‘আয়না ঘর’ নামে পরিচিতি পাওয়া প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই)-এর জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টারে (জেআইসি) গুম-নির্যাতনসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন হেফাজতে ইসলামের কর্মী তাজুল ইসলাম সুমন।
আজ বৃহস্পতিবার বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ তিনি সাক্ষ্য দেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে দেওয়া সাক্ষ্যে ভুক্তভোগী এই সাক্ষী বলেছেন, তিনি জঙ্গি কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত এমন স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য জিজ্ঞাসাবাদের সময় নির্যাতন করা হতো।
নিজেকে হেফাজতে ইসলামের কর্মী উল্লেখ করে মামলার ষষ্ঠ সাক্ষী তাজুল ইসলাম সাক্ষ্যে দাবি করেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জুলুম-নির্যাতনসহ হেফাজতে ইসলামের বিরুদ্ধে গণহত্যা নিয়ে ফেসবুকে লেখালেখি করতেন। এ কারণে তাঁকে গুম করা হয়। এক সময় মানিকগঞ্জের একটি মাদরাসায় কর্মরত ছিলেন। সেই মাদরাসা থেকেই ২০১৫ সালের ৪ নভেম্বর রাতে তাঁকে গুম করা হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যেখানে গুম করে রাখা হয়, সেখানকার একটি কক্ষে তাঁকে কোনো কোনো দিন দুই-তিনবার জিজ্ঞাসাবাদ করা হতো। প্রথম চার মাসে তাঁকে ২০-২৫ দিন জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নেওয়া হয়। একবার জিজ্ঞাসাবাদে নিয়ে একটি চেয়ারের সঙ্গে বেঁধে কয়েকজন মিলে লাঠি দিয়ে পেটান। জিজ্ঞাসাবাদে সব সময়ই নির্যাতন করা হতো। জিজ্ঞাসাবাদে তাঁকে কয়েকজনের নাম সম্পর্কে জানতে চাইত। জঙ্গি কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত থাকার স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করা হতো।’
২০১৬ সালের ৮ ডিসেম্বরের বর্ণনায় তিনি বলেন, ওইদিন তাঁর সঙ্গে নাজিম উদ্দিন নামের আরেকজনকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় চট্টগ্রাম নগরের আকবর শাহ থানার কর্নেল হাট এলাকায় সানজিদা এন্টারপ্রাইজের সামনে। সেখানে গাড়ি থেকে নামিয়ে অস্ত্র উদ্ধারের একটি নাটক সাজিয়ে আবার তাঁদের গাড়িতে তোলা হয়। গাড়িটি ১০-১৫ মিনিট চলার পর একটি নির্মাণাধীন বাড়ির সামনে গাড়িটি থামে। সেখানে গাড়ি থেকে নামিয়ে তাঁদের দোতলার একটি ঘরে আটকে রাখা হয়।
ওই ঘরে আরো কয়েকজনকে দেখতে পান জানিয়ে তাজুল ইসলাম বলেন, জঙ্গি নাটক মঞ্চস্থ করে তিন থেকে চার ঘণ্টা পর ওই বাড়ি থেকে বের করে তাঁদের সাংবাদিকদের সামনে আনা হয়। পরে তাঁদের র্যাব-৭-এ নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে ওই রাতেই তাঁদের আকবর শাহ থানায় সোপর্দ করা হয়।
তাঁদের নামে তিনটি মামলা দেওয়া হয় উল্লেখ করেন তাজুল ইসলাম বলেন, একটি মামলা সন্ত্রাস দমন আইনে। একটি বিস্ফোরক দ্রব্য ও অস্ত্র আইনে। অন্যটি অস্ত্র আইনে।
এর মধ্যে একটি মামলায় খালাস পেলেও অন্য মামলাগুলোর বিচার এখনো চলমান। ২০২৫ সালের ৮ জানুয়ারি আট বছর কারাভোগের পর জামিনে মুক্ত হন বলে সাক্ষ্যে ট্রাইব্যুনালকে জানান তাজুল ইসলাম।
গুম, নির্যাতন, মিথ্যা মামলা ও কারাভোগের সঙ্গে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জড়িত ছিলেন দাবি করার পাশাপাশি এই সাক্ষী সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সামরিক উপদেষ্টাসহ ডিজিএফআই’র তৎকালীন দায়িত্বরত ব্যক্তিদের বিচার দাবি করেন ট্রাইব্যুনালের কাছে।
সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে তাঁকে এক প্রশ্নের জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু। পরে সময়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আগামী ২২ জুলাই বাকি জেরার দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল।
এ মামলায় ১৩ আসামির মধ্যে গ্রেপ্তার রয়েছেন তিনজন। তারা হলেন- ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী। গতকাল সকালে তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
পলাতক ১০ আসামির মধ্যে পাঁচজনই বিভিন্ন সময়ে ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তারা হলেন- লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আকবর হোসেন, মেজর জেনারেল (অব.) সাইফুল আবেদিন, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. সাইফুল আলম, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আহমেদ তাবরেজ শামস চৌধুরী ও মেজর জেনারেল (অব.) হামিদুল হক।
বাকি আসামিরা হলেন শেখ হাসিনার প্রতিরক্ষাবিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ তৌহিদুল উল ইসলাম, মেজর জেনারেল কবীর আহাম্মদ ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মখছুরুল হক।
গুমের এ মামলায় গত বছরের ৮ অক্টোবর ১৩ জনের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের দেওয়া অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল। পরে ১৮ ডিসেম্বর অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে মামলার বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়।




