সবুজ গালিচায় ২২ জন মানুষের চামড়ার গোলকটিকে নিয়ে কাড়াকাড়ি—বাইরে থেকে দেখলে ফুটবল ম্যাচকে এটুকুই মনে হতে পারে; কিন্তু গ্যালারির শোরগোল আর রেফারির বাঁশির আড়ালে প্রতিটি ম্যাচ আসলে পদার্থবিজ্ঞানের এক একটি জীবন্ত গবেষণাগার। মাঠে বলের গতি, বাতাসে তার অদ্ভুত বাঁক নেওয়া কিংবা গোলকিপারের শূন্যে ভেসে যাওয়া—সবকিছুর পেছনেই লুকিয়ে আছে ফিজিকসের নিখুঁত সব সমীকরণ। পিচ থেকে শুরু করে জালের ভেতর বল আছড়ে পড়া পর্যন্ত ফুটবল খেলার রন্ধ্রে রন্ধ্রে জড়িয়ে আছে ফিজিকস। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফ্রি কিকের কথা উঠলেই ব্রাজিলের রবার্তো কার্লোসের সেই অবিশ্বাস্য শটের কথা সামনে আসে। ১৯৯৭ সালে ফ্রান্সের বিপক্ষে তিনি অসাধারণ এই শট খেলেন। বাতাসে বলের জাদুকরী বাঁক আর ম্যাগনাস রহস্যের জাদুকরী এই দৃশ্য ক্রীড়াপ্রেমীদের এখনো মনে থাকার কথা। বল পোস্টের অনেকখানি বাইরে দিয়ে যাচ্ছে দেখে ফরাসি গোলকিপার ফ্যাবিয়েন বার্থেজ নড়াচড়ারও প্রয়োজন বোধ করেননি, কিন্তু শেষ মুহূর্তে বাতাসে এক অদ্ভুত বাঁক নিয়ে বলটি গোলপোস্টে ঢুকে যায়। ফরাসি বিজ্ঞানীদের রাতের ঘুম হারাম করে দেওয়া সেই শটের পেছনে কাজ করেছিল পদার্থবিজ্ঞানের ‘ম্যাগনাস প্রভাব’। যখন কোনো খেলোয়াড় বলের ঠিক মাঝখানে লাথি না মেরে একটু কোনাকুনি বা এক পাশে কেটে শট নেন তখন বলটি নিজের অক্ষের ওপর বনবন করে ঘুরতে ঘুরতে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। বলের এই ঘূর্ণনের কারণে তার এক পাশের বাতাস দ্রুত সরে যায়, ফলে সেখানে বাতাসের চাপ কমে যায়। অন্যদিকে বলের বিপরীত পাশের বাতাস ঘূর্ণনের উল্টো দিকে থাকায় বাধা পায় এবং সেখানে বাতাসের চাপ বেড়ে যায়। বিজ্ঞানী বার্নোলির নীতি অনুযায়ী তরল বা বায়বীয় পদার্থ সব সময় উচ্চচাপ থেকে নিম্নচাপের দিকে ধাবিত হয়। ফলে বাতাসের এই চাপের পার্থক্যের কারণে বলটি সোজা না গিয়ে হঠাৎ এক পাশে বেঁকে যায়। কার্লোসের পায়ে ভর করে সেদিন আসলে ফিজিকসই যেন এই গোল করেছিল! একইভাবে মাঠের এক প্রান্ত থেকে যখন ডিফেন্ডার বা গোলকিপার লম্বা শট নেন, তখন বলটি বাতাসে একটি ধনুকের মতো বাঁকানো পথ তৈরি করে অন্য প্রান্তে গিয়ে পড়ে, যাকে পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় প্রাসের গতি। একটি বল কত দূর গিয়ে পৌঁছবে এবং কতক্ষণ বাতাসে ভাসবে, তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে বলটি কত বেগে এবং মাটির সঙ্গে কত ডিগ্রি কোণ তৈরি করে ছোড়া হয়েছে তার ওপর। তাত্ত্বিকভাবে কোনো বাতাস না থাকলে একটি বলকে সর্বোচ্চ দূরত্বে পাঠাতে হলে ঠিক ৪৫ ডিগ্রি কোণে শট করতে হয়। তবে খোলা মাঠে বাতাসের প্রতিরোধ বা ড্র্যাগ ফোর্সের কারণে সাধারণত ৩৫ থেকে ৪০ ডিগ্রি কোণ বজায় রেখে লং পাস বা ক্রস দেন স্ট্রাইকাররা। যখন এই হিসাব মাথায় রেখে হেড করতে লাফিয়ে ওঠেন খেলোয়াড়রা, তখন তাঁদেরও এই প্রাসের গতির সঙ্গে নিজের শরীরের ভরবেগকে মেলাতে হয়। মাঠের এই গতির নেপথ্যে আবার কাজ করে ঘাসের ঘর্ষণ ও পানির ছোঁয়া। আধুনিক ফুটবলে ম্যাচ শুরু হওয়ার ঠিক আধাঘণ্টা আগে মাঠের ঘাসে স্বয়ংক্রিয় পাম্প দিয়ে পানি ছিটানো অত্যন্ত পরিচিত দৃশ্য। অনেকে মনে করতে পারে, এটি হয়তো ঘাস সতেজ রাখার জন্য; কিন্তু এর আসল কারণ লুকিয়ে আছে ঘর্ষণ বল বা ফ্রিকশনের থিওরিতে। ফুটবল মাঠের ঘাস ও বলের চামড়ার মধ্যে এক ধরনের বল তৈরি হয়, যা বলের গতিকে টেনে ধরে। ঘাস শুকনা বা বড় থাকলে এই ঘর্ষণ বল বেশি হয়, যার ফলে বলের গতি ধীর হয়ে যায় এবং তিকিতাকা বা দ্রুতগতির শর্ট পাস খেলা কঠিন হয়ে পড়ে। মাঠে পানি ছিটানোর ফলে ঘাস পিচ্ছিল হয়ে যায়, যা বল ও মাঠের মধ্যকার ঘর্ষণকে অনেকাংশে কমিয়ে দেয়; ফলে বল খুব দ্রুত ও মসৃণভাবে গড়ায়। শুধু বলই নয়, খেলোয়াড়দের বুটের নিচে থাকা ছোট ছোট পেরেক বা স্টাড মূলত মাটির সঙ্গে পায়ের ঘর্ষণ বাড়িয়ে দেয় যেন তীব্র গতিতে দৌড়ানোর সময় হুট করে দিক পরিবর্তন করলেও খেলোয়াড় পিছলে পড়ে না যান। বলের এই ছুটে চলার পেছনে আরেকটি বড় ভূমিকা রাখে বুট ও বলের সংঘর্ষ এবং শক্তির রূপান্তর। পেনাল্টি শুট-আউটের সময় যখন একজন খেলোয়াড় পুরো শক্তি দিয়ে বলে লাথি মারেন তখন সেখানে নিউটনের গতির সূত্র এবং শক্তির নিত্যতা সূত্র একসঙ্গে কাজ করে। লাথি মারার ঠিক আগের মুহূর্তে খেলোয়াড়ের পা থাকে তীব্র গতিশীল অর্থাৎ পায়ে থাকে প্রচুর গতিশক্তি। পায়ের বুট যখন বলটিকে স্পর্শ করে তখন বলটি এক মিলিসেকেন্ডের ভগ্নাংশের জন্য সামান্য চ্যাপ্টা হয়ে যায়। এই সংক্ষিপ্ত সময়ে পায়ের গতিশক্তি বলের ভেতর স্থিতিস্থাপক বিভব শক্তি হিসেবে জমা হয়; ঠিক পরের মুহূর্তেই বলটি তার আগের গোল আকারে ফিরে আসার চেষ্টা করে এবং সেই জমানো শক্তিকে প্রচণ্ড গতিশক্তিতে রূপান্তর করে গোলপোস্টের দিকে ছুটে যায়। খেলোয়াড়ের পায়ের ভর ও গতি যত বেশি হবে বলের ওপর প্রযুক্ত বলও তত তীব্র হবে। সব শেষে গোলকিপারের ডাইভ এবং নিউটনের তৃতীয় সূত্রের কথাই ধরা যাক। নিউটনের তৃতীয় গতিসূত্র বলে, প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে। ফুটবল মাঠে এই সূত্রের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর উদাহরণ দেখা যায় যখন একজন গোলকিপার বাজপাখির মতো শূন্যে ডাইভ দিয়ে বল আটকে দেন। বাতাসে ভেসে ওঠার জন্য গোলকিপারকে প্রথমে তাঁর বুট দিয়ে মাটির ওপর তীব্র চাপ বা বল প্রয়োগ করতে হয়, যা হলো ক্রিয়া। তখন মাটিও গোলকিপারের শরীরের ওপর সমান ও বিপরীতমুখী একটি ধাক্কা দেয়। এই প্রতিক্রিয়া বলের কারণেই গোলকিপার মাধ্যাকর্ষণকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শূন্যে লাফিয়ে উঠতে পারেন। সব মিলিয়ে সবুজ মাঠের এই ৯০ মিনিটের যুদ্ধ আসলে শুধুই পেশি বা কৌশলের লড়াই নয়; নিখুঁত বিজ্ঞানের স্পর্শই এই খেলায় এনেছে বৈচিত্র্য।