ম্যাচজুড়ে ইসমাইল সাইবারিকে খুব কমই খুঁজে পাওয়া গেছে। তবে এবারের বিশ্বকাপে তিনিই মরক্কোর প্রাণভোমরা। সাইবারিকে তাই জেগে উঠতেই হতো। তা তিনি উঠলেনও। গোল মিসের মহড়ায় পরিণত হওয়া টাইব্রেকারে তাঁর গোলেই যে মন্তেরেই স্টেডিয়ামের গ্যালারি লাল সমুদ্রে রূপ নেয়। তবে এই উৎসবের আগে মরক্কো সমর্থকদের শুকিয়ে যাওয়া গলায় একটু পানি দিয়েছিলেন ইসা দিয়ুপ।
ম্যাচে দারুণ খেলতে থাকা মরক্কো কোনোভাবে গোলের দেখা পাচ্ছিল না। উল্টো খেলার ধারার বিপরীতে ক্রাইসেনসিও সামারভিলের পাস থেকে নেদারল্যান্ডসকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে নেন কোডি গাকপো। ম্যাচের তখন ৭২ মিনিট। তবে দলকে এগিয়ে দেওয়া গোলের পর কমলার উচ্ছ্বাসের মাঝে আবেগের রোশনাইয়ে ঢেকে যায় গাকপোর মুখাবয়ব। মাঠে নামার ৪৮ ঘণ্টা আগে অনাগত সন্তানের মৃত্যু তাঁকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। গোল করার পর টলমল চোখে আকাশের পানে তাকিয়ে হয়তো অনাগত সন্তানকেই গোলটি উৎসর্গ করেন। ওই মুহূর্তে গাকপোর জন্য হলেও ডাচদের জয়ই কি সবার প্রার্থনায় ছিল?
কিন্তু নক আউটের গল্পগুলো যে কারো কারো জন্য বড্ড বিষাদের। এদিন গাকপোকে সেই বিষাদের অভয়ারণ্যে বিলীন করে আনন্দটুকু নিজের করে নেন দিয়ুপ। অথচ তিন মাস আগেও তিনি মরক্কোর ফুটবলার ছিলেন না। মা মরক্কোর। কিন্তু বাবা সেনেগালিজ। দিয়ুপের জন্ম ও বেড়ে ওঠা ফ্রান্সের তুলুজে। সেখানকার ফুটবল ক্লাবের একাডেমিতেই তাঁর হাতেখড়ি। সেই ক্লাবের জার্সিতেই ২০১৫ সালে দিয়ুপের পেশাদার ক্যারিয়ার শুরু হয়। এরপর ২০১৮ সালে যোগ দেন ওয়েস্ট হ্যাম ইউনাইটেডে। সেখান থেকে এখন তিনি খেলছেন ফুলহ্যামের হয়ে।
দিয়ুপের ফুটবল ক্যারিয়ারের পুরোটাজুড়েই ছিল ফ্রান্স। সব ধরনের বয়সভিত্তিক পর্যায়ও পার হয়ে আসেন প্রতিভা আর পরিশ্রমের ছাপ রেখে। দিয়ুপের সামনে তিনটি পথ খোলা ছিল—জন্মভূমি ফ্রান্স, বাবার দেশ সেনেগাল কিংবা মায়ের দেশ মরক্কোর হয়ে খেলা। ২০১৮ সালে তিনি বেছে নিয়েছিলেন ফ্রান্সকেই। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর বাস্তব হয়নি। বছরের পর বছর অপেক্ষার পর অবশেষে একদিন সিদ্ধান্ত বদলান। বেছে নেন মায়ের দেশ মরক্কোকে। চলতি বছরের ২৬ মার্চ দেশটির হয়ে খেলার আনুষ্ঠানিক অনুমতি পান। বিশ্বকাপের আগে ওই সময়ে ম্যাচই খেলার সুযোগ পান মাত্র দুটি। তবে তাঁর মাঝে বারুদ দেখেছিলেন মরক্কো কোচ মোহামেদ ওয়াহবি। তাঁর চাওয়াতেই বিশ্বকাপ দলে জায়গা পেয়ে যান দিয়ুপ।
কোচের আস্থার প্রতিদান দিতেও বেশি সময় নেননি দিয়ুপ। মূল দায়িত্ব রক্ষণ সামলানো হলেও রাউন্ড অব ৩২-এ তিনি দলের ত্রাণকর্তা হলেন গোল করে। সেটাও ম্যাচের অন্তিমে যোগ করা সময়ে। ওই মুহূর্তে মন্তেরেই স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে ডাচ সমর্থকদের কোরাস যেন দলটির শেষ ষোলোর প্রস্তুতির কথাই বলছিল! তখনই শেমস-এ দিন তালিবের চমৎকার ক্রস থেকে বুলেট গতির হেডে ডাচদের জালে বল পাঠান দিয়ুপ। নাটকীয়ভাবে সমতায় ফেরে মরক্কো। জেগে ওঠা এই মরক্কোকেই টাইব্রেকারে জিতিয়ে শেষ ষোলোর টিকিট কাটাতে একজন যেন অপেক্ষায় ছিলেন। তিনি আর কেউ নন, মরক্কোর গত বিশ্বকাপ সাফল্যের কারিগর গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনু। ডাচদের মিস করা তিনটি শটের একটি ঠেকান তিনি। বাকি দুটি বাইরে মারেন জাস্টিন ক্লাইভার্ট ও জুরিয়েন টিম্বার। বুনু যে মঞ্চটা সাজিয়ে দিয়েছিলেন সেখানে শেষ মালাটা গাঁথেন সাইবারি। তাঁর মারা শট পোস্টে যেতেই উল্লাসে ফেটে পড়ে মরক্কো। টাইব্রেকারে ৩-২ গোলের জয়ে স্বপ্নের পথে আরেক ধাপ এগিয়ে যাওয়া। সেই এগিয়ে যাওয়ার পথে মরক্কানদের শুকিয়ে যাওয়া গলায় দিয়ুপ যদি একটু পানি দিয়ে থাকেন, তাহলে তাদের তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে দিয়েছেন বুনু ও সাইবারি। এদিন তাঁরাই যে মরক্কোর তিন তারা।



