• ই-পেপার

প্রাপক আমার বাবা

তা কি আর ভার্চুয়ালি পাওয়া যায়?

প্রাপক আমার বাবা

আব্বা এবং সিঁড়ির গল্প

আব্বা এবং সিঁড়ির গল্প
চিত্রকর্ম : সাইকেল, বাবা আর আমি। শিল্পী : সমর মজুমদার

আশির দশকের শুরুর লগ্ন। সেদিন বানিয়া বাজারে হাটবার। বাবার হাত ধরে হাঁটছি। পথের ধারেই কড়িয়াইলের শামছুল ইসলাম খানের বিশাল বাড়ি। পুরো এলাকায় এত বড়, এত জাঁকজমকপূর্ণ বিল্ডিং আর একটিও ছিল না। আসা-যাওয়ার পথে খেয়াল করলাম, সেই বিশাল বাড়ির ছাদের ওপর কয়েকজন নারী দাঁড়িয়ে ধান ওড়াচ্ছেন। ধান থেকে চিটা আলাদা করার সেই চিরচেনা দৃশ্য। আমার ভেতরের কৌতূহলী শিশুমন আর শান্ত থাকল না। বাবার হাত চেপে ধরে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আচ্ছা আব্বা, ওরা অত ওপরে উঠল কিভাবে?’ বাবা স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই বললেন, ‘কেন, সিঁড়ি ডিঙিয়ে।’

সিঁড়ি? সেটি আবার কেমন জিনিস? কৌতূহল যেন এবার আকাশ ছুঁলো। বায়না ধরলাম, ‘আব্বা, আমি ওই সিঁড়ি দেখতে চাই। এখনই দেখব।’ বাবা কিছুটা তাড়া দিয়ে বললেন, ‘এখন তো সময় কম রে, বাবা। বাজারে যেতে হবে। অন্য একদিন দেখাব।’ কিন্তু অবুঝ মন কি আর সময়ের হিসাব বোঝে? বাবার মুখের ‘না’ শুনে আমার অভিমানী মন চট করে বিগড়ে গেল। এক পা-ও নড়ব না বলে জেদ ধরলাম। গত্যন্তর না পেয়ে তিনি নরম হলেন। নিজে বাড়ির বাইরে রাস্তার ধারে অপেক্ষা করে আমাকে ভেতরে পাঠালেন সেই কাঙ্ক্ষিত ‘সিঁড়ি’ দেখতে। মহা আনন্দে বাড়ির ভেতরে ঢুকলাম। কিন্তু এদিক-ওদিক তাকিয়ে কোথাও রাজকীয় বা জাদুকরী সিঁড়ি দেখলাম না। দেখলাম, বাঁশের তৈরি একটি মই! সেই মই বেয়েই লোকজন ওঠানামা করছে। হতাশ হয়ে বাবার কাছে ছুটে এলাম। ক্ষোভের সুরে বললাম, ‘আব্বা, আপনি তো মিছে কথা বললেন! ভেতরে কোনো সিঁড়িটিড়ি নেই। ওটা তো একটি মই!’ বাবা হো হো করে হেসে উঠলেন। তারপর আমার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে বললেন, ‘পাগল ছেলে, মইয়ের অপর নামই তো সিঁড়ি!’ আজ হয়তো কত আধুনিক, কত সুন্দর সিঁড়ি দেখি, কিন্তু শৈশবের সেই ‘বাঁশের মই’ আর বাবার মায়াবী হাসিটার চেয়ে আর কিছুই সুন্দর মনে হয় না।

প্রাপক আমার বাবা

তাঁর প্রিয় মাছের মাথা

তাঁর প্রিয় মাছের মাথা
চিত্রকর্ম : সাইকেল, বাবা আর আমি। শিল্পী : সমর মজুমদার

একবার গ্রাম থেকে আম্মা ও আব্বা আমার বাসায় এলেন। আমার স্ত্রী মিথিলার তখন টাইফয়েড। ভাইয়াও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে। মেয়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে আমার শাশুড়ি এসেছিলেন আগেই। মিথিলা বিছানায়। ঘরের সবকিছু এলোমেলো। আম্মা আর শাশুড়ি এটা-ওটা খুঁজে সকালের রান্নাবান্না চালিয়ে নেন। দুপুরে শাশুড়ি ফ্রিজ থেকে ইলিশ মাছ বের করে রান্না করলেন।

আম্মা ও আব্বা দুপুরে খেতে বসেছেন। শাশুড়ি আপ্যায়ন করছেন। আব্বার পাতে ইলিশ মাছের মাথাটা দিলেন। ‘না না, দাঁত নেই। খেতে পারব না’ বললেও আমার শাশুড়ি জোর করলেন। আম্মাও সাপোর্ট করে বললেন, ‘খান তাইলে। আপনে তো মাথা পছন্দ করেন।’

শুনে আব্বা হঠাৎ আপ্লুত হয়ে পড়লেন। একান্নবর্তী সংসারে মাছের মাথা তাঁর ভাগ্যে সব সময় জুটত না। আব্বার চোখে জল। কান্নাভেজা কণ্ঠে আমার শাশুড়িকে বললেন, ‘জানেন আপা, আমি আমার সন্তানদের কখনোই বড় মাছ খাওয়াইতে পারি নাই। ভাঙা মাছের কাঁটাকুটা—পাতে যা দিছে, তা-ই খাইছে। কোনো সময় ওরা এইটা নিয়া মন খারাপ করে নাই। আর আজ দেখেন, আমার ছেলে আমারে বড় মাছের মাথা খেতে দেয়!’ আমার শাশুড়ি ও আম্মার চোখেও জল। আব্বা খাবার রেখে দুই হাত তুলে বললেন, ‘আল্লাহ, আমার সন্তানরে আরো অনেক বেশি দিয়ো।’ সেবার তাঁরা আমার বাসায় এক রাত ছিলেন। পরদিন সকালে ভাইয়াকে দেখতে হাসপাতালে ছুটে গেলেন।

আব্বা একসময় ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে পৃথিবী ছাড়লেন। এখনো বড় মাছ আনলে আব্বার কথা মনে পড়ে। আহা, মাছের মাথাটা যদি আব্বার পাতে দিতে পারতাম!

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ

ঢাকা

প্রাপক আমার বাবা

অনন্ত অপেক্ষায় চোখভরা জলে খুঁজব আপনাকে

বাবা দিবস উপলক্ষে লেখা আহবান করেছিল অবসরে। নির্বাচিত আরো চারটি লেখা ছাপা হলো আজ

অনন্ত অপেক্ষায় চোখভরা জলে খুঁজব আপনাকে

ছোটবেলায় মা-বাবা, ভাই-বোন মিলে অদ্ভুত মায়ার এক সংসার থাকে। ছায়ায়-মায়ায় মোড়ানো ঘরদোর। সেই আঙিনায় সারা দিন হৈ-হুল্লোড়, ছোট ছোট দুঃখ-কষ্ট থাকে, কিন্তু নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার মতো, শিকড়হীন হওয়ার মতো যন্ত্রণা এক বিন্দুও থাকে না, যে জীবনে আব্বা থাকেন...। ঠিক কবে থেকে আব্বার পেছনে ঘুরঘুর করি, ঠিক মনেও পড়ে না। আব্বা যেখানেই যেতেন, প্রায় সবখানেই আমাকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন। শিক্ষকতার সীমিত আয়েও আমাকে দই, পুরি খাওয়াতে নিয়ে যেতেন রেস্টুরেন্ট।

আমাদের পড়ালেখার জন্য আব্বা গ্রাম ছেড়ে একদিন পাড়ি জমালেন অচেনা মফস্বলে। একদিন স্কুল-কলেজের পালাও ফুরাল, নতুন ঠিকানা হলো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, সেই যাত্রাও আব্বার হাত ধরে। আহা সময়, কখন পালাল! আজকাল প্রায়ই ভাবি, যদি আর কিছুদিন আব্বাকে দেখতে পেতাম! তারা সত্যি ভাগ্যবান, যারা হাত বাড়ালেই মা-বাবাকে ছুঁতে পারে। হাজার মাইলের দূরত্বে, সাদা কাফনে মোড়া আব্বা যেন পরিচিত ঘুমে ডোবা। তবু  কখনো মুহূর্তের জন্যও আমার অন্তত মনে হলো না, আমাদের আব্বাও কোনো দিন অনন্তযাত্রায় হারিয়ে যেতে পারেন! আব্বা আল্লাহ‌র মেহমান হয়েছেন, সাড়ে তিন হাত তাঁর মাটির ঘর! অথচ অবলীলায় আমার সবটুকু আশ্রয় তিনি সঙ্গে নিয়ে গেছেন। এরপর যতবার দেশে গিয়েছি, মন বলেছে, এয়ারপোর্টে ঠিক আব্বাকে দেখতে পাব। সেই গিজগিজে মানুষের ভিড়ে, আকুল হয়ে খুঁজেছি। অবিশ্বাস নিয়ে কান্না লুকিয়েছি, এয়ারপোর্টে নেই! তাহলে নিশ্চয়ই অন্য কোথাও। হতভাগ্য আমি, শেষ  দেখাটাও পাইনি আব্বার। তারপর ছুটেছি গ্রামের বাড়ি, প্রতিটি ধূলিকণা, পথঘাট, মাঠ অথবা ঘাস, যেখানে আব্বার ছোঁয়া লেগে আছে। এখানেই আমাদের পারিবারিক গোরস্তান, আব্বা, দাদা-দাদি, চাচা-চাচিসহ আরো কত স্বজন চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন। আব্বার কবরখানা দেখে আমার হৃদয় ভেঙে এলেও মাথা আর মন জুড়ে তীব্র দ্বৈত অনুভূতি—না, এখানে কেউ নেই! সময় ফুরায়, পরবাসে ফিরি একা। অনেক দোয়ায় আগলে রেখে বিদায় জানানোর আমার কেউ নেই আর। আব্বা, আপনি আছেন, অনন্ত অপেক্ষার চোখভরা জলে আমি খুঁজব স্বদেশের আনাচকানাচ অথবা ওপারে।

নিলুফার রুখসানা

মিয়াজাকি, জাপান 

► তাঁর প্রিয় মাছের মাথা

► তা কি আর ভার্চুয়ালি পাওয়া যায়?

► আব্বা এবং সিঁড়ির গল্প

 

 

 

 

বিনামূল্যে আড়াই হাজার অস্ত্রোপচার

এবার গ্লোবাল হেলথ অ্যাওয়ার্ড পেলেন সেই চিকিৎসক

পিন্টু রঞ্জন অর্ক
এবার গ্লোবাল হেলথ অ্যাওয়ার্ড পেলেন সেই চিকিৎসক
‘গ্লোবাল হেলথ অ্যাওয়ার্ড ২০২৬’ গ্রহণ করছেন ডা. শাহ মুহাম্মদ আমান উল্লাহ

লক্ষ্মীপুরের সন্তান ডা. শাহ মুহাম্মদ আমান উল্লাহ। অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগের এই সহযোগী অধ্যাপক এখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সংযুক্ত আছেন। বেশ কয়েক বছর ধরে সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে প্রায় আড়াই হাজার ব্যক্তির অস্ত্রোপচার করেছেন। সবই বিনা পারিশ্রমিকে। জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের রিহ্যাবিলিটেশন কমিটির আহ্বায়ক তিনি। সদস্যসচিব ডা. পারভেজ রেজা কাকন। ডা. আমানের দলে আরো ছিলেন অর্থোপেডিক সার্জন অধ্যাপক ডা. সিরাজুস সালেহীন, চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. সায়ীদ মেহবুব উল কাদির, ডা. এম আর হাসান, ডা. সাজিদ, ডা. শাওন রহমান, ডা. রাকিবুজ্জামান, ডা. আয়াজ, ডা. মীর রাশেক আলম অভি, ডা. কামরুজ্জামান প্রমুখ। প্রথম দিকে কলাবাগানের একটি হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করতেন তাঁরা। পরে করেছেন শ্যামলীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে। অস্ত্রোপচারগুলো করতেন হয় গভীর রাতে, নয়তো খুব ভোরে। খুবই সাধারণভাবে হাসপাতালে ঢুকতেন। মোবাইল রেখে যেতেন অন্য কোথাও। কাজ শেষে একেকজন একেকভাবে বেরিয়ে পড়তেন। ২০২৪ সালের আগস্টের আগেও তাঁরা কাজ করেছেন পরিচয় লুকিয়ে। পুরো বিষয়টি তত্ত্বাবধান করতেন ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার। তাঁদের এই কাজ নিয়ে গত ৫ মে সচিত্র প্রতিবেদন ছাপা হয় কালের কণ্ঠের অবসরে পাতায়। শিরোনাম ‘বিনামূল্যে আড়াই হাজার অস্ত্রোপাচার’। এবার ‘গ্লোবাল হেলথ অ্যাওয়ার্ড ২০২৬’ পেয়েছেন ডা. শাহ মুহাম্মদ আমান উল্লাহ। স্বাস্থ্য খাতে অসামান্য অবদান ও মানবিক সেবার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে এই সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে। গত ২৪ জুন ঢাকার একটি হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসির খান চৌধুরী তাঁর হাতে এই সম্মাননা তুলে দেন। এনআরবি ওয়ার্ল্ড, বিজনেস আমেরিকা ম্যাগাজিন ও সাপ্তাহিক অর্থকণ্ঠের যৌথ উদ্যোগে সেমিনার ও পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

ডা. শাহ মুহাম্মদ আমান উল্লাহ বলেন, ‘এটি আমাদের কাজের স্বীকৃতি। পুলিশি হয়রানির ভয়ে চাইলেই যেকোনো হাসপাতালে এসব আহত লোকের চিকিৎসা করা সম্ভব ছিল না। তবু আমরা হাল ছাড়িনি। এই মানবিক কর্মকাণ্ডে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ডা. জুবাইদা রহমানের অনুপ্রেরণা ও সমর্থন আমাদের সাহস জুগিয়েছে। ভবিষ্যতেও এই সেবা অব্যাহত থাকবে। আমাদের কথা তুলে ধরায় কালের কণ্ঠকে ধন্যবাদ।’

 

এবার গ্লোবাল হেলথ অ্যাওয়ার্ড পেলেন সেই চিকিৎসক

৫ মে ২০২৬ অবসরের সেই প্রতিবেদন

 

এবার গ্লোবাল হেলথ অ্যাওয়ার্ড পেলেন সেই চিকিৎসক

ডা. শাহ মুহাম্মদ আমান উল্লাহর নেতৃত্বে কাজ করেছেন এই চিকিৎসকরা