমে এসেছে। একইভাবে দ্বিন ও দুনিয়ার কল্যাণে প্রত্যেক সৎ উপদেশদাতা ও পথ প্রদর্শকের কাছ থেকেও উপকৃত হওয়া।

দ্বিতীয়ত, পর্যবেক্ষণ ও শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে অর্থাৎ পৃথিবীর বিভিন্ন নিদর্শন, ঘটনা, অভিজ্ঞতা, পরিস্থিতি, তাকদিরের বিধান এবং বিশ্বজগতের ওপর আল্লাহর প্রতিষ্ঠিত নিয়মগুলো দেখে চিন্তা-ভাবনা করা ও শিক্ষা গ্রহণ করা।

হৃদয়ের জন্য উপদেশের প্রয়োজনীয়তা জ্ঞান ও শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার চেয়ে কম নয়; বরং এটি জ্ঞান অর্জনের পথকে সহজ করে দেয়। যখন হৃদয় কোমল হয়, তখন তা উপকারী জ্ঞান গ্রহণের জন্য প্রস্তুত হয়ে ওঠে। ফলে আত্মা প্রশান্তি লাভ করে, মন শান্ত হয়, বিবেক পুষ্ট হয় এবং হৃদয় স্থিরতা অর্জন করে।

এ কারণেই আল্লাহ তাআলা কোরআনকে 'মাওয়িজাহ বা উপদেশ' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘আর অবশ্যই আমি তোমাদের প্রতি সুস্পষ্ট আয়াত, তোমাদের পূর্ববর্তীদের দৃষ্টান্ত এবং মুত্তাকিদের জন্য উপদেশ নাজিল করেছি।' (সুরা: আন-নূর, আয়াত: ৩৪)

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, 'হে মানুষ! তোমাদের কাছে তোমাদের রবের পক্ষ থেকে উপদেশ এসেছে এবং অন্তরে যা আছে তার জন্য আরোগ্য, আর মুমিনদের জন্য হেদায়েত ও রহমত।' (সুরা : ইউনুস, আয়াত : ৫৭) 

কোরআনের মাধ্যমে উপদেশ দেওয়া হলো হৃদয় কোমল করার সর্বোত্তম, সহজতম, নিকটতম এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী মাধ্যম। কারণ পুরো কোরআনই এক মহান উপদেশ। আল্লাহ তাআলা নবী (সা.)-এর দাওয়াতের অন্যতম পদ্ধতি হিসেবে সুন্দর উপদেশকে নির্ধারণ করেছেন। তিনি বলেন, 'তুমি তোমার রবের পথে আহ্বান করো প্রজ্ঞা ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সঙ্গে এমন পদ্ধতিতে বিতর্ক করো, যা সর্বোত্তম। নিশ্চয়ই তোমার রবই ভালো জানেন কে তাঁর পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে এবং কে সঠিক পথে রয়েছে।' (সুরা : নাহল, আয়াত : ১২৫)

দাওয়াত গ্রহণকারীর অবস্থা অনুযায়ী পদ্ধতি ভিন্ন হয়। কেউ যদি সত্যের সন্ধানী ও আগ্রহী হয়, তাকে প্রজ্ঞার মাধ্যমে আহ্বান করা হয়। কেউ যদি উদাসীন ও গাফিল হয়, তবে তার জন্য প্রজ্ঞার সঙ্গে সুন্দর উপদেশ প্রয়োজন। আর কেউ যদি জেদি ও বিরোধিতাকারী হয়, তবে তার সঙ্গে উত্তম পদ্ধতিতে আলোচনা করতে হয়।

আল্লাহ তাআলা তাঁর নবী (সা.)-কে উপদেশ ও স্মরণ করানোর দায়িত্ব পালন করার নির্দেশ দিয়েছেন, 'তুমি তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও, তাদের উপদেশ দাও এবং তাদের অন্তরে প্রভাব বিস্তারকারী কথা বলো।' (সুরা: আন-নিসা, আয়াত: ৬৩) 

সুন্দর উপদেশের সৌন্দর্য দুটি বিষয়ে নির্ভর করে-
১. উপযুক্ত সময়ে প্রদান করা:
যেমন দীর্ঘ খরার পর বৃষ্টি আসে; কিন্তু অতিরিক্ত বৃষ্টি যেমন জমিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, তেমনি অতিরিক্ত উপদেশও মানুষের মনে বিরক্তি সৃষ্টি করতে পারে।

২. পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিখ্যাত উপদেশগুলোর মধ্যে আরবাজ ইবন সারিয়া (রা.)-এর বর্ণিত হাদিস অন্যতম। তিনি বলেন, 'রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের এমন এক উপদেশ দিলেন, যার ফলে আমাদের অন্তর ভয়ে কেঁপে উঠল এবং চোখ থেকে অশ্রু ঝরতে লাগল।'

এটি আল্লাহর এই বাণীর বাস্তব প্রতিফলন-'আল্লাহকে যারা ভয় করে তাদের শরীর তা থেকে কেঁপে ওঠে, অতঃপর তাদের দেহ ও হৃদয় আল্লাহর স্মরণের দিকে কোমল হয়ে যায়।' (সুরা : জুমার, আয়াত : ২৩) 


সাহাবায়ে কেরাম বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল! মনে হচ্ছে এটি বিদায় গ্রহণকারীর উপদেশ। আমাদের কিছু উপদেশ দিন। তিনি বললেন, আমি তোমাদের আল্লাহভীতির উপদেশ দিচ্ছি এবং শ্রবণ ও আনুগত্যের।' (হাদিস) তাই যারা মানুষকে কল্যাণের শিক্ষা দেন-শিক্ষক, প্রশিক্ষক, লেখক এবং আধুনিক যোগাযোগ মাধ্যমে কাজ করা ব্যক্তিদের উচিত সংক্ষিপ্ত অথচ হৃদয়স্পর্শী উপদেশ প্রচার করা। কখনো একটি সত্য ও আন্তরিক কথা আল্লাহর অনুমতিতে একটি মৃতপ্রায় হৃদয়কে জীবিত করে দিতে পারে। তাই কল্যাণকর কথা বলতে কৃপণতা করা উচিত নয়।

বর্তমানে যারা নাস্তিকতার বিভিন্ন সন্দেহ ও সংশয় প্রচার করে, তাদের অনেকের সমস্যার মূলও হৃদয়ের গাফিলতি ও অন্তরের আবরণ। তাই তাদের সঙ্গে যুক্তিতর্কের আগে হৃদয়কে উপদেশের মাধ্যমে প্রস্তুত করা অধিক কার্যকর হতে পারে। কারণ উপদেশ সফল হলে তা সত্য গ্রহণের পথে বাধা দূর করে।

কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, যে যুগে উপদেশের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সে যুগেই আন্তরিক উপদেশদাতার সংখ্যা কমে গেছে। এমনকি কেউ কেউ উপদেশকে অবজ্ঞা করে বলেন, এটি শুধু আবেগনির্ভর বক্তব্য, গভীর জ্ঞান বা গবেষণার বিষয় নয়। অথচ জ্ঞানী ও চিন্তাশীল ব্যক্তিদেরও হৃদয় কোমল করার জন্য উপদেশের প্রয়োজন আছে।

যদিও কিছু উপদেশদাতার বক্তব্যে দুর্বল কাহিনি, ভিত্তিহীন ঘটনা, মিথ্যা বর্ণনা বা কুসংস্কার প্রবেশ করেছে, তবে এর কারণে উপদেশের মর্যাদা কমে যায় না; বরং প্রয়োজন হলো উপদেশকে বিশুদ্ধ করা, মিথ্যা ও অসত্য থেকে রক্ষা করা এবং সঠিক পদ্ধতিতে তা উপস্থাপন করা। তবে উপদেশ তখনই প্রশংসনীয় যখন তা সত্য, জ্ঞানসম্মত ও কল্যাণকর হয়।

সুতরাং বর্তমান যুগে সুন্দর উপদেশের প্রয়োজন অত্যন্ত জরুরি। এমন একটি আন্তরিক বাক্য, যা কোনো হৃদয়কে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে দেয়, তা দুনিয়া ও আখিরাতের জন্য বিরাট কল্যাণের কারণ হতে পারে। তাই প্রত্যেক জ্ঞানী, শিক্ষক, দাঈ ও কল্যাণকামী মানুষের উচিত হিকমাহ, আন্তরিকতা ও প্রজ্ঞার সঙ্গে মানুষের হৃদয়ে উপকারী উপদেশ পৌঁছে দেওয়া।

আত্মশুদ্ধি দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার চাবিকাঠি

মাওলানা আদনান জহির
আত্মশুদ্ধি দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার চাবিকাঠি
সংগৃহীত ছবি

ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের প্রকৃত মর্যাদা নির্ধারিত হয় তার তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে। পৃথিবীর সকল উন্নতি, জ্ঞান, সম্পদ ও ক্ষমতা তখনই কল্যাণকর হয় যখন তা একটি পরিশুদ্ধ আত্মা ও নির্মল হৃদয়ের অধিকারী মানুষের হাতে থাকে। এজন্যই মহান আল্লাহ তাআলা মানুষের হেদায়েতের জন্য নবী-রাসুল প্রেরণ করেছেন, কিতাব নাজিল করেছেন এবং আত্মশুদ্ধিকে সফলতার প্রধান উপায় হিসেবে ঘোষণা করেছেন।

বর্তমান যুগে মানুষ বাহ্যিক উন্নতির শিখরে পৌঁছালেও আত্মিক অবক্ষয়, হিংসা-বিদ্বেষ, লোভ, অহংকার, গীবত, পরনিন্দা ও নানা নৈতিক ব্যাধিতে আক্রান্ত। তাই আজ আত্মশুদ্ধির প্রয়োজনীয়তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। একজন মুমিনের জন্য আত্মশুদ্ধি শুধু একটি ইবাদত নয়; বরং দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ লাভের মৌলিক ভিত্তি।

আত্মশুদ্ধি কী?
আরবি ‘তাজকিয়াহ’ শব্দের অর্থ হলো উন্নতি, পবিত্রতা ও পরিশুদ্ধি। ইসলামী পরিভাষায় আত্মশুদ্ধি বলতে মানুষের অন্তরকে শিরক, কুফর, অহংকার, হিংসা, রিয়া, লোভ ও সকল নৈতিক ব্যাধি থেকে মুক্ত করে ঈমান, তাকওয়া, ইখলাস, ধৈর্য, কৃতজ্ঞতা ও আল্লাহভীতির মতো মহৎ গুণে অলংকৃত করাকে বোঝায়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর যে ব্যক্তি পরিশুদ্ধ হয়, সে তো নিজের কল্যাণের জন্যই পরিশুদ্ধ হয়। আর আল্লাহর কাছেই সকলের প্রত্যাবর্তন।’ (সুরা : ফাতির, আয়াত : ১৮)

আত্মশুদ্ধির জন্যই নবী-রাসুলদের আগমন
আল্লাহ তাআলা মানবজাতির কল্যাণের জন্য নবী-রাসুলদের পাঠিয়েছেন এবং তাঁদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব ছিল মানুষের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করা। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, যখন তিনি তাদের মধ্য থেকে একজন রাসুল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করেন, তাদের পরিশুদ্ধ করেন এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমাহ শিক্ষা দেন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৬৪)

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, ‘তিনি নিরক্ষরদের মধ্য থেকে তাদেরই একজন রাসুল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করেন, তাদের পরিশুদ্ধ করেন এবং তাদের কিতাব ও হিকমাহ শিক্ষা দেন।’ (সুরা : জুমুআহ, আয়াত : ২)

আত্মশুদ্ধি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
১. আত্মশুদ্ধি সফলতার একমাত্র পথ

মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে একের পর এক এগারোটি শপথ করে আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়ই সে সফল হয়েছে, যে তার আত্মাকে পরিশুদ্ধ করেছে। আর সে ব্যর্থ হয়েছে, যে তাকে কলুষিত করেছে।’ (সুরা : শামস, আয়াত : ৯-১০)
এ আয়াত থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে মানুষের প্রকৃত সফলতা সম্পদ, পদমর্যাদা কিংবা খ্যাতিতে নয়; বরং আত্মশুদ্ধির মধ্যেই নিহিত।

২. অন্তরই মানুষের প্রকৃত সম্পদ
রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষের অন্তরের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেছেন, ‘জেনে রাখ! শরীরের মধ্যে একটি মাংসপিণ্ড রয়েছে; তা ঠিক থাকলে পুরো শরীর ঠিক থাকে, আর তা নষ্ট হয়ে গেলে পুরো শরীর নষ্ট হয়ে যায়। জেনে রাখ! সেটি হলো অন্তর।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২, সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৫৯৯)
সুতরাং আত্মশুদ্ধি মূলত অন্তরের সংশোধনের নাম।

৩. আখিরাতে মুক্তির জন্য বিশুদ্ধ অন্তর অপরিহার্য
কিয়ামতের দিন ধন-সম্পদ, বংশমর্যাদা কিংবা পার্থিব ক্ষমতা কোনো উপকারে আসবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘সেদিন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোনো উপকারে আসবে না; তবে যে আল্লাহর কাছে বিশুদ্ধ হৃদয় নিয়ে উপস্থিত হবে, সে-ই সফল হবে।’ (সুরা : শুআরা, আয়াত : ৮৮-৮৯)
অতএব, আখিরাতের মুক্তির জন্য আত্মশুদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।

৪. আত্মশুদ্ধি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ
আত্মশুদ্ধির তাওফিক আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ। মানুষ নিজ প্রচেষ্টায় চেষ্টা করে, কিন্তু প্রকৃত পরিশুদ্ধি দান করেন আল্লাহ তাআলাই। তিনি বলেন, ‘বরং আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পরিশুদ্ধ করেন।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ২১)

৫. আত্মশুদ্ধি অন্তরের ব্যাধির একমাত্র চিকিৎসা
বর্তমান যুগে মানুষের অন্তর নানা রোগে আক্রান্ত— হিংসা, অহংকার, কৃপণতা, লোভ, গীবত, পরনিন্দা, রিয়া, বিদ্বেষ ও দুনিয়ার মোহ- এসব রোগের প্রকৃত চিকিৎসা হলো আত্মশুদ্ধি, আল্লাহর স্মরণ এবং নিয়মিত আত্মসমালোচনা।

আত্মশুদ্ধির কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপায়
১. কোরআন তিলাওয়াত ও তার অর্থ অনুধাবন করা।
২. নিয়মিত সালাত আদায় করা।
৩. আল্লাহর জিকির ও ইস্তিগফার করা।
৪. গুনাহ থেকে তওবা করা।
৫. সৎ ও নেককার মানুষের সঙ্গ গ্রহণ করা।
৬. আত্মসমালোচনার অভ্যাস গড়ে তোলা।
৭. রিয়া, অহংকার ও হিংসা থেকে বেঁচে থাকা।
৮. মৃত্যু ও আখিরাতের কথা বেশি স্মরণ করা।
৯. দান-সদকা ও মানুষের উপকার করা।
১০. আল্লাহর কাছে সর্বদা আত্মশুদ্ধির জন্য দোয়া করা।

আত্মশুদ্ধি ইসলামের অন্যতম মৌলিক শিক্ষা এবং একজন মুমিনের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন। যে ব্যক্তি তার অন্তরকে ঈমান, তাকওয়া ও আল্লাহভীতির আলোয় আলোকিত করতে পারে, সে দুনিয়াতেও শান্তি লাভ করে এবং আখিরাতেও সফলতা অর্জন করে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তার আত্মাকে গুনাহ, প্রবৃত্তির অনুসরণ এবং নৈতিক অবক্ষয়ের মধ্যে নিমজ্জিত রাখে, সে দুনিয়া ও আখিরাত উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আজ যখন সমাজ নানাবিধ নৈতিক সংকট ও আত্মিক রোগে আক্রান্ত, তখন প্রত্যেক মুমিনের উচিত নিজের অন্তরের দিকে ফিরে তাকানো, আত্মসমালোচনা করা এবং আত্মশুদ্ধির পথে অগ্রসর হওয়া। কারণ কিয়ামতের দিন আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য হবে না সম্পদ, পদমর্যাদা কিংবা বংশগৌরব; বরং গ্রহণযোগ্য হবে সেই হৃদয়, যা আল্লাহর স্মরণে পবিত্র, তাকওয়ায় পরিপূর্ণ এবং গুনাহের কালিমা থেকে মুক্ত।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে আত্মশুদ্ধি, অন্তর সংশোধন এবং বিশুদ্ধ হৃদয় নিয়ে তাঁর দরবারে উপস্থিত হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

জুমার দিনে যে তিন দোয়া বেশি বেশি পড়বেন

ইসলামী জীবন ডেস্ক
জুমার দিনে যে তিন দোয়া বেশি বেশি পড়বেন
সংগৃহীত ছবি

মুসলমানদের জন্য জুমার দিন হচ্ছে সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন। হাদিসে জুমার দিনে করণীয় বেশকিছু আমলের কথা রয়েছে। এর মধ্যে একটি বিশেষ আমল হলো আল্লাহ তাআলার কাছে একাগ্রচিত্তে দোয়া করা। কারণ এটি দোয়া কবুলের দিন। এই দিনের দোয়া বিশেষভাবে কবুল করা হয়।  আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘জুমার দিনে এমন একটি সময় আছে, সেই সময়টায় যদি কোনো মুসলিম নামাজ আদায় করে এবং আল্লাহর কাছে কিছু চায়, আল্লাহ অবশ্যই তার সে চাহিদা বা দোয়া কবুল করবেন এবং এরপর রাসুল (সা.) হাত দিয়ে ইশারা করে সময়টির সংক্ষিপ্ততার ইঙ্গিত দেন’। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৪০০)

তবে কোনো হাদিসে এসেছে, ‘সেই সময়টি তোমরা আসরের শেষ সময়ে অনুসন্ধান কর।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ১০৪৮)
বিখ্যাত সিরাতগ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, জুমার দিন আসরের নামাজ আদায়ের পর দোয়া কবুল হয়। (জাদুল মাআদ, ২/৩৯৪)

তাই জুমার দিন বিশেষ করে আসর নামাজের পর দোয়া করা উচিত। যেকোনো দোয়াই করা যায়। এখানে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দোয়া তুলে ধরা হলো।

১. দুনিয়া-আখেরাতে কল্যাণ লাভের দোয়া

رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ

উচ্চারণ : ‘রাব্বানা আতিনা ফিদ্ দুনইয়া হাসানাহ, ওয়াফিল আখিরাতি হাসানাহ, ওয়াকিনা আজাবান্নার।’
অর্থ : ‘হে আমার রব! আপনি আমাকে দুনিয়াতে কল্যাণ দান করুন, আখেরাতেও কল্যাণ দান করুন এবং আমাকে জাহান্নাম থেকে বাঁচান।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২০১‍)


২. উত্তম জীবন যাপনের দোয়া

اَللَّهُمَّ اِنِّى أَسْألُكَ الْهُدَى وَالتُّقَى وَالْعَفَافَ وَالْغِنَى

উচ্চারণ : ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকাল হুদা ওয়াত তুক্বা ওয়াল আফাফা ওয়াল গেনা।’
অর্থ : ‘হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে হেদায়াত কামনা করি এবং আপনার ভয় তথা তাকওয়া কামনা করি এবং আপনার কাছে নৈতিক পবিত্রতা কামনা করি এবং সম্পদ তথা সামর্থ্য ও সচ্ছলতা কামনা করি।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৭২১,  তিরমিজি, হাদিস : ৩৪৮৯)

৩. মা-বাবাসহ সকল মুমিনের জন্য দোয়া

رَبَّنَا اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِلْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ يَقُومُ الْحِسَابُ

উচ্চারণ : ‘রব্বানাগ-ফিরলি ওয়ালি ওয়ালিদাইয়্যা ওয়ালিল মুমিনিনা ইয়াওমা ইয়াকুমুল হিসাব।’

অর্থ : ‘হে আমাদের রব! আপনি আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে এবং সব মুমিনকে সেইদিন ক্ষমা করে দিবেন; যেইদিন হিসাব কায়েম করা হবে।’ (সুরা : ইবরাহিম, আয়াত : ৪১)

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে উল্লেখিত দোয়াগুলো নিয়মিত পাঠ করার তাওফিক দান করুন। বিশেষ করে দোয়া কবুলের সময়গুলোতে বেশি বেশি পাঠ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

জুমার দিন যে ১৫ আমলে মনোযোগী হওয়া উচিত

ইসলামী জীবন ডেস্ক
জুমার দিন যে ১৫ আমলে মনোযোগী হওয়া উচিত
সংগৃহীত ছবি

সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন জুমার দিন। আল্লাহ তাআলা এই দিনকে অন্য দিনের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। তাই জুমার দিনে মুমিনের হৃদয়ে মমতা ও হৃদ্যতার অপার্থিব এক সুখ ফুটে ওঠে। পারস্পরিক সৌহার্দ-সম্প্রীতি ও ভালোবাসার দীপ্তি ছড়িয়ে পড়ে। এ দিনের বিশেষ কিছু ইবাদত ও আমল আছে, যা মহানবী (সা.)-এর জীবনে পাওয়া যায়। নিম্নে সেগুলো সম্পর্কে আলোচনা করা হলো—

১. জুমাবারের ফজরের তিলাওয়াত করা : আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সা.) শুক্রবার ফজরের নামাজে সুরা আস-সিজদা এবং সুরা আল-ইনসান তিলাওয়াত করতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১০৬৮)

জুমার দিন মহানবী (সা.) এই সুরাগুলো তিলাওয়াত করতেন।  কারণ এই সুরাতে আদম (আ.)-এর সৃষ্টির কথা, পুনরুত্থানের কথা, কিয়ামতের দিন সবাইকে সমবেত হওয়া ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আর এসব হবে জুমার দিন। সে জন্য এই সুরা পাঠ করে উম্মতকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়।

২. বেশি পরিমাণে দরুদ শরিফ পড়া : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমরা জুমার দিন আমার ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করো। কেননা তোমাদের পাঠকৃত দরুদ আমার সামনে পেশ করা হয়। (আবু দাউদ, হাদিস : ১০৪৭)

৩. জুমার নামাজ আদায় করা : ইসলামের যেসব ফরজ বিধান আছে, এর মধ্যে বেশি গুরুত্বপূর্ণ জুমার নামাজ। আরাফার দিবসের পর এদিনই সবচেয়ে বেশি মানুষ একসঙ্গে সমবেত হয়। যারা জুমার নামাজকে অলসতা কিংবা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে ছেড়ে দেয়, তাদের হৃদয়ে আল্লাহ তাআলা মোহর মেরে দেন।

৪. গোসল করা : এই দিনে বিশেষভাবে গোসল করার তাগিদ এসেছে, সালিম (রহ.) থেকে তাঁর পিতার সূত্র থেকে বর্ণিত, তিনি নবী (সা.)-কে বলতে শুনেছেন, যে ব্যক্তি জুমার নামাজে আসে সে যেন গোসল করে আসে। (তিরমিজি, হাদিস : ৪৯২)

৫. সুগন্ধি ব্যবহার করা : অন্য দিনের চেয়ে এদিন বেশি সুগন্ধি ব্যবহার করা উত্তম। আবু সাইদ খুদরি (রা.) বলেন, আমি এ মর্মে সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, জুমার দিন সুগন্ধি পাওয়া গেলে তা ব্যবহার করবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৮৮০)

৬. দ্রুত মসজিদে যাওয়া : জুমার দিনের ফজিলত লাভে  এই আমল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এদিকে বিশেষভাবে মনোযোগী হওয়া উচিত। 

৭. ইবাদতে মশগুল থাকা : ইমাম জুমার নামাজে আসার পূর্ব পর্যন্ত নামাজ, জিকির ও তিলাওয়াতে রত থাকা।

৮. খুতবার সময় সম্পূর্ণ নিশ্চুপ থাকা : আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি জুমার দিন ইমামের খুতবা দেওয়ার সময় তার সঙ্গীকে বলল, ‘চুপ থাকো’ সে একটি অনর্থক কাজ করল। (সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ১৪০১)

৯. সুরা কাহফ পড়া : আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন সুরা কাহফ পাঠ করবে তার জন্য দুই জুমার মধ্যবর্তীকাল জ্যোতির্ময় হবে।’ (আত-তারগিব, হাদিস : ৭৩৫)

১০. জুমার নামাজের নির্ধারিত সুরা পাঠ করা : নুমান ইবনে বশির (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) দুই ঈদের নামাজে ও জুমার নামাজে ‘সাব্বিহিসমা রব্বিকাল আলা’ ও ‘হাল আতা-কা হাদিসুল গা-শিয়াহ’ সুরা দুটি পাঠ করতেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৯১৩)

কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে, রাসুল (সা.) সুরা জুমুআ ও সুরা আলা তিলাওয়াত করতেন।

১১. পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর কাপড় পরিধান করা : আবু জার (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি জুমার দিন উত্তমরূপে গোসল করে, উত্তমরূপে পবিত্রতা অর্জন করে, তার উৎকৃষ্ট পোশাক পরিধান করে এবং আল্লাহ তার পরিবারের জন্য যে সুগন্ধির ব্যবস্থা করেছেন, তা শরীরে লাগায়, এরপর জুমার সালাতে এসে অনর্থক আচরণ না করে এবং দুজনের মাঝে ফাঁক করে অগ্রসর না হয়, তার এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমার মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহ ক্ষমা করা হয়। (সুনানে ইবনে মাজা, হাদিস : ১০৯৭)

১২. মসজিদে সুগন্ধি লাগানো : ওমর (রা.) জুমার দিন দ্বিপ্রহরে মসজিদে সুগন্ধি লাগানোর জন্য আদেশ করেছেন।

১৩. ক্ষমা প্রার্থনা করা : এদিন মহান রবের পক্ষে গুনাহ মাফের বারি বর্ষিত হয়। মহানবী (সা.) বলেছেন, কোনো মুসলিম যদি পবিত্র হয়ে জামে মসজিদের দিকে হাঁটতে থাকে, এরপর ইমাম নামাজ শেষ করা পর্যন্ত নীরব থাকে, তাহলে এ নামাজ এই জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত তার গুনাহের কাফফারা (মোচনকারী) হয়ে যাবে, যদি ধ্বংসকারী তথা কবীরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকে। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস ২৩৭২৯)

১৪. মৃতদের জন্য দোয়া করা : জুমার দিন কবরের আজাব মাফ হয়ে যায়। আবু কাতাদাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) জুমার দিন ছাড়া (অন্য দিন) ঠিক দুপুরে নামাজ আদায় করা অপছন্দ করতেন। তিনি বলেছেন, জুমার দিন ছাড়া (অন্যান্য দিনে) জাহান্নামের আগুনকে উত্তপ্ত করা হয়। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১০৮৩)

জুমার দিনে বা রাতে যে মারা যাবে, তার থেকে কবরের আজাব উঠিয়ে নেওয়া হবে এটা এই হাদিস থেকে প্রমাণিত। তবে কিয়ামত পর্যন্ত আজাব দেওয়া হবে না এটা নিশ্চিত নয়।

১৫. বেশি বেশি দোয়া করা : বিশেষ সময়ে দোয়া কবুল হয়। আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন, জুমার দিনের মধ্যে অবশ্যই এমন একটি মুহূর্ত আছে, যখন কোনো মুসলিম আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করে নিশ্চয়ই তিনি তাকে তা দান করেন। তিনি বলেন, সে মুহূর্তটি অতি স্বল্প। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৮৫৮)

বেশির ভাগের মতে, সে সময়টি আসরের পর থেকে নিয়ে মাগরিবের আগ মুহূর্ত। (জাদুল মাআদ থেকে সংক্ষেপিত)