জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে ২ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণসহ ১০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গতকাল মঙ্গলবার এই রায় দেন। ট্রাইব্যুনালের দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
মামলার একমাত্র আসামি ইনুর বিরুদ্ধে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী ও চাকরিজীবী ইউসুফ শেখকে হত্যাসহ অভ্যুত্থানের বিভিন্ন পর্যায়ে উসকানি, ষড়যন্ত্র, আন্দোলনকারীদের ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার ও নিপীড়নমূলক কৌশলে সমর্থনসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের ৮টি অভিযোগ আনা হয়েছিল। ৮টি অভিযোগের মধ্যে তাঁকে তিনটি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে বাকি ৫ অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হয়েছে।
এর আগে রায় ঘোষণার আগে ইনুকে ট্রাইব্যুনালে তোলা হয়। রায় ঘোষণা শেষ হলে তিনি হেসে ওঠেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনে রায় ঘোষণার কার্যক্রম সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।
রায় ঘোষণার সময় ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মো. মিজানুল ইসলাম, গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম, বি এম সুলতান মাহমুদসহ অন্যান্য প্রসিকিউটর ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তারা। হাসানুল হক ইনুর পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী।
৩০ বছর সাজা হলেও ইনুকে খাটতে হবে ১০ বছর :
মামলার ৩ নম্বর অভিযোগের কথা উল্লেখ করে রায়ে ট্রাইব্যুনাল বলেন, ‘এই অভিযোগের সাক্ষী রাইসুল হকসহ অন্য ভুক্তভোগীদের গুরুত্বর আহত তথা নির্যাতন, রাজনৈতিক নিপীড়ণ করার দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩-এর ৩(২) (ক) (জ), ৪(১) ৪(২), ২০(২) ও ২০(ক) ধারায় আসামি হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হলো।’
এ ছাড়া ষড়যন্ত্র, সংঘটিত অপরাধে প্ররোচনা ও সহযোগিতার দায়ে ৬,৭ নম্বর অভিযোগে ১ লাখ টাকা করে মোট ২ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণসহ ১০ বছর করে মোট ২০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
১, ২, ৪, ৫ ও ৮ নম্বর অভিযোগ থেকে ইনুকে খালাস দেওয়া কথা উল্লেখ করে রায়ে বলা হয়, ‘আসামির বিরুদ্ধে আরোপিত সকল সাজা যুগপৎভাবে (একসঙ্গে) চলবে।’ ফলে তিনটি অভিযোগে ১০ বছর করে মোট ৩০ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হলেও হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছর সাজা খাটতে হবে।
এটা প্রহসনের বিচার : ইনু
রায় ঘোষণা শেষে ট্রাইব্যুনালের এজলাশ থেকে নামিয়ে সেলে নিয়ে যাওয়ার পথে সাংবাদিকদের দেখে গলার স্বর চড়িয়ে কথা বলতে শোনা যায় জাসদ সভাপতিকে। তিনি বলছিলেন, ‘১৯৭৬ সালে জিয়াউর রহমান সাজা দিয়েছিল, আজ তাঁর ছেলে সাজা দিল। প্রহসনের আদালতে তারেক জিয়ার ফরমায়েশি রায়। এটা প্রহসনের বিচার।’ এরপর তিনি এও বলেন, ‘যাক বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি হলো।’
যে তিন অভিযোগে সাজা
তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০ জুলাই দুপুরে কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে ফোন দিয়ে আন্দোলনকারীদের ভিডিও দেখে শনাক্ত করে আন্দোলন দমন ও আন্দোলনকারীদের আটক, নির্যাতন ও হত্যার নির্দেশ দেন ইনু।
ষষ্ঠ অভিযোগে বলা হয়েছে, আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য ২০২৪ সালের ২৯ জুলাই ১৪ দলীয় জোটের সভায় উপস্থিত থেকে আন্দোলনকারীদের জামায়াত, সন্ত্রাসী, সাম্প্রদায়িক ট্যাগ দেন। একই সভায় জামায়াত ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহনের মাধ্যমে তিনি মূলত আন্দোলনকারীদের ওপর চালানো হত্যাকাণ্ড-নির্যাতনের বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেন।
আর দোষী সাব্যস্ত করা সপ্তম অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৪ অগাস্ট বিকালে আন্দোলনকারীদের জঙ্গি তকমা দিয়ে কারফিউ জারির মাধ্যমে গুলি বর্ষণের কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়নে অধস্তনদের নির্দেশনা দেওয়া।
এই রায়ে আমরা সন্তুষ্ট নই, আপিল করা হবে : চিফ প্রসিকিউটর
রায়ের পর তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘এই রায়ে আমরা সন্তুষ্ট নই। যে ৩টি অভিযোগে ১০ বছর করে তাকে সাজা দেওয়া হয়েছে, সেই সাজা বাড়াতে এবং যেসব অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হয়েছে, সেই খালাসের বিরুদ্ধে আমরা আপিল করবো।’
নিকৃষ্টতম অবিচার-ইনুর স্ত্রী
রায়ের পর সংক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন দণ্ডিত হাসানুল হক ইনুর স্ত্রী সাবেক সংসদ সদস্য আফরোজা হক রীনা। ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গনে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা মনে করি আইনের নিকৃষ্টতম অপব্যবহার এবং নিকৃষ্টতম অবিচার। আমরা এই রায়কে প্রত্যাখান করি। এটি একটি ফরমায়েশি রায়। মুক্তিযুদ্ধ, অসাম্প্রদায়িকতা, মানবিক মূল্যবোধের বিরুদ্ধে যে মতবাদ, সেই মতবাদের প্রতিফলনেএই রায়ের মধ্যদিয়ে ঘটেছে। এই মতবাদের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সাল থেকে আমাদের যুদ্ধ। আইনজীবী এবং দলের সঙ্গে পরামর্শ করে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
মামলা বৃত্তান্ত
গত বছর ২৫ মার্চ এ মামলার তদন্ত শুরু হয়। সাড়ে পাঁচ মাস তদন্তের পর ১১ সেপ্টেম্বর চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। যাচাই-বাছাইয়ের পর ২৫ সেপ্টেম্বর ‘আনুষ্ঠানিক অভিযোগ’ হিসেবে তা ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হয়। ওই দিনই আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল। পরে অভিযোগ গঠন নিয়ে শুনানি শুরু হয়। গত বছর ২ নভেম্বর ইনুর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। অভিযোগ গঠনের পর ৩০ নভেম্বর মামলার সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করে প্রসিকিউশন। ১ ডিসেম্বর থেকে শুরু হয় সাক্ষ্য গ্রহণ। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাসহ মোট ১০ জন সাক্ষী এ মামলায় সাক্ষ্য দেন। আসামির পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দেন দুইজন। গত ১৩ এপ্রিল থেকে বিচারের তৃতীয় ধাপ। এদিন থেকে শুরু হয় যুক্তিতর্ক। তা শেষ হয় গত ১৪ মে। এদিন প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক শেষ হলে মামলার রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ রাখেন ট্রাইব্যুনাল। গত ২২ জুন মামলাটি ফের ট্রাইব্যুালের কার্যতালিকায় তোলা হয়। সেদিন আদালত ৩০ জুন রায় ঘোষণার তারিখ ধার্য করে দেন। সে অনুযায়ী রায় ঘোষণা করলেন ট্রাইব্যুনাল। এ নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের পাঁচটি মামলার রায় ঘোষণা করা হলো। এর আগে মানবতাবিরোধী অপরাধের পাঁচ মামলার রায়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ২৬ অগাস্ট রাজধানীর উত্তরা থেকে হাসানুল হক ইনুকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সেই থেকে তিনি কারাগারে আছেন।






