অনেকেই মনে করেন, শিরক মানেই শুধু মূর্তি পূজা করা। কিন্তু পবিত্র কোরআন-হাদিসে এমন বহু বিষয়কে শিরক বলা হয়েছে, যা মূর্তি পূজার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়।
এখানে কিছু উদাহরণ দেয়া হলো—
আল্লাহ ছাড়া অন্যের ওপর ভরসা করা : পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর মুমিনরা যেন একমাত্র আল্লাহর ওপরই ভরসা করে।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১২২)
যখন কেউ মনে করে যে কোনো ব্যক্তি, পীর, নেতা বা শক্তি আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে তার উপকার বা ক্ষতি করতে পারে, তখন তা শিরকের দিকে নিয়ে যায়।
আল্লাহ ছাড়া অন্যের কাছে দোয়া করা : পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমন কাউকে ডেকো না, যে তোমার উপকারও করতে পারে না, অপকারও করতে পারে না।’ (সুরা : ইউনুস, আয়াত : ১০৬)
এ আয়াতে আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ডাকতে নিষেধ করা হয়েছে। দোয়া একটি ইবাদত। তাই বিপদ-আপদ দূর করার জন্য মৃত ব্যক্তি, কবর বা অলিদের কাছে সাহায্য চাওয়া কোরআনের দৃষ্টিতে বৈধ নয়; বরং দোয়া একমাত্র মহান রবের কাছেই করতে হবে।
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘বলুন (হে নবী), আমি তো কেবল আমার প্রতিপালককেই ডাকি এবং তাঁর সঙ্গে কাউকেই শরিক করি না।’
(সুরা : জিন, আয়াত : ২০)
এই আয়াতে তাওহিদের মূল শিক্ষা তুলে ধরা হয়েছে, আল্লাহকে একমাত্র আহবান করা এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক না করা।
দুনিয়াবি স্বার্থে আল্লাহর হুকুম অমান্য
করা : মহান আল্লাহ বলেন, ‘মানুষের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহ ছাড়া অন্যকে আল্লাহর
সমকক্ষরূপে গ্রহণ করে এবং তাদেরকে আল্লাহকে ভালোবাসার মতো ভালোবাসে।’
(সুরা : আল-বাকারাহ, আয়াত : ১৬৫)
এই আয়াত দ্বারা বোঝা যায়, কোনো ব্যক্তি, মতবাদ বা দলকে অনুসরণ করতে গিয়ে কিংবা ভালোবাসতে গিয়ে যদি আল্লাহর আদেশকে উপেক্ষা করা হয়, বুঝে নিতে হবে, নিজের অজান্তেই আল্লাহর ভালোবাসা ও উপাসনায় অন্য কাউকে শরিক করে ফেলেছে।
আল্লাহর আইনকে অস্বীকার করে অন্যকে চূড়ান্ত বিধানদাতা মনে করা : এই বিশ্বাসও একটি মানুষের ঈমানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, কখনো কখনো ধ্বংস করে দেয়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে তাদের পণ্ডিত ও সন্ন্যাসীদের রব বানিয়ে নিয়েছে।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৩১)
মুফাসসিরিনে কেরাম এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, তারা তাদের আলেমদের সিজদা করত না; বরং হারামকে হালাল এবং হালালকে হারাম বানানোর ক্ষেত্রে অন্ধ আনুগত্য করত।
রিয়া তথা লোক-দেখানো ইবাদত : ইবাদতের উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি না হয়ে মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ হলে তাতে শিরকের অনুপ্রবেশ ঘটে। আল্লাহ বলেন, ‘অতএব দুর্ভোগ সেই সালাত আদায়কারীদের জন্য, যারা তাদের সালাত সম্পর্কে উদাসীন; যারা লোক-দেখানোর জন্য কাজ করে।’ (সুরা : মাউন, আয়াত: ৪-৬)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, আমি কি তোমাদের এমন বস্তু সম্পর্কে সংবাদ দেব, যা তোমাদের জন্য দাজ্জালের চেয়েও অধিক ভয়ংকর। (বর্ণনাকারী বলেন) আমরা বললাম, হ্যাঁ, অবশ্যই। তিনি (সা.) বললেন, গোপন শিরক। যেমন—কোনো ব্যক্তি নামাজ পড়ছিল, অতঃপর কেউ তাকে দেখছে বলে সে নামাজকে খুব সুন্দর করে পড়তে শুরু করল। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪২০৪)
আল্লাহ ছাড়া গায়েবের জ্ঞান অন্য কারো আছে বলে বিশ্বাস করা : আমাদের সমাজে কেউ কেউ মনে করে যে পীর, জ্যোতিষরা ভবিষ্যতের কথা জানেন, এটা ঈমানবিধ্বংসী বিশ্বাস। এ ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘গায়েবের চাবিকাঠি তাঁরই কাছে। তিনি ছাড়া কেউ তা জানে না।’ (সুরা : আল-আনআম, আয়াত : ৫৯)
আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সিজদা
করা : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা কবরের ওপর বোসো না এবং কবরের দিকে (মুখ করে) সালাত আদায় কোরো না।’
(মুসলিম, হাদিস : ৯৭২)
অন্য হাদিসে এসেছে, আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) যে রোগ থেকে আরোগ্য লাভ করেননি, সে রোগশয্যায় থেকে বলেছেন, ইহুদি ও নাসারাদের প্রতি আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হোক। তারা তাদের নবীদের কবরগুলোকে মসজিদ বানিয়ে নিয়েছে।
(বুখারি, হাদিস : ৪৪৪১)
কোরআন ও হাদিসের আলোকে দেখা যায়, মানুষের ইবাদত মনে করা অনেক কাজ ও বিশ্বাস মানুষকে কুফর ও শিরকের দিকে নিয়ে যায়। তাই একজন মুসলিমের কর্তব্য হলো তাওহিদের সঠিক ধারণা অর্জন করা, নিজের বিশ্বাস ও আমলকে কোরআন-সুন্নাহর আলোকে যাচাই করা এবং সব ধরনের শিরক থেকে বেঁচে থাকা।




